মানুষের জীবনে প্রেম কতবার আসে? কেউ বলেন একবার, কেউ বলেন বারবার। আবার কারও জীবনে প্রথম প্রেমটাই এমন সর্বনাশা হয়ে ওঠে যে দ্বিতীয়বার প্রেমে পড়ার সাহস থাকে না। তবে এলেনা সাদিকু অন্য ধাতুতে গড়া। প্রথম প্রেম তাঁকে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছিল, শরীর থেকে কেড়ে নিয়েছিল ১০ কেজি ওজন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুনতে হয়েছিল, বাঁ পা কেটে ফেলতে হতে পারে। যে পা দিয়ে ফুটবল খেলতেন, সেই পা-ই আর থাকবে না!

অথচ সেই এলেনাই আবার প্রেমে পড়েছেন। সেই ফুটবলেরই। শুধু প্রেমের ধরনটা বদলে গেছে। আগে মাঠে নেমে বল পায়ে খেলতেন, এখন ডাগআউটে দাঁড়িয়ে অন্যদের খেলান। আর কী আশ্চর্য, প্রথম প্রেমে প্রত্যাখ্যাত মেয়েটি দ্বিতীয় প্রেমে এমন সফল যে ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কারের মঞ্চেও পৌঁছে গেছেন!

৩২ বছর বয়সী এলেনা সাদিকু এখন ব্যালন ডি’অরের বর্ষসেরা নারী কোচের পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায়। নারী ও পুরুষ কোচ মিলিয়ে এই স্বীকৃতি পাওয়া সর্বকনিষ্ঠ কোচ তিনি। শুধু তা-ই নয়, এবারের নারী কোচদের সংক্ষিপ্ত তালিকায় একমাত্র নারীও তিনি। সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘আঠারো বছর বয়স মাথা নোয়াবার নয়।’ এলেনাকে দেখলে কবি হয়তো বত্রিশ বছর বয়স নিয়েও অমন একটা কবিতা লিখতেন!

তবে এই সাফল্যের গল্প বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ২০১৭ সালের জুনে। ইনস্টাগ্রামে নিজের জীবনের প্রায় শেষ হয়ে যাওয়া একটা অধ্যায়ের কথা লিখেছিলেন এলেনা। ‘অভিশপ্ত হাঁটুতে তিন বছরের মধ্যে পঞ্চমবারের মতো অস্ত্রোপচার হলো একই জায়গায়। এটাই কি তবে শেষ?’ প্রশ্নটা শুধু ফুটবলকে নিয়ে ছিল না, ছিল নিজের অস্তিত্ব নিয়েও।

সেই পোস্টেই লিখেছিলেন, ‘আমার মিনিস্কাস সম্পূর্ণ ছিঁড়ে গেছে এবং এসিএলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চোট পাওয়ার পরও কীভাবে যে আরও ২০ মিনিট খেলেছি, ভাবতেই পারছি না। তখন কি আর জানতাম, ওটাই আমার শেষ ম্যাচ হতে পারে। ফুটবল আমার সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। আমাদের আবার দেখা হবে। সেটা কি খেলোয়াড়? কোচ নাকি ধারাভাষ্যকার? এজেন্ট নাকি চিকিৎসক? কে জানে! আমি হাল ছাড়ছি না।’

৯ বছর পর সেই কথাগুলো পড়লে মনে হয়, মানুষ কখনো কখনো নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই লিখে রাখে, শুধু তখন বুঝতে পারে না। অবশ্য এলেনার জীবনটা শুরু থেকেই খুব সহজ ছিল না। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় যুদ্ধের আগুন জ্বলছিল। সেই আগুন থেকে বাঁচতে কসোভো ছেড়ে জার্মানিতে আশ্রয় নেন তাঁর মা-বাবা। সেখানেই জন্ম এলেনার। কসোভো-আলবেনিয়ান বংশোদ্ভূত পরিবারটি পরে নিজেদের দেশে ফিরেছিল; কিন্তু যুদ্ধ আবারও তাঁদের ঘরছাড়া করে। এবার ঠিকানা হয় সুইডেন। এলেনার বয়স তখন সাত।

শৈশবের সেই অনিশ্চিত দিনগুলোতে একটা ফুটবলই হয়ে উঠেছিল তাঁর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু। বাড়ির বাগানে ভাইয়ের সঙ্গে খেলতে খেলতে কখন যে বলটার প্রেমে পড়ে গেলেন, নিজেও বুঝতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, ‘ফুটবল হয়ে ওঠে আমার আবেগ, আমার ভালোবাসা, আমার নিরাপত্তার আশ্রয়, আমার সবকিছু।’

যুদ্ধ মানুষের কাছ থেকে ঘর বা শৈশব কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন নয়। ১৩ বছর বয়সে এলেনা ঠিক করে ফেলেন পেশাদার ফুটবলার হবেন। দুই বছর পর সুযোগ পান মালমোর একাডেমিতে। শুরুটা ছিল স্ট্রাইকার হিসেবে। গোল করাই ছিল কাজ; কিন্তু কোচরা আবিষ্কার করলেন, মেয়েটি শুধু গোল করতে জানে না, খেলাটাও অন্যদের চেয়ে একটু আগে পড়ে ফেলতে পারে। প্রতিপক্ষের পরের চালটা যেন আগেই বুঝে যান। তাই তাঁকে নামিয়ে আনা হলো মাঝমাঠে।

ফুটবলে মাঝমাঠের খেলোয়াড়দের অনেকটা দাবাড়ুর মতো হতে হয়। শুধু নিজের চাল জানলেই চলে না, প্রতিপক্ষের কয়েক চাল পরের পরিকল্পনাও বুঝতে হয়। এলেনার মধ্যে সেই গুণ ছিল। মাঠের বাইরে তিনি হাসিখুশি, রসিক ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা এক তরুণী হলেও মাঠে নামলেই হয়ে যেতেন অন্য মানুষ—শান্ত, ধীরস্থির ও পরিণত। নেতৃত্ব যেন তাঁর সহজাত। ২৩ বছর বয়সেই হ্যামারবির অধিনায়ক হয়ে ওঠা তারই প্রমাণ; কিন্তু ভাগ্য তাঁর জন্য অন্য চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল।

১৯ বছর বয়সে প্রথমবার বাঁ হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্ট বা এসিএলে চোট পান তিনি। ফুটবলারদের কাছে যে চোটের নামই দুঃস্বপ্ন, একবার এসিএল ছিঁড়লে অনেকের ক্যারিয়ারই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এলেনার সেই একই হাঁটুতে এসিএল ছিঁড়েছে তিনবার। খেলোয়াড়জীবনে অস্ত্রোপচার হয়েছে মোট ১৩টি!

ইএসপিএনকে নিজের চোটের বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘খেলোয়াড় হিসেবে আমার বাঁ হাঁটুতে ১৩টি অস্ত্রোপচার হয়েছে। তিনবার এসিএল চোটে পড়া ছাড়াও পা পুনর্গঠন করতে হয়। যে চোটের কথাই বলুন, এলসিএল, এমসিএল—সবই হয়েছে।’

২০১৪ সালে একবার বাঁ হাঁটুর এসিএল, মিডিয়াল কোলাটারাল লিগামেন্ট (এমসিএল), ল্যাটারাল কোলাটারাল লিগামেন্ট (এলসিএল) এবং মিনিস্কাস একসঙ্গে ছিঁড়ে যায়। এমন চোটের পর সাধারণ কোনো ফুটবলারের মাঠে ফেরার কথা ভাবতেও ভয় পাওয়ার কথা। কিন্তু এলেনা সাধারণ কেউ ছিলেন না। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে মাঠে ফিরেই প্রথম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন তিনি। এসকিলস্টুনা ইউনাইটেডের কোচিং স্টাফ তখন ভাবতে শুরু করেছিলেন, মেয়েটিকে এবার পুরোদমে অনুশীলনে নামানো যাবে। ফুটবল বুঝি আবার তাঁর জীবনে হাসি হয়ে ফিরছে।

কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ থাকেনি। দুই বেলার অনুশীলনে আবারও ছিঁড়ে যায় এসিএল এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় এলসিএলও। এবার অস্ত্রোপচারে তাঁর টিবিয়া বা জঙ্ঘাস্থির একটি অংশ কেটে ফেলতে হয়। পায়ের হাড় সঠিক অবস্থানে রাখতে বসানো হয় চারটি স্ক্রু। প্রথমবার এসিএল পুনর্গঠনে ব্যবহার করা হয়েছিল নিজের হ্যামস্ট্রিংয়ের টিস্যু। দ্বিতীয়বার লাগল ক্যাডাভার গ্রাফট, অর্থাৎ মৃতদেহ থেকে সংগৃহীত টিস্যু। চিকিৎসকেরা এবার আর কোনো আশার কথা শোনালেন না।

দ্য টাইমসকে এলেনা বলেন, ‘তারা বলেছিল, এলেনা, আমরা মনে করি, তোমার খেলা ছেড়ে দেওয়া উচিত, যাতে তুমি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারো।’

যে মেয়ের কাছে ফুটবলই জীবন, তাঁর কাছে এই কথা কতটা নিষ্ঠুর শোনাতে পারে, তা ভাবাই যায়। কিন্তু প্রেমে পড়া মানুষ যুক্তির ধার কতটুকু রাখে? চিকিৎসকদের পরামর্শ উপেক্ষা করে ১৮ মাস পর আবারও মাঠে ফেরেন এলেনা। সেই গ্রীষ্মেই তৃতীয়বার ছিঁড়ে যায় এসিএল এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় মিনিস্কাসও। আবারও অস্ত্রোপচার। কিন্তু এবার যা ঘটল, সেটিকে শুধু দুর্ভাগ্য বললে কম বলা হয়।

অস্ত্রোপচারের পরদিন বন্ধু ও ভাইদের সঙ্গে বসে ফুটবল ম্যাচ দেখছিলেন এলেনা। হঠাৎ হাঁটুতে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়। মনে হচ্ছিল, কেউ যেন ছুরি দিয়ে হাঁটুতে একের পর এক আঘাত করছে। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও মরফিন দিয়ে ব্যথা কমানো গেল না। চিকিৎসকেরা হাঁটুর তরল পরীক্ষা করে উদ্বেগ আরও বাড়ল। এলেনার ভাষায়, ‘সেটি সিআরপি টেস্ট, যা সংক্রমণের মাত্রা নির্দেশ করে। এর মান সাতের নিচে থাকার কথা; কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ছিল সাড়ে চার শর বেশি। দুই সপ্তাহের মধ্যে সাতটি অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ব্যাপারটা সেপসিসে রূপ নিয়ে রক্তপ্রবাহেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল।’

দুই সপ্তাহে সাতটি অস্ত্রোপচার! একটি স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি, আর সেই স্বপ্ন যখন কেড়ে নেওয়া হলো, তখন নিজেকেই প্রশ্ন করেছিলেন, ‘একটা স্বপ্ন বুনেছিলাম। সেই স্বপ্নটা যখন কেড়ে নেওয়া হলো, নিজেকেই প্রশ্ন করেছি এখন তাহলে আমি কে?’

তৃতীয় অস্ত্রোপচারের পর দেখা দেওয়া সংক্রমণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে সপ্তম অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, এবারও কাজ না হলে পা কেটে ফেলতে হবে। সংক্রমণের সঙ্গে তীব্র জ্বর এবং শরীর থেকে ঝরে যায় ১০ কেজি ওজন। যে মেয়েটি কিছুদিন আগেও মাঠে প্রজাপতির মতো ছুটে বেড়াতেন, তিনি তখন হাসপাতালের বিছানায় প্রায় মৃতপ্রায়। সেই দিনগুলোতে প্রতি রাতে একটা কথাই ভাবতেন এলেনা—এক পায়ে ফুটবল খেলবেন কীভাবে? মানুষ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কত বিচিত্র স্বপ্ন দেখে! এলেনার কাছে তখনো সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল ফুটবল খেলা নিয়ে।

শেষ পর্যন্ত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসে এবং পা আর কাটতে হয়নি। কিন্তু ফুটবলারের ক্যারিয়ারটা জীবন থেকে কেটে বাদ দিতে হলো মাত্র ২৩ বছর বয়সে। সেপসিস থেকে বেঁচে ফেরার পর এলেনার মনে হয়েছিল, জীবনে যা ঘটে তার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ থাকে। হয়তো নিয়তি তাঁকে ফুটবলার নয়, কোচ বানাতেই এত আয়োজন করেছে। তবে সেই উপলব্ধি এক দিনে আসেনি। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, ‘একটা স্বপ্ন বুনেছিলাম। সেই স্বপ্নটা যখন কেড়ে নেওয়া হলো, নিজেকেই প্রশ্ন করেছি এখন তাহলে আমি কে?’

প্রশ্নটা ছিল বড় কঠিন। ফুটবল ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, ‘ফুটবল আমার সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। আমাদের আবার দেখা হবে।’ যে মানুষ সারা জীবন নিজেকে ফুটবলার হিসেবে চিনেছেন, এক সকালে তাঁকে বলা হচ্ছে তিনি আর ফুটবলার নন। তাহলে তিনি কে?

এলেনার শরীরে একটি ট্যাটু আছে, যার মর্মার্থ হলো জীবনে যা-ই ঘটুক, সবকিছুর মধ্যে ইতিবাচক কিছু খুঁজে নিতে হবে এবং বেঁচে থাকার নতুন রাস্তা বের করতে হবে। নিজের শরীরে লেখা সেই দর্শনই এবার জীবনে প্রয়োগ করলেন তিনি। সর্বশেষ চোটের চার মাস পরই কোচিংয়ের প্রেমে পড়েন এলেনা। তাঁর নিজের কথায়, ‘সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ যে (সর্বশেষ চোটের) চার মাস পরই আমি কোচিংয়ের প্রেমে পড়ি।’

মানুষের জীবনে প্রেম যে বারবার আসে, এলেনা তার জীবন্ত প্রমাণ। সেই দ্বিতীয় প্রেমের শুরু হয় হ্যামারবাইয়ে। নিজের সর্বশেষ ক্লাবটিতে মেয়েদের একাডেমি চালুর প্রস্তাব পেয়ে রাজি হয়ে যান তিনি। তবে ফুটবলার থেকে কোচ হয়ে ওঠার রাস্তাটাও গোলাপের পাপড়ি বিছানো ছিল না। চীনের বেইজিং বিজি ফোনিক্স এবং সুইডেনের এসকিলস্টুনায় কাজ করার সময় সপ্তাহে ৮০ ঘণ্টা পর্যন্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে। এমনও সময় এসেছে, যখন কোচিংয়ের প্রতি ভালোবাসাটাই হারিয়ে যেতে বসেছিল। ঠিক তখনই নতুন দরজা খুলে দেন ব্রায়ান সোরেনসন। এভারটনের এই কোচের আমন্ত্রণে ক্লাবটির অনূর্ধ্ব-২১ দলের দায়িত্ব নেন এলেনা।

তারপর ২০২৪ সালে সেল্টিকের নারী দলের কোচের দায়িত্ব পান তিনি। সেল্টিক নামটার সঙ্গে এলেনার একটি আবেগের সম্পর্ক ছিল, কারণ সুইডেনের কিংবদন্তি ফুটবলার হেনরিক লারসেন তাঁর খুব প্রিয় এবং লারসেনের সাবেক ক্লাবেই এবার কোচিংয়ের সুযোগ পান তিনি। এবার যেন নিজের সত্যিকারের ঠিকানা খুঁজে পেলেন এলেনা। কোচ হিসেবে প্রথম মৌসুমেই সেল্টিকের মেয়েদের স্কটিশ প্রিমিয়ার লিগ জেতালেন তিনি, তাও শেষ দিনে শিরোপা নিশ্চিত করে। দলকে নিয়ে গেলেন চ্যাম্পিয়নস লিগেও, যে প্রতিযোগিতায় দুই বছর আগে ইউলিয়ান নাগলসমানের রেকর্ড পেছনে ফেলে সর্বকনিষ্ঠ কোচের কীর্তি গড়েছেন তিনি। সেল্টিকের সাফল্য তাঁকে এনে দেয় ২০২৪ সালের ফিফা দ্য বেস্ট নারী কোচের পুরস্কারের মনোনয়ন।

কিন্তু এলেনা তখনো নিজের সেরা অধ্যায়টা লেখেননি। গত বছর দায়িত্ব নেন সুইডেনের নারী ফুটবল ক্লাব বিকে হ্যাকেনের। প্রথম মৌসুমেই দলকে জেতান মেয়েদের ইউরোপা কাপ। হ্যাকেনের ৫৬ বছরের ইতিহাসে এটিই প্রথম ইউরোপিয়ান শিরোপা। ভাবা যায়! যে মেয়েটিকে চিকিৎসকেরা একদিন বলেছিলেন ফুটবল ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে, সেই মেয়েই এখন ইউরোপের ফুটবলে ইতিহাস লিখছেন। আর সেই ইতিহাসের স্বীকৃতি হিসেবে ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।

পুরুষশাসিত কোচিংয়ের জগতে নিজের জায়গা করে নেওয়াটাও কম বড় অর্জন নয়। এবারের বর্ষসেরা নারী কোচের সংক্ষিপ্ত তালিকায় একমাত্র নারী এলেনা, অথচ বয়স মাত্র ৩২। নারী ও পুরুষ মিলিয়েও সংক্ষিপ্ত তালিকায় তাঁর চেয়ে কম বয়সী কোনো কোচ নেই। ২৬ অক্টোবর জানা যাবে, ব্যালন ডি’অরের ট্রফিটা শেষ পর্যন্ত তাঁর হাতে উঠবে কি না।

কিন্তু সত্যিই কি তাতে খুব কিছু যায় আসে? একবার ভেবে দেখুন, ২০১৭ সালের সেই হাসপাতালের বিছানাটা। ২৩ বছরের এক তরুণী, বাঁ হাঁটুতে একের পর এক অস্ত্রোপচার, শরীরে সংক্রমণ, পা কেটে ফেলার আশঙ্কা এবং ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নটা ভেঙে চুরমার। আর তারপর চোখের সামনে ভাসিয়ে আনুন আজকের এলেনাকে—ডাগআউটে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ কোচ, ইউরোপিয়ান ট্রফিজয়ী, ব্যালন ডি’অরের সংক্ষিপ্ত তালিকায় নাম এবং ফুটবল দুনিয়ার শ্রেষ্ঠদের একজন হওয়ার অপেক্ষা।

দুটো ছবির মাঝখানে ৯ বছরের ব্যবধান এবং একটি মানুষের হার না মানার অসাধারণ গল্প। মনে পড়ে যায় দেবব্রত বিশ্বাসের সেই পঙ্‌ক্তিগুলো—‘খাড়া পাহাড়ে ওঠা যে কী জিনিস\বহুত দম লাগে\বহুত তেজ লাগে।’ এলেনা সেই পাহাড় বেয়ে উঠেছেন একবার নয়, বারবার। চোটের কাছে হেরেছেন, অস্ত্রোপচারের টেবিলে শুয়েছেন, মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছেন; কিন্তু জীবনযুদ্ধে হারেননি।

২০১৭ সালের সেই ইনস্টাগ্রাম পোস্টে লিখেছিলেন, ‘ফুটবল আমার সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। আমাদের আবার দেখা হবে।’ দেখা তো হয়েছেই। ফুটবল শুধু তাঁর কাছে ফিরে আসেনি, তাঁকে নতুন করে জীবনও দিয়েছে।