ডিয়েগো ম্যারাডোনা কেবল ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোই দেননি, বরং জাতীয় দলের ১০ নম্বর জার্সির সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিলেন। তার পরবর্তী সময়ে যে ফুটবলারই সেই উচ্চতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন, তাকে ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা ছিলেন এক বিধ্বংসী গোলস্কোরার এবং আরিয়েল ওর্তেগা ছিলেন অসাধারণ ড্রিবলিং ও সৃজনশীলতায় দক্ষ এক ফুটবলার। দুজনেই আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তবে ম্যারাডোনার পর জাতীয় দলের কেন্দ্রীয় মুখ হিসেবে যে অনন্য স্থানটি লিওনেল মেসি দখল করেছেন, তা অর্জন করতে পারেননি তারা।
এর পেছনে কেবল ট্রফির সংখ্যার পার্থক্য নয়, বরং খেলার ধরন ও প্রভাবের ভিন্নতা কাজ করেছে। মেসি দীর্ঘ সময় ধরে আর্জেন্টিনার খেলার প্রায় প্রতিটি বিষয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। গোল করা, নিখুঁত পাস, ড্রিবলিং, সুযোগ তৈরি, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং নেতৃত্ব—সবই এক শরীরেই মিশেছিল তার মাঝে। অন্যদিকে, ওর্তেগা ও বাতিস্তুতার বিশেষত্ব ছিল আলাদা আলাদা ক্ষেত্রে, যা মেসির মতো সমন্বিত ছিল না।
ম্যারাডোনার পরবর্তী প্রজন্মের সবচেয়ে প্রভাবশালী নামগুলোর একজন ছিলেন গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই তিনি আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের প্রধান ভরসায় পরিণত হন। জাতীয় দলের হয়ে ৭৮টি ম্যাচে তিনি করেন ৫৬টি গোল। তিনটি বিশ্বকাপ আসরে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ১৯৯১ ও ১৯৯৩ সালে কোপা আমেরিকা শিরোপাও জয় করেন তিনি।
তার গোল করার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে তিনি ‘বাতিগোল’ নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। বক্সের ভেতরে নিখুঁত ফিনিশিং, শক্তিশালী শট এবং গোল করার ধারাবাহিকতা তাকে আর্জেন্টিনার ইতিহাসের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
তবে বাতিস্তুতার ভূমিকা ছিল মূলত গোলকেন্দ্রিক। তিনি পুরো দলের সৃজনশীল নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করেননি। ম্যারাডোনা যেভাবে বল পায়ে পুরো আক্রমণের ছন্দ নির্ধারণ করতেন, কিংবা পরবর্তীতে মেসি যেভাবে গোল ও সুযোগ তৈরি—দুটোই একসাথে করেছেন, বাতিস্তুতার কাজ ছিল তার চেয়ে ভিন্ন। এই সীমাবদ্ধতার কারণেই কিংবদন্তি হয়েও ম্যারাডোনার পর আর্জেন্টিনার ফুটবল-পরিচয়ের একক প্রতীক হয়ে উঠতে পারেননি তিনি।
এরপর দৃশ্যপটে আসেন আরিয়েল ‘এল বুরিতো’ ওর্তেগা। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিটি ছিল তার গায়ে। ছোট জায়গায় বল নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত দিক পরিবর্তন এবং একের পর এক প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দক্ষতায় তিনি ছিলেন অনন্য।
ফিফাও ওর্তেগাকে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ‘গামবেতা’ বা ড্রিবলিং সংস্কৃতির অন্যতম বড় প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে তার প্রধান সমস্যা ছিল ধারাবাহিকতার অভাব এবং বড় ম্যাচগুলোতে প্রভাব ধরে রাখতে না পারা।
১৯৯৮ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে গোলকিপার এডউইন ভ্যান ডার সারকে মাথা দিয়ে আঘাত করার কারণে লাল কার্ড দেখেন ওর্তেগা। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনা পরাজিত হয়। চার বছর পর ২০০২ বিশ্বকাপেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও দল গ্রুপ পর্ব পার হতে ব্যর্থ হয়।
সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপার স্বাদ পাননি ওর্তেগা। ৮৭ ম্যাচে ১৭ গোল করা এই প্লেমেকারের প্রতিভা নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না, কিন্তু ম্যারাডোনা বা মেসির মতো দীর্ঘ সময় ধরে আর্জেন্টিনার সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠার সুযোগ বা ধারাবাহিকতা তিনি পাননি।
এরপর ফুটবল বিশ্বে আবির্ভাব ঘটে লিওনেল মেসির। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রথমবার আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে তোলেন তিনি। তবে তার শুরুটা খুব একটা মসৃণ ছিল না। ক্লাবে তার অসাধারণ পারফরম্যান্সের বিপরীতে জাতীয় দলে কেন তেমন প্রভাব ফেলতে পারছেন না, এই প্রশ্ন তাকে বহু বছর তাড়া করে বেড়িয়েছে।
সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে প্রথম বড় শিরোপা জয়ের জন্য তাকে দীর্ঘ ১৬ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকায় মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে। তার এক বছর পর কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে পূর্ণতা পায় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
২০২১ কোপা আমেরিকা ও ২০২২ বিশ্বকাপে মেসি ছিলেন আর্জেন্টিনার সাফল্যের মূল কারিগর। ২০২৪ সালে তার নেতৃত্বেই দল আবারও কোপা আমেরিকা জয় করে, যদিও সেই শিরোপায় আর্জেন্টিনার শক্তি ছিল আরও সম্মিলিত এবং ফাইনালে চোটের কারণে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল মেসিকে।
মেসির বিশেষত্ব এখানেই যে, তিনি কেবল গোলই করেননি; বরং গোল বানিয়েছেন, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন, চরম চাপের মুখে দলকে সামনে টেনে নিয়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং সবচেয়ে বড় মঞ্চগুলোতে সাফল্য ছিনিয়ে নিয়েছেন।
বাতিস্তুতা ছিলেন এক অসাধারণ ফিনিশার এবং ওর্তেগা ছিলেন দুর্দান্ত ড্রিবলার ও সৃজনশীল ফুটবলার। কিন্তু মেসির মধ্যে ছিল গোল করার ক্ষমতা, ড্রিবলিং, পাসিং, সুযোগ তৈরি এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের এক বিরল সমন্বয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ ক্যারিয়ার, ধারাবাহিকতা, ব্যক্তিগত অসংখ্য পুরস্কার এবং আন্তর্জাতিক সাফল্য। আটবারের ব্যালন ডি’অর জয় মেসির বৈশ্বিক তারকাখ্যাতির এক বড় প্রমাণ। তাই ম্যারাডোনার পর তার লিগ্যাসি মেসি শুধু ধারণই করেননি, বরং তার অর্থই বদলে দিয়েছেন।