দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠ কাঁপিয়েছেন লিওনেল মেসি। এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি বিশ্বকাপ জয় করেছেন, দুবার কোপা আমেরিকা শিরোপা তুলেছেন এবং দুবার বিশ্বকাপের ফাইনালে পরাজয়ের স্বাদও পেয়েছেন। তবে বিদায়ের এই মুহূর্তে মেসির ক্যারিয়ারকে কেবল ট্রফির সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা অসম্ভব। তিনি এমন সব অনন্য রেকর্ড গড়েছেন, যার অনেকগুলো কেবল আর্জেন্টিনার জন্য নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বেনিনের বিপক্ষে তার শেষ ম্যাচে মাঠে নামার আগে আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির ম্যাচ সংখ্যা ২০৭টি এবং গোল ১২৫টি। দেশটির ফুটবল ইতিহাসে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোল করার অনন্য রেকর্ডটি এখন তার দখলে।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর দীর্ঘ ২১ বছর কেটেছে। বিদায়ী ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার মোট ম্যাচ সংখ্যা ২০৭। এটি আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ। দুই শতাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা প্রথম আর্জেন্টাইন ফুটবলার হিসেবে তিনি ইতিহাস গড়েছেন।
আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুটটিও অনেক আগেই নিজের করে নিয়েছিলেন মেসি। বিদায়ের আগে তার গোল সংখ্যা ১২৫টি। তার প্রথম আন্তর্জাতিক গোলটি এসেছিল ২০০৬ সালের ১ মার্চ ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে। অর্থাৎ জাতীয় দলের হয়ে তার প্রথম ও শেষ গোলের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান দুই দশকেরও বেশি।
২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬—মোট ছয়টি বিশ্বকাপে খেলেছেন মেসি। আর্জেন্টিনার কোনো ফুটবলার এর আগে ছয়টি বিশ্বকাপে খেলার রেকর্ড গড়েননি। ২০২৬ সালে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলে তিনি এই রেকর্ডটিকে আরও বিস্তৃত করেছেন।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডটিও মেসির নামে। ছয় আসর মিলিয়ে তিনি খেলেছেন মোট ৩৪টি ম্যাচ। এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ম্যাচ ২৭টি এবং জার্মানির লোথার ম্যাথাউসের ২৫টি।
২০২৬ বিশ্বকাপের আগে বিশ্বকাপে মেসির মোট গোল ছিল ১৩টি। শেষ আসরে তিনি আরও ৮টি গোল করেন, যার ফলে বিশ্বকাপে তার মোট গোলের সংখ্যা দাঁড়ায় ২১টি। বর্তমানে বিশ্বকাপের ইতিহাসে তার চেয়ে বেশি গোল করেছেন কেবল কিলিয়ান এমবাপ্পে (২২টি)।
বিশ্বকাপে শুধু ম্যাচ খেলার রেকর্ড নয়, সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জেতার রেকর্ডটিও মেসির। ৩৪টি ম্যাচের মধ্যে ২৩টিতেই জয় পেয়েছেন তিনি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৭টি জয় রয়েছে এমবাপ্পে ও মিরোস্লাভ ক্লোসারের।
২০১৪, ২০২২ এবং ২০২৬—তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলার অভিজ্ঞতা হয়েছে মেসির। ব্রাজিলে প্রথমবার ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরেছিলেন তিনি। আট বছর পর কাতারে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয় করেন। তবে ২০২৬ সালে তৃতীয়বার ফাইনালে উঠে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা।
বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার 'গোল্ডেন বল' দুবার জেতা একমাত্র ফুটবলার মেসি। ২০১৪ সালে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলে প্রথমবার এই পুরস্কারটি পান তিনি। পরবর্তীতে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পথে সাত গোল করে আবারও গোল্ডেন বল জয় করেন। ২০২৬ বিশ্বকাপেও ব্যক্তিগত পুরস্কার নিয়ে ফিরেছেন তিনি; সেবার রদ্রি গোল্ডেন বল জিতলেও মেসি পান সিলভার বল।
বিশ্বকাপের পাশাপাশি কোপা আমেরিকার ম্যাচ সংখ্যার দিক থেকেও মেসি সবার উপরে। ২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাতটি কোপা আমেরিকায় খেলেছেন তিনি। সেখানে তার ম্যাচ সংখ্যা ৩৯টি, যা টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। গোল করেছেন ১৪টি।
কোপা আমেরিকার পাঁচটি ফাইনালে খেলেছেন মেসি। ২০০৭ সালে ব্রাজিল এবং ২০১৫ ও ২০১৬ সালে চিলির কাছে হারের পর দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছিল তাকে। অবশেষে ২০২১ সালে মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে প্রথমবার কোপা জয় করেন। এরপর ২০২৪ সালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে দ্বিতীয়বার মহাদেশীয় শিরোপা হাতে তোলেন তিনি।
দক্ষিণ আমেরিকার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও রেকর্ডবইয়ের শীর্ষে মেসির নাম। ৭২ ম্যাচ খেলে ইকুয়েডরের ইভান হুর্তাদোর সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড ভাগাভাগি করছেন তিনি। এছাড়া বাছাইপর্বের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩৬টি গোল করেছেন তিনি।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর মেসির সিনিয়র আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে যুক্ত হয়েছে চারটি বড় শিরোপা। সেগুলো হলো: কোপা আমেরিকা (২০২১, ২০২৪), ফিনালিসিমা (২০২২) এবং বিশ্বকাপ (২০২২)। এছাড়া আর্জেন্টিনার বয়সভিত্তিক দলের হয়ে ২০০৫ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ এবং ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকে সোনা জিতেছেন তিনি।
৩৯ বছর বয়সেও শেষ বিশ্বকাপে মেসির প্রভাব ছিল অপরিসীম। আট ম্যাচে ৮ গোল ও ৪টি গোলে সহায়তা করে আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে নিয়ে যান তিনি। গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এমবাপ্পের ১০ গোলের পেছনে থেকে দ্বিতীয় হয়ে থাকেন মেসি। একই বিশ্বকাপে তিনি সিলভার বল ও সিলভার বুট—দুটিই অর্জন করেন।
২০৭ ম্যাচ ও ১২৫ গোলের পরিসংখ্যান মেসির আর্জেন্টিনা ক্যারিয়ারের পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশ করে না। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ম্যাচ ও জয়, কোপা আমেরিকায় সর্বোচ্চ ম্যাচ, বাছাইপর্বের সর্বোচ্চ গোলদাতা, দুটি বিশ্বকাপ গোল্ডেন বল এবং চারটি বড় সিনিয়র শিরোপা নিয়ে শেষ ম্যাচে নামছেন তিনি।
বেনিনের বিপক্ষে মাঠে নামলেই এই সংখ্যাগুলোর অন্তত একটি পরিবর্তিত হবে। ২০৭ থেকে মেসির আন্তর্জাতিক ম্যাচ সংখ্যা হবে ২০৮। এরপর আর বাড়বে না সেই সংখ্যা।