লিওনেল মেসি এবং আর্জেন্টিনার মধ্যকার সম্পর্কটি কখনোই প্রথম দেখাতেই প্রেম ছিল এমন সহজ কোনো বিষয় ছিল না। বরং এই দীর্ঘ পথচলায় ভালোবাসার আগে জায়গা করে নিয়েছিল গভীর সংশয়, অভিমান এবং নির্মম সমালোচনা। স্পেনের মাটিতে বড় হওয়া এই ফুটবলারকে একসময় আর্জেন্টাইনরা নিজেদের প্রকৃত ‘আপন’ হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনি। বার্সেলোনার হয়ে অবিশ্বাস্য ফুটবল খেলা মেসি যখন জাতীয় দলের জার্সিতে পারফর্ম করতে পারতেন না, তখন প্রশ্ন উঠত; দেশের হয়ে খেলার আবেগ কি তার মধ্যে সমানভাবে কাজ করছে?

এরপর শুরু হয় একের পর এক বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে হারার ট্র্যাজেডি। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ এবং ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা—এই তিনটি ফাইনালের পরাজয় তাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলেছিল। বিশেষ করে ২০১৬ সালের ব্যর্থতার পর তিনি এতটাই হতাশ হয়ে পড়েছিলেন যে ঘোষণা করেছিলেন, জাতীয় দলের সঙ্গে তার পথচলা এখানেই শেষ।

অথচ আজ সেই মেসিকেই বিদায় জানাতে প্রস্তুত পুরো আর্জেন্টিনা। গত এক দশকে বদলে গেছে প্রায় সবকিছু। যে সম্পর্ক একসময় অবিশ্বাসে আচ্ছন্ন ছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে নিঃশর্ত ভালোবাসায়। আর এই আমূল পরিবর্তনের মূলে রয়েছে একটি বিশ্বকাপ জয়।

বেনিনের বিপক্ষে তার বিদায়ী ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭টি ম্যাচে মেসির গোল সংখ্যা ১২৫টি এবং গোলে সহায়তা করেছেন ৬৬বার। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা এবং সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড—উভয়টিই এখন তার দখলে। তবে মেসির আর্জেন্টিনা-গল্পকে কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা কঠিন। কারণ এই যাত্রায় ট্রফির চেয়েও বড় অর্জন ছিল নিজের দেশবাসীকে জয় করা।

শুরুতেই কান্না

২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে আন্তর্জাতিক অভিষেকের মাত্র কয়েক মিনিটের মাথায় লাল কার্ড দেখেছিলেন ১৮ বছর বয়সী তরুণ মেসি। বদলি হিসেবে মাঠে নেমে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার ভিলমোস ভানচাকের সঙ্গে ধস্তাধস্তির পর রেফারি তাকে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন। চোখের পানি নিয়েই মাঠ ছেড়েছিলেন তিনি।

এক বছর পর জার্মানি বিশ্বকাপে প্রথমবার বড় মঞ্চে তার উপস্থিতি দেখা যায়। সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে ৬-০ গোলের জয়ে গোল করেন তিনি। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে টাইব্রেকারে হারের ম্যাচে অতিরিক্ত সময়েও তাকে মাঠে নামাননি কোচ হোসে পেকারম্যান।

২০০৭ কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলের কাছে ৩-০ গোলের হার ছিল মেসির প্রথম বড় ফাইনালের ক্ষত। সে সময় দলের মূল নেতা ছিলেন হুয়ান রোমান রিকেলমে। তবে মেসিকে ঘিরে প্রত্যাশার উচ্চতা যে দ্রুত বাড়ছে, তা তখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

বার্সার মেসি, আর্জেন্টিনার মেসি

২০১০ বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনা মেসিকেই দলের আক্রমণের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছিলেন। কিন্তু পাঁচ ম্যাচে গোল করতে ব্যর্থ হন তিনি। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর শুরু হয় সেই চিরচেনা তুলনা—

“বার্সেলোনায় এত দুর্দান্ত, আর্জেন্টিনায় কেন নয়?”

এক বছর পর নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। উরুগুয়ের কাছে টাইব্রেকারে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায়ের পর তার দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কেউ কেউ তো সরাসরি বলেছিলেন, তিনি যদি দেশের হয়ে খেলতে না চান তবে চলে যান। ম্যারাডোনাকে যে দেশ শুরু থেকেই আপন করে নিয়েছিল, মেসিকে সেই একই জায়গা পেতে অনেক বেশি লড়াই করতে হয়েছে।

তিন বছরে তিন ফাইনালের কান্না

২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে মনে হয়েছিল, সব প্রশ্নের উত্তর এবার পাওয়া যাবে। মেসির নেতৃত্বে ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। প্রতিপক্ষ ছিল আবারও জার্মানি। মারাকানায় ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। ১১৩ মিনিটে মারিও গোটশের গোল আর্জেন্টিনার স্বপ্ন ভেঙে দেয়। সেদিন বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল হাতে পেলেও, ট্রফির পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় মেসির শূন্য দৃষ্টিই ফুটবলবিশ্বের মনে গেঁথে থাকে।

এক বছর পর চিলিতে কোপা আমেরিকার ফাইনাল। সেখানেও হার, এবার স্বাগতিক চিলির কাছে টাইব্রেকারে। এরপর ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কোপা আমেরিকা শতবর্ষী আসর। আবারও ফাইনাল, প্রতিপক্ষ আবারও চিলি এবং আবারও টাইব্রেকার। এবার নিজের শটই উড়িয়ে দেন মেসি।

তিন বছরে তিনটি বড় ফাইনাল হারার পর আর সহ্য করতে পারেননি তিনি। ম্যাচ শেষে ঘোষণা করেন, “জাতীয় দলের সঙ্গে তার সময় শেষ।” মাত্র ২৯ বছর বয়সেই যেন শেষ হয়ে যাচ্ছিল মেসির আর্জেন্টিনা গল্প।

কিন্তু গল্পটা তখনো বাকি ছিল

মেসির অবসর মেনে নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাকে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বদলে আবারও নীল-সাদা জার্সি গায়ে তোলেন তিনি। তবে ফিরে এসেই সাফল্য আসেনি। ২০১৮ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোতে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হার এবং ২০১৯ কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে বিদায়। তখন মেসির বয়স ৩২, জাতীয় দলের হয়ে কোনো বড় শিরোপা নেই এবং সময়ও ফুরিয়ে আসছিল।

ঠিক সেই মুহূর্তেই শুরু হয় লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনা। স্কালোনি কেবল মেসিকে ঘিরে দল গড়েননি, বরং এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছিলেন যেখানে সবকিছুর ভার একা মেসিকে বইতে হতো না। পাশে এলেন রদ্রিগো দি পল, লাউতারো মার্তিনেজ এবং এমিলিয়ানো মার্তিনেজের মতো নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রা। আর সেই দলই বদলে দিল পুরো ইতিহাস।

মারাকানায় ভাঙল অভিশাপ

২০২১ সালের ১০ জুলাই। মারাকানা স্টেডিয়াম। প্রতিপক্ষ ব্রাজিল। আর্জেন্টিনার সঙ্গে মেসির সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাত। আনহেল দি মারিয়ার গোলে ব্রাজিলকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জিতল আর্জেন্টিনা। সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে মেসির প্রথম বড় শিরোপা এটি। শেষ বাঁশির পর সতীর্থরা তাকে ঘিরে ধরেছিলেন এবং আকাশে ছুড়ে দিচ্ছিলেন। যে মানুষটিকে বছরের পর বছর ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল, এবার তাকেই ঘিরে জমেছিল আর্জেন্টিনার উৎসব। সেখান থেকেই সম্পর্কের ভাষা বদলে যায়।

২০২২ সালে ওয়েম্বলিতে ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা জয় এবং এরপর কাতার বিশ্বকাপ।

যে বিশ্বকাপ সব বদলে দিল

সৌদি আরবের কাছে হেরে শুরু হয়েছিল ২০২২ বিশ্বকাপ। এরপর একে একে মেক্সিকো, পোল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস এবং ক্রোয়েশিয়াকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে আসা। আর সবশেষে ফ্রান্স। লুসাইলের সেই ফাইনাল যেন মেসির পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ; যেখানে ছিল আনন্দ, বিপর্যয়, ঘুরে দাঁড়ানো এবং শেষ হাসি।

টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে হারানোর পর বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুললেন মেসি। সেই একটি ছবিই বহু বছরের বিতর্ক মিটিয়ে দিল। ম্যারাডোনার মতো বিশ্বকাপ নেই—এই শেষ যুক্তিটুকুও আর রইল না। কাতারের পর আর্জেন্টিনার কাছে মেসিকে আর কিছু প্রমাণ করতে হয়নি। যে মানুষটির দেশপ্রেম নিয়ে একসময় প্রশ্ন উঠেছিল, তার নামেই তখন বুয়েনস আইরেসের রাস্তায় গান বাজছিল।

তারপরও থামেননি

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আবারও কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা। ফাইনালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখে স্কালোনির দল। ৩৯ বছর বয়সে ২০২৬ বিশ্বকাপেও মেসি কেবল অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকেননি। আট গোল ও চার গোলে সহায়তা করে আবারও আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। সেখানে স্পেনের কাছে হেরে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভাঙলেও, এবার পরাজয়ের পর তার দিকে অভিযোগের আঙুল ওঠেনি। কারণ ততদিনে সম্পর্কটি সম্পূর্ণ বদলে গেছে।

২০১৬ সালের পরাজিত মেসি চারপাশের চাপ আর নিজের হতাশা নিয়ে জাতীয় দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আর ২০২৬ সালের মেসি বিদায় নিচ্ছেন এমন একটি দেশ থেকে, যারা তাকে আর যেতে দিতে চায় না।

শেষটা তাই ঘরেই

আজ মনুমেন্টালে বেনিনের বিপক্ষে শেষবারের মতো আর্জেন্টিনার জার্সি পরবেন মেসি। আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এই বিদায়বেলার নাম দিয়েছে ‘শেষ ট্যাঙ্গো’। তাদের ভাষায়, “শেষ ট্যাঙ্গোটা আর্জেন্টিনাতেই হতে হতো। কারণ কিছু নাচ কেবল ঘরেই শেষ করা যায়।”

২১ বছরের দীর্ঘ পথচলায় এই কথাটি মেসির ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি মানানসই। কারণ তার আর্জেন্টিনা-গল্পটি কখনোই সহজ ছিল না। অভিষেকেই লাল কার্ড, দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন, বিশ্বকাপ ফাইনালের কান্না, পরপর দুই কোপার হতাশা এবং অবসর—সব বাধা পেরিয়েই এসেছিল মারাকানা ও লুসাইল। একসময় আর্জেন্টিনা জানতে চাইত, মেসি তাদের জন্য কতটা। বিদায়ের দিনে প্রশ্নটি এখন ঠিক উল্টো—মেসি ছাড়া আর্জেন্টিনা কেমন হবে?

*দিয়ারিও এস অবলম্বনে