লা লিগা সভাপতি হাভিয়ের তেবাস রিয়াল মাদ্রিদের টেলিভিশন চ্যানেলের প্রচারকৌশলকে নাৎসি জার্মানির প্রচারমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলসের পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় রিয়াল মাদ্রিদ তেবাসের পদত্যাগের দাবি জানালে, পাল্টা এক বিবৃতিতে ক্লাবটির বিরুদ্ধে স্পেনের ঘরোয়া ফুটবল প্রতিযোগিতাকে ধ্বংস করার চেষ্টার অভিযোগ তোলেন লা লিগা প্রধান।

তেবাসের দাবি, সুপার লিগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়ে রিয়াল মাদ্রিদ এখন তাদের নিজস্ব প্রচারমাধ্যম এবং সমর্থকদের মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর বয়ান ছড়িয়ে স্প্যানিশ ফুটবলের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে।

গত শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টের মাধ্যমে এই বিতর্কের সূত্রপাত করেন তেবাস। তিনি অভিযোগ করেন, রিয়াল মাদ্রিদ টিভি (আরএমটিভি) তাদের আসন্ন ম্যাচের রেফারিদের বিষয়ে পছন্দমতো ঘটনা বেছে নিয়ে প্রচার চালায়, যার ফলে রেফারিদের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানির প্রচারমন্ত্রী গোয়েবলসের ব্যবহৃত কৌশলের সঙ্গে তিনি এই পদ্ধতির মিল খুঁজে পান।

তেবাসের ভাষায়, “রিয়াল মাদ্রিদের ম্যানেজমেন্ট যেন তোতা পাখিদের একটি দল পরিচালনা করছে, আর সেই দলের মূল সুর তুলছে রিয়াল মাদ্রিদ টিভি। তাদের সেই চেনা গান সব সময় একই রকম: নিজেদের সুবিধামতো ম্যাচের অংশ বেছে নেওয়া, বারবার ক্ষোভ প্রকাশ করা, সন্দেহের বীজ বুনে দেওয়া এবং শত্রুদের দিকে আঙুল তোলা। এটি গোয়েবলসের ব্যবহৃত প্রচারকৌশলের কথা মনে করিয়ে দেয়।”

তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান যে, তাঁর এই তুলনাটি নাৎসি মতাদর্শের সঙ্গে নয়, বরং শুধুমাত্র প্রচারকৌশলের সঙ্গে করা হয়েছে।

এর কয়েক ঘণ্টা পর রিয়াল মাদ্রিদ এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তেবাসের পদত্যাগের দাবি জানায়। ক্লাব কর্তৃপক্ষের মতে, স্প্যানিশ ফুটবলের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে এমন তুলনা “অগ্রহণযোগ্য ও অত্যন্ত গুরুতর”।

রিয়ালের এই বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় পুনরায় একটি দীর্ঘ পোস্ট করেন তেবাস। সেখানে তিনি লেখেন, “আমার মূল কথা হলো তারা এই ঘরোয়া প্রতিযোগিতাটিকে ধ্বংস করতে চায়। এত দিন যা তারা সুপার লিগ দিয়ে অর্জন করতে পারেনি, তা এখন নিজেদের মিডিয়া ও অনুগত সাংবাদিকদের দিয়ে একটি বিকৃত গল্প সাজিয়ে হাসিল করার চেষ্টা করছে। তারা যে প্রতিযোগিতায় নিজেরা খেলছে, তার মর্যাদা নষ্ট করতে করতে এটাকেই আবার তারা!“সংস্কার” বা পুনর্গঠন বলছে!”

সাবেক রেফারি কর্মকর্তা হোসে মারিয়া এনরিকেস নেগ্রেইরার বিষয়ে বার্সেলোনার বিরুদ্ধে রিয়াল মাদ্রিদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তেবাস। সংবাদমাধ্যম রেলেভোর তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি জানান, এক সময়ে পেরেজ এবং বার্সেলোনা সভাপতি হোয়ান লাপোর্তা একই দিনে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। এছাড়া ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর রিয়াল মাদ্রিদের সদস্যদের সভায় বার্সেলোনার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে জানতে চাইলে পেরেজ বলেছিলেন, “বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদকে একে অপরকে সাহায্য করতে হবে।” সেই সময় তিনি আরও বলেছিলেন, “আমরা কেন রাগ করব?”

তেবাস প্রশ্ন তোলেন, বার্সেলোনার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এবং সুপার লিগ প্রকল্প থেকে ক্লাবটির সরে আসার পর রিয়ালের অবস্থানে এই আকস্মিক পরিবর্তন কেন এল? নেগ্রেইরা-কাণ্ডের গুরুত্ব কি বদলেছে, নাকি বদলেছে রিয়ালের নিজস্ব স্বার্থ? এছাড়া আগে রিয়াল মাদ্রিদ টিভি কেন এই বিষয়ে একইভাবে সরব ছিল না, সেই প্রশ্নও করেন তিনি।

রেফারিদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের ভিত্তি নিয়েও রিয়ালকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন তেবাস। তিনি বলেন, নেগ্রেইরাকে অর্থ প্রদান বন্ধ হওয়ার আট বছর পরও যদি রিয়াল বিশ্বাস করে যে রেফারিরা তাঁর প্রভাবের অধীনে কাজ করছেন, তবে প্রতিটি রেফারির বিরুদ্ধে তাদের কাছে থাকা প্রমাণগুলো প্রকাশ করতে হবে।

স্পেনের রেফারিং ব্যবস্থায় সংস্কার চলছে এবং আরও কাজ বাকি আছে উল্লেখ করে তেবাস লিখেছেন, রিয়াল মাদ্রিদের নেতৃত্বের ইচ্ছা, স্বার্থ, মেজাজ, মাঠের ফলাফল কিংবা বার্সেলোনার সঙ্গে সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠানগুলো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এক্ষেত্রে অন্যান্য ক্লাবের অবস্থান ও সমর্থন বিবেচনা করা জরুরি। তেবাসের ভাষায়, “সংস্কার করার অর্থ তাদের নির্দেশ মেনে চলা নয়।”

ম্যাচের সময়সূচি নিয়েও পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন লা লিগা সভাপতি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত কিছু তথ্যের সত্যতা অস্বীকার করতে বলা হলে তিনি জানান, ক্লাবটি যদি মনে করে অভিযোগগুলো মিথ্যা, তবে সরাসরি তা অস্বীকার করুক। রিয়াল কতবার ম্যাচের দিন বা সময় পরিবর্তনের অনুরোধ করেছে, কতগুলো অনুরোধ মঞ্জুর হয়েছে এবং সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে অন্য আয়োজনের সঙ্গে সূচি মেলাতে কতবার পরিবর্তন চাওয়া হয়েছে—সেই সব তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি।

তেবাসের মতে, স্বচ্ছতার দাবি করলে সব তথ্য প্রকাশ করা উচিত, কেবল নিজেদের বক্তব্যের পক্ষে যায় এমন তথ্য নয়।

বিবৃতির শেষ অংশে রিয়াল মাদ্রিদের বিরুদ্ধে ভয় দেখানোর অভিযোগ আনেন তেবাস। তাঁর দাবি, ক্লাবটির নেতৃত্বের সমালোচনাকে কৌশলে ক্লাব ও সমর্থকদের ওপর আক্রমণ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “এসবের একটি নাম আছে—ভয় দেখানো। একে আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মোড়কে প্রকাশ করলেই তা সংস্কার হয়ে যায় না।”