রিয়াল মাদ্রিদ ও লা লিগা সভাপতি হাভিয়ের তেবাসের বিরোধ নতুন কিছু নয়। তবে এবার সেই বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। রিয়ালের প্রচারকৌশলকে নাৎসি জার্মানির প্রচারণার সঙ্গে তুলনা করেছেন তেবাস। এমন মন্তব্যে ক্ষুব্ধ রিয়াল মাদ্রিদ তার পদত্যাগ দাবি করেছে। শুধু লা লিগার সভাপতি নয়, স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের সহসভাপতির পদ থেকেও তাকে সরে যেতে বলেছে ক্লাবটি। তবে তেবাসও চুপ থাকেননি। পাল্টা জবাবে রিয়ালের বিরুদ্ধে ভয় দেখানোর অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দীর্ঘ একটি পোস্ট দেন তেবাস। সেখানে রিয়াল মাদ্রিদের পরিচালনা পর্ষদ ও ক্লাবটির নিজস্ব টেলিভিশন চ্যানেল রিয়াল মাদ্রিদ টিভির সমালোচনা করেন তিনি। বিশেষ করে রেফারিংয়ের সিদ্ধান্ত ও ম্যাচের সূচি নিয়ে ক্লাবটির ধারাবাহিক অভিযোগ এবং সেগুলো প্রচারের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন লা লিগা সভাপতি।
তেবাসের অভিযোগ, রিয়াল মাদ্রিদ টিভি নিজেদের পক্ষে যায় এমন ঘটনাগুলো বেছে নিয়ে বারবার প্রচার করে। এর মাধ্যমে ক্লাবটির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে, এমন ধারণা তৈরির চেষ্টা চালানো হয়।
এক্সে তেবাস লেখেন, ‘রিয়াল মাদ্রিদের কর্তারা একদল প্রচারককে দিয়ে নিজেদের বক্তব্য ছড়াচ্ছেন। আর তাতে প্রধান ভূমিকা রাখছে রিয়াল মাদ্রিদ টিভি।’
এরপরই বিতর্কিত তুলনাটি টানেন তিনি। তেবাসের ভাষায়, ‘তাদের কৌশল সব সময় একই। নিজেদের সুবিধামতো ঘটনা বেছে নেওয়া, অভিযোগ বারবার প্রচার করা, সন্দেহ তৈরি করা এবং শত্রু চিহ্নিত করা। এই পদ্ধতি নাৎসি জার্মানির প্রোপাগান্ডা মন্ত্রী গোয়েবলসের ব্যবহৃত প্রচারকৌশলের কথা মনে করিয়ে দেয়।’
তবে নিজের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট করেছেন তেবাস। তার দাবি, এই তুলনা শুধু প্রচারণার কৌশলের সঙ্গে, নাৎসি মতাদর্শ কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের সমর্থকদের সঙ্গে নয়।
তাতেও অবশ্য ক্ষোভ কমেনি রিয়ালের। তেবাসের পোস্টের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাঁচ দফার আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করে ক্লাবটি। সেখানে তার মন্তব্যকে ‘গভীরভাবে আপত্তিকর’, ‘নৈতিকভাবে জঘন্য’ এবং দায়িত্বশীল পদে থাকা একজন কর্মকর্তার জন্য ‘অমর্যাদাকর’ বলে উল্লেখ করা হয়।
রিয়ালের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘স্প্যানিশ ফুটবলের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা একজন ব্যক্তি আমাদের ক্লাব, পরিচালনা পর্ষদ ও টেলিভিশন চ্যানেলকে হেয় করতে নাৎসি শাসনের প্রচারণার কৌশলের সঙ্গে তুলনা করবেন, এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং অত্যন্ত গুরুতর।’
তেবাসের ব্যাখ্যাতেও সন্তুষ্ট নয় ক্লাবটি। তাদের বক্তব্য, নাৎসি মতাদর্শের সঙ্গে তুলনা করেননি বলে ব্যাখ্যা দিলেও মন্তব্যটির আপত্তিকর ও অবমাননাকর চরিত্র বদলে যায় না।
শুধু সাম্প্রতিক মন্তব্য নয়, তেবাসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে রিয়ালকে লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানোর অভিযোগও তুলেছে ক্লাবটি। তাদের দাবি, লা লিগা সভাপতি হিসেবে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের পরিবর্তে তিনি বারবার রিয়াল, ক্লাব সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ এবং ক্লাবের সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণ করছেন।
বিবৃতিতে রিয়াল বলেছে, ‘হাভিয়ের তেবাসের ধারাবাহিক আচরণে নিরপেক্ষতা, শ্রদ্ধা ও পক্ষপাতহীনতার অভাব স্পষ্ট। তার প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের সঙ্গে এমন আচরণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’
Official Statement
https://t.co/cueXtdga07 — Real Madrid C.F. 🇬🇧🇺🇸 (@realmadriden) October 16, 2026
Official Statement
https://t.co/cueXtdga07
এ কারণে লা লিগার সভাপতির পাশাপাশি স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের সহসভাপতির পদ থেকেও তেবাসের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেছে রিয়াল মাদ্রিদ।
তবে রিয়ালের এমন দাবির পর চুপ থাকেননি তেবাসও। শুক্রবার সন্ধ্যায় এক্সে আরেকটি দীর্ঘ পোস্ট দিয়ে পাল্টা জবাব দেন তিনি। তার অভিযোগ, রিয়াল মাদ্রিদের নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই তাকে পদত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা করছে।
তেবাস লেখেন, ‘গত ১৩ বছরে রিয়াল মাদ্রিদের কর্মকর্তারা কতবার আমার পদত্যাগ চেয়েছেন কিংবা আমাকে অযোগ্য ঘোষণার চেষ্টা করেছেন, তার হিসাব হারিয়ে ফেলেছি।’
রিয়ালের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিকে ভয় দেখানোর চেষ্টা হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, কোনো ক্লাবের চাপের মুখে নীরব থাকা লা লিগা সভাপতির কাজ নয়। প্রতিযোগিতার স্বার্থ রক্ষায় স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে তাকে।
তেবাসের অভিযোগ, রিয়াল মাদ্রিদের নেতৃত্ব স্প্যানিশ লিগের সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করছে। ইউরোপিয়ান সুপার লিগ প্রকল্পের মাধ্যমে যা অর্জন করতে পারেনি, এখন নিজেদের প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে সেই উদ্দেশ্য পূরণের চেষ্টা করছে বলে দাবি তার।
দুই পক্ষের এই বিরোধের অন্যতম কারণ স্প্যানিশ ফুটবলের রেফারিং ব্যবস্থা। সাম্প্রতিক সময়ে রেফারিদের একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানিয়েছেন রিয়াল কোচ হোসে মরিনিও। ক্লাবটির নিজস্ব টেলিভিশন চ্যানেলেও বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রচার করা হচ্ছে।
তবে শুধু রেফারিং নয়, ম্যাচের সূচি নিয়েও রিয়ালের অভিযোগের সমালোচনা করেছেন তেবাস। তার দাবি, ক্লাবটির অনুরোধে বিভিন্ন সময় ম্যাচের দিন ও সময় পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু সেসব সিদ্ধান্তের কথা না বলে শুধু প্রত্যাখ্যাত আবেদনগুলো সামনে আনা হয়। এতে লা লিগা ইচ্ছাকৃতভাবে রিয়ালের ক্ষতি করছে, এমন ধারণা তৈরির চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ তার।
গত মাসেও তেবাসকে নিয়ে একই ধরনের বিরোধে জড়িয়েছিল রিয়াল। ২০ সেপ্টেম্বর আতলেটিকো মাদ্রিদের কাছে হারের পর রেফারিং নিয়ে ক্লাবটির অভিযোগের সমালোচনা করেছিলেন লা লিগা সভাপতি। পাল্টা বিবৃতিতে রিয়াল বলেছিল, প্রতিযোগিতা পরিচালনার জন্য নিরপেক্ষ নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন।
এবারের বিবৃতিতে আবারও আলোচনায় এসেছে বার্সেলোনার সাবেক রেফারি কর্মকর্তা হোসে মারিয়া এনরিকেজ নেগ্রেইরাকে অর্থ দেওয়ার ঘটনা। বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত নিশ্চিত করতে উয়েফার দ্বারস্থ হওয়ার কথা জানিয়েছে রিয়াল। পাশাপাশি স্পেনের রেফারিং ব্যবস্থা ও ফুটবল প্রশাসনে ব্যাপক সংস্কারের দাবি জানিয়েছে ক্লাবটি।
বার্সেলোনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, নেগ্রেইরাকে দেওয়া অর্থের বিনিময়ে ক্লাবটি অনৈতিক সুবিধা নিয়েছে। তবে এমন কোনো অনিয়মের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে কাতালান ক্লাবটি।
এদিকে পাল্টা বিবৃতিতে নেগ্রেইরা মামলায় লা লিগা নিষ্ক্রিয় ছিল বলে রিয়ালের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছেন তেবাস। তার দাবি, বিষয়টি সামনে আসার পর থেকেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে লা লিগা।
তেবাস ও রিয়াল সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের বিরোধ অবশ্য এক দশকেরও বেশি পুরোনো। ইউরোপিয়ান সুপার লিগ, লা লিগার সম্প্রচারস্বত্ব, বিনিয়োগ প্রকল্প, ম্যাচের সূচি ও রেফারিং ব্যবস্থাসহ নানা বিষয়ে তাদের মতবিরোধ রয়েছে।