ফুটবল বিশ্বে সমর্থকদের প্রায়ই দলের 'দ্বাদশ খেলোয়াড়' হিসেবে অভিহিত করা হয়। গ্যালারি থেকে আসা তাঁদের স্বতঃস্ফূর্ত গর্জন অনেক সময় প্রতিপক্ষ দলকে মানসিক চাপে ফেলে দেয়, আবার কখনো নিজেদের খেলোয়াড়দের বাড়তি অনুপ্রেরণা ও শক্তি জোগায়। তবে সেই সমর্থকরাই যখন মাঠের শৃঙ্খলা ভেঙে সীমা ছাড়িয়ে যান, তখন তাঁদের প্রিয় ক্লাবটিই বড় ধরনের বিপদে পড়ে। বার্সেলোনার ক্ষেত্রে বর্তমানে ঠিক তেমনটিই ঘটেছে।
এল ক্লাসিকোতে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে হারের গ্লানি এখনো কাটেনি কাতালান ক্লাবটির। এরই মাঝে নিজেদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়েছে বার্সেলোনা। গত রোববার রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে ম্যাচে সমর্থকদের চরম অসদাচরণের পরিপ্রেক্ষিতে ‘গোল ১৯৫৭’ নামের সংগঠিত সমর্থকগোষ্ঠীগুলোকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। ফলে আগামী রোববার লা লিগায় আলাভেসের বিপক্ষে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত ম্যাচে ক্যাম্প ন্যুর ‘গ্রাদা দ’আনিমাসিওন’ নামক সমর্থকদের জন্য নির্ধারিত গ্যালারিটি বন্ধ থাকবে।
ক্লাব কর্তৃপক্ষ কেন এমন কঠোর পদক্ষেপ নিল? জানা গেছে, রোববারের এল ক্লাসিকো ম্যাচে বার্সেলোনা সমর্থকদের বিরুদ্ধে মোট ১০টি শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে লা লিগা। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি রিয়াল মাদ্রিদের মিডফিল্ডার এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গাকে কেন্দ্র করে। রিয়ালের জয়সূচক গোলের পর গ্যালারির ওই নির্দিষ্ট অংশে অবস্থানরত এক সমর্থক পতাকা দিয়ে কামাভিঙ্গাকে আঘাত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, রিয়ালের কোচ জোসে মরিনিও এবং দলের বাঁ প্রান্তের ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়াকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত অপমানজনক মন্তব্য করেছেন বার্সেলোনার সমর্থকেরা। উল্লেখ্য, কুকুরেয়া একসময় বার্সেলোনার যুবদলে খেলেছেন।
এই সমস্ত অপ্রীতিকর ঘটনা লা লিগার শৃঙ্খলা কমিটির কাছে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। বার্সেলোনা তাদের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘খেলাধুলার মূল্যবোধের পরিপন্থী আচরণের কারণে ক্লাব ও এর কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত শুরু হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এ ধরনের আচরণের কারণে ক্লাবকে আর্থিক জরিমানা দিতে হতে পারে। এমনকি স্টেডিয়াম বন্ধ করে দেওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। পাশাপাশি এতে ক্লাবের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
তবে সমর্থকদের জন্য সব পথ একেবারে বন্ধ করে দিচ্ছে না বার্সেলোনা। ক্লাব কর্তৃপক্ষ আশ্বস্ত করেছে যে, সমস্যা সমাধানে ‘গোল ১৯৫৭’–এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে খুব শীঘ্রই বৈঠক করা হবে। এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো, আগামী ৩ নভেম্বর চ্যাম্পিয়নস লিগে অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত ম্যাচে যেন সমর্থকেরা পুনরায় গ্যালারিতে ফিরতে পারেন।
‘গোল ১৯৫৭’ নামটির সঙ্গে বার্সেলোনার দীর্ঘ ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ১৯৫৭ সালে প্রথমবারের মতো উদ্বোধন করা হয়েছিল ক্যাম্প ন্যু। সেই ঐতিহাসিক বছরটিকে স্মরণ করেই সমর্থকদের এই বিশেষ অংশের নামকরণ করা হয়েছে। স্টেডিয়ামের দক্ষিণ গ্যালারির নিচের অংশটি মূলত সংগঠিত সমর্থকগোষ্ঠীগুলোর জন্য নির্ধারিত, যা চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রথম চালু করা হয়। শুরুতে সেখানে ৮০০ জন সমর্থকের বসার জায়গা রাখা হয়েছিল।
সমর্থকদের আচরণের কারণে গ্যালারি বন্ধ করার ঘটনা বার্সেলোনার জন্য নতুন কিছু নয়। ২০২৪ সালের নভেম্বরে যখন ক্যাম্প ন্যুর সংস্কারকাজ চলছিল, তখন বার্সেলোনার সাময়িক ঘরের মাঠ ছিল এস্তাদি অলিম্পিক লুইস কোম্পানিস। সে সময়ও সমর্থকদের অসদাচরণের ফলে জরিমানার মুখে পড়ে সেখানকার ‘এসপাই দ’আনিমাসিও’ নামের নির্ধারিত অংশটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিল ক্লাবটি। সেবার বার্সেলোনার দাবি ছিল, ক্লাবের সঙ্গে সমর্থকগোষ্ঠীগুলোর চুক্তির শর্তাবলী পূরণ না করায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বর্তমান এই সংকট এমন এক সময়ে সামনে এল যখন মাঠের পারফরম্যান্স নিয়েও চরম চাপে রয়েছে বার্সেলোনা। চ্যাম্পিয়নস লিগে পিএসজির কাছে হারের পর এল ক্লাসিকোয় রিয়াল মাদ্রিদের কাছেও পরাজিত হয়েছে হান্সি ফ্লিকের দল। যদিও লা লিগার পয়েন্ট তালিকায় তারা এখনো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।