বার্সেলোনা ১-২ রিয়াল মাদ্রিদ

স্প্যানিশ লা লিগায় বার্সেলোনার অপরাজেয় জয়যাত্রায় ইতি টানলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ক্যাম্প ন্যুতে অনুষ্ঠিত মৌসুমের প্রথম এল ক্লাসিকোয় জোড়া গোল করে ২-১ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেছেন রিয়াল মাদ্রিদ। লিগে টানা ৯টি ম্যাচ জয়ের পর এই ম্যাচে এসে প্রথমবারের মতো পরাজয়ের স্বাদ পেল বার্সা।

ক্যাম্প ন্যুর মাঠে লিগে টানা ২৩ ম্যাচ জয়ের যে রেকর্ড ছিল, তা ভেঙে গেল এই পরাজয়ের মাধ্যমে। এমবাপ্পের অসাধারণ পারফরম্যান্সের সামনে কার্যত তছনছ হয়ে গেছে বার্সার রক্ষণভাগ। ক্যাম্প ন্যুতে তাঁর আধিপত্য যেন এক রহস্য। কারণ, ৪১ মিনিটে রিয়ালের এগিয়ে যাওয়ার সেই মুহূর্তটি ছিল নাটকীয়।

ম্যাচের ৪১ মিনিটে ডান প্রান্ত থেকে ইয়ান দিওমান্দের একটি ক্রস ক্লিয়ার করতে গিয়ে ভুল করেন বার্সা ডিফেন্ডার মার্তিন। সেই ভুলের সুযোগ নিয়ে বলটি চলে যায় দ্রুতগতির এমবাপ্পের পায়ে। ছুটন্ত এমবাপ্পের পায়ের এক অনিচ্ছাকৃত টোকায় বল জালে জড়ায়। তবে ক্যাম্প ন্যুতে এমবাপ্পের গোল করার প্রবণতা দীর্ঘদিনের; বার্সার বিপক্ষে ১১ ম্যাচে এটি তাঁর ১৩তম গোল, যার মধ্যে ১০টিই এসেছে এই মাঠের মাটিতে।

তবে এই জয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তটি অর্থাৎ তাঁর ১১তম গোলটি পেতে এমবাপ্পেকে অপেক্ষা করতে হয় ম্যাচের ৮৭ মিনিট পর্যন্ত। এর আগে ৬১ মিনিটে রাফিনিয়ার গোলে ম্যাচে সমতা ফিরিয়ে এনেছিল বার্সেলোনা।

ম্যাচ শেষে রিয়ালের কোচ জোসে মরিনিও সম্ভবত গোলকিপার আন্দ্রে লুনিনকে আলাদা করে ধন্যবাদ জানাবেন। কারণ, এই ম্যাচে রিয়ালের মূল একাদশে তাঁর থাকার কথা ছিল না। নিয়মিত গোলকিপার থিবো কোর্তোয়া ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ায় সুযোগ পান লুনিন। ৬৫ মিনিটে জেরার্দ মার্তিনের হেডে বার্সা নিশ্চিত গোল পাওয়ার কথা থাকলেও ইউক্রেনের এই গোলকিপারের অবিশ্বাস্য সেভে তা ব্যর্থ হয়। ডান দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে লুনিন মার্তিনকে প্রথমার্ধে করা ভুলের শাপমোচন করার সুযোগ দেননি। এছাড়া প্রথমার্ধে বার্সার উইঙ্গার অ্যান্থনি গর্ডনের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শটও রুখে দেন লুনিন।

এমবাপ্পের প্রথম গোলের পর সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে বার্সা। পিছিয়ে পড়ার মাত্র তিন মিনিট পরেই তারা সেরা সুযোগটি পায়। পেদ্রির এক দারুণ পাসে লুনিনকে একা পেয়ে গিয়েছিলেন লামিনে ইয়ামাল। কিন্তু বলটি কাছের পোস্টের বাইরে চলে যায়। কোন পোস্টে বল মারবেন, সেই দ্বিধায় ছিলেন কি না, তা সম্ভবত ইয়ামাল নিজেই ভালো জানেন।

তবে রাফিনিয়া তেমন দ্বিধায় ছিলেন না। বক্সের ডান দিকে পেদ্রির পাস থেকে ডিফেন্ডারকে পেছনে রেখেই নিখুঁত শটে ৬১ মিনিটে গোল করেন এই ব্রাজিলিয়ান তারকা। এই গোলের ফলে লিগে ৯ ম্যাচে ১৩ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় উঠে এলেন রাফিনিয়া। এল ক্লাসিকোয় এটি তাঁর ৮ম এবং মৌসুমে ১১ ম্যাচে ১৫তম গোল। রাফিনিয়ার গোলে সমতায় ফেরার পর ক্যাম্প ন্যুর গ্যালারি তখন উল্লাসে ফেটে পড়েছিল। কিন্তু সেই গর্জন স্তব্ধ করে দিতে এমবাপ্পের সময় লেগেছে মাত্র ২৬ মিনিট।

এল ক্লাসিকোর ইতিহাসে ৭ ম্যাচে ৮ গোল করেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। একুশ শতকের এল ক্লাসিকোয় প্রথম ৭ ম্যাচে এটি সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। এর আগে লিওনেল মেসির রেকর্ড ছিল ৬ গোলের।

ম্যাচের শেষ দিকে বদলি খেলোয়াড় এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গার ডান দিক থেকে দেওয়া ক্রসে ফাঁকা পোস্ট পান এমবাপ্পে। সহজ শটে রিয়ালের হয়ে নিজের ১০০তম গোল (১১৬ ম্যাচে) পূর্ণ করেন তিনি। এল ক্লাসিকোয় এমবাপ্পের এই ৮ম গোলেই শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালের পর ক্যাম্প ন্যুতে প্রথম জয় পেল রিয়াল মাদ্রিদ।

প্রথম গোল করার পরপরই বার্সার পোস্টে বল না মারলে হয়তো ১০১তম গোলটিও পেতে পারতেন এমবাপ্পে। প্রথমার্ধেও গোল করার সুযোগ ছিল তাঁর। আরদা গুলেরের সঙ্গে আক্রমণে দারুণ যুগলবন্দী দেখা গেছে, যার ফলে গুলেরের পাস থেকে দুটি ভালো সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি, যদিও তা কাজে লাগাননি। তবে প্রথমার্ধে বার্সাই আধিপত্য বিস্তার করেছিল।

প্রথম ১৫ মিনিটের মধ্যেই রাফিনিয়া ও ইয়ামাল ভালো সুযোগ থেকে বল পোস্টের বাইরে মারেন। গর্ডনের শট রুখে দেন লুনিন। প্রথমার্ধে ৫৯ শতাংশ বল দখলে রেখে বার্সাই বেশি (৫টি) সুযোগ তৈরি করলেও তা গোলে রূপান্তর করতে পারেনি। আর এমবাপ্পে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে থামিয়ে দিয়েছেন বার্সার জয়যাত্রা। এর ফলে লিগে ১০ ম্যাচে ১১ এবং মৌসুমে ১৩ ম্যাচে ১৪ গোলের tally পূর্ণ হলো এমবাপ্পের।

হান্সি ফ্লিকের দল লিগে প্রথম ৯ ম্যাচে ৩৯ গোল করলেও আজ গোলের পথ খুঁজে পেতে হিমশিম খেয়েছে। রিয়ালের রক্ষণে চুয়ামেনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সেই আক্রমণগুলো প্রতিহত করেছেন।

১০ ম্যাচে ২৭ পয়েন্ট নিয়ে লিগ টেবিলের শীর্ষে বার্সেলোনা। সমান ম্যাচে ২৪ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্থানে রিয়াল মাদ্রিদ। আজকের জয়ের ফলে শীর্ষের সঙ্গে ব্যবধান ছয় পয়েন্ট থেকে কমিয়ে তিন পয়েন্টে নামিয়ে এনেছেন মরিনিওর দল। অন্যদিকে ১০ ম্যাচে ২৫ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছে আতলেতিকো মাদ্রিদ।

সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এটি বার্সার টানা দ্বিতীয় হার। গত মঙ্গলবার চ্যাম্পিয়নস লিগে পিএসজির মাঠে তারা ৪-২ গোলে হেরেছিল। অন্যদিকে, রিয়ালে দ্বিতীয় মেয়াদে কোচের দায়িত্ব পাওয়া জোসে মরিনিও ১৩ বছর পর এল ক্লাসিকোয় ফিরেই জয় পেলেন।