শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, নদীর তীরে কাশফুলের দোলা আর ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে শিউলির মিষ্টি সুবাস জানান দিচ্ছে দেবীপক্ষের আগমন। এরই মধ্যে দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের বাদ্যনাদ জানান দেয় উৎসবের শুরু। পূজামণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা, প্রতিমার গায়ে রং-তুলির শেষ আঁচড় দেওয়া হচ্ছে, আলোকসজ্জার প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। আর রান্নাঘরে বিশাল হাঁড়িতে ভোগ রান্নার ব্যস্ততা সব মিলিয়ে জানান দেয়, ঘরের দুয়ারেই শারদীয় দুর্গোৎসব। দেবী দুর্গার আরাধনাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই উৎসব কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গা নয়, বরং বাঙালির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। পূজার মন্ত্রোচ্চারণ, অঞ্জলি, আরতি, ঢাক-শঙ্খের শব্দ যেমন উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তেমনি ভোগের খিচুড়ি, লাবড়া, পায়েস, মিষ্টি ও প্রসাদও হয়ে উঠেছে এক বড় আকর্ষণ।
দুর্গাপূজার ষষ্ঠী মানেই উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা। মণ্ডপে মণ্ডপে পূজার আয়োজন, ঢাকের বাদ্যি, নতুন পোশাকের আনন্দ আর সেই সঙ্গে খাবারের আয়োজনেও থাকে বিশেষ কিছু পদ। ষষ্ঠীর দিনে ঘরোয়া আয়োজনে রাখা যেতে পারে নানা স্বাদের দেশি খাবার থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদের মিষ্টান্ন। চলুন জেনে নেওয়া যাক দুর্গাপূজার ষষ্ঠী ও সপ্তমীতে কী কী খাবারের আয়োজন করা যায় এবং তার প্রস্তুত প্রণালি।
ভোগের খিচুড়ি
উপকরণসমূহ:
সুগন্ধি চাল- ২ কাপ, মুগ ডাল- ১ কাপ, আলু- ২টি, ফুলকপি- ১ কাপ, শিম- ১ কাপ, মটরশুঁটি- আধা কাপ, আদা বাটা- ১ টেবিল চামচ, হলুদ- আধা চা চামচ, জিরা- ১ চা চামচ, তেজপাতা- ২টি, শুকনো মরিচ- ২টি, ঘি- ১ টেবিল চামচ, লবণ- স্বাদমতো এবং পানি- পরিমাণমতো।
রান্নার প্রণালি:
প্রথমে মুগ ডাল হালকা ভেজে ধুয়ে নিতে হবে। চালও ভালোভাবে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে রাখতে হবে। কড়াইয়ে ঘি গরম করে তেজপাতা, শুকনো মরিচ ও জিরার ফোড়ন দিতে হবে। এরপর আদা বাটা দিয়ে চাল ও ডাল প্যানে ঢেলে দিতে হবে। কিছুটা সময় কষিয়ে নিয়ে আলু, ফুলকপি, শিম ও মটরশুঁটি যোগ করে হলুদ ও লবণ দিতে হবে। প্রয়োজনমতো পানি দিয়ে ঢেকে রান্না করতে হবে। খিচুড়ি সেদ্ধ হয়ে মাখামাখা হলে নামিয়ে নিতে হবে। এভাবেই খুব কম উপকরণে তৈরি করা যায় ভোগের খিচুড়ি।
লাবড়া
উপকরণসমূহ:
মিক্সড সবজি- ৫ থেকে ৬ কাপ (কুমড়া, শিম, আলু, বেগুন, পটল, মিষ্টি আলু, কাঁচকলা ও বরবটি কাটা সবজি), আদা বাটা- ১ চা চামচ, জিরা- ১ চা চামচ, পাঁচফোড়ন- ১ চা চামচ, কাঁচামরিচ- ৫ থেকে ৬ টি এবং ঘি বা তেল- সামান্য।
প্রস্তুত প্রণালি:
কড়াইয়ে তেল বা ঘি গরম করে পাঁচফোড়নের ফোড়ন দিয়ে দিতে হবে। এরপর আদা বাটা দিয়ে সবজিগুলো একে একে দিয়ে নেড়ে নিতে হবে। হলুদ ও লবণ দিয়ে অল্প পানি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। সবজি নরম হয়ে এলে কাঁচামরিচ ও সামান্য ঘি দিয়ে আরও কয়েক মিনিট রান্না করে নামিয়ে নিতে হবে। চাইলে ধনেপাতাও এতে যোগ করা যাবে।
আলুর দম
উপকরণসমূহ:
ছোট আলু- ৫০০ গ্রাম, টমেটো- ১টি মাঝারি, আদা বাটা- ১ চা চামচ, জিরা বাটা- ১ চা চামচ, মরিচ গুঁড়ো- ১ চা চামচ, হলুদ গুঁড়ো- আধা চা চামচ, জিরা- আধা চা চামচ, জিরা গুঁড়ো- ১ চা চামচ, ধনে গুঁড়ো- ১ চা চামচ, গরম মশলা গুঁড়ো- আধা চা চামচ, তেজপাতা- ১টি, চিনি- আধা চা চামচ, সরিষার তেল- ৩ টেবিল চামচ, মেথি- সামান্য, কাঁচামরিচ- ২ থেকে ৪ টি এবং পানি- প্রয়োজনমতো।
প্রস্তুত প্রণালি:
প্রথমে আলু লবণ ও হলুদ দিয়ে সেদ্ধ করে নিতে হবে। কড়াইতে সরিষার তেল গরম করে আলুগুলো সোনালি করে হালকা ভেজে তুলে রাখুন। ওই তেলেই তেজপাতা, মেথি ও জিরা দিয়ে দিন। মসলার গন্ধ বের হলে আদা বাটা দিয়ে কষিয়ে নিতে হবে।
টমেটো বাটা, জিরা বাটা, জিরা গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো, হলুদ, মরিচ, লবণ ও চিনি দিয়ে দিন। সব কষানো হয়ে এলে অল্প পানি দিয়ে ৫ থেকে ৭ মিনিট আবার একটু কষাতে হবে, যতক্ষণ না মশলা থেকে তেল ছাড়তে শুরু করে। ভাজা আলু ও কেটে রাখা কাঁচামরিচ দিয়ে দিন। ১ থেকে ১.৫ কাপ গরম পানি দিয়ে ঢেকে কম আঁচে ১২ থেকে ১৫ মিনিট রান্না করুন। ঝোল ঘন হয়ে এলে গরম মশলা দিয়ে চুলা বন্ধ করে রাখুন।
বেগুন ভাজা
উপকরণসমূহ:
বেগুন- ২টি, হলুদ গুড়ো- আধা চা চামচ, মরিচ গুড়ো- আধা চা চামচ, ভাজা জিরা গুড়ো- আধা চা চামচ এবং তেল- ভাজার জন্য।
প্রস্তুত প্রণালি:
বেগুন গোল বা লম্বা করে কেটে হলুদ, মরিচ, জিরা গুড়ো ও লবণ মাখিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট রেখে দিতে হবে। এরপর বেগুনগুলো গরম তেলে দুই পাশ বাদামি করে ভেজে নিতে হবে। ভোগের খিচুড়ির সঙ্গে গরম গরম বেগুন ভাজা পরিবেশন করা যায়।
নারকেলের নাড়ু
উপকরণসমূহ:
কোরানো নারকেল- ২ কাপ, চিনি- ১ কাপ, এলাচ গুঁড়া- আধা চা চামচ, দারচিনি- ২ টি এবং ঘি- সামান্য।
প্রস্তুত প্রণালি:
কড়াইয়ে অল্প পরিমাণে ঘি দিয়ে ২টি দারচিনি, কোরানো নারকেল ও চিনি দিয়ে মাঝারি আঁচে নেড়ে রান্না করতে হবে। মিশ্রণটি আঠালো হয়ে এলে এলাচ গুঁড়া দিতে হবে। চুলা থেকে নামিয়ে কিছুটা ঠান্ডা হলে হাতে আবারও সামান্য ঘি মেখে গোল গোল নাড়ু তৈরি করতে হবে।
পায়েস
উপকরণসমূহ:
গোবিন্দভোগ বা ছোট দানার চাল- আধা কাপ, দুধ- ১ লিটার, চিনি- আধা কাপ, এলাচ- ২টি, কিশমিশ ও কাজুবাদাম- পরিমাণমতো।
প্রস্তুত প্রণালি:
দুধ জ্বাল দিয়ে কিছুটা ঘন করে নিতে হবে। তেজপাতা ও এলাচ দিয়ে আরো ও কিছুক্ষণ জ্বাল করে নিতে হবে। তারপর ধুয়ে রাখা চাল দিয়ে কম আঁচে রান্না করতে হবে। চাল সেদ্ধ হয়ে গেলে এতে চিনি দিতে হবে। আরও কিছুক্ষণ জ্বাল দিয়ে পায়েস ঘন হলে কিশমিশ ও কাজুবাদাম ছড়িয়ে নামিয়ে নিতে হবে।
দুর্গাপূজার ষষ্ঠী ও সপ্তমীতে পূজার আচার অনুষ্ঠানের পাশাপাশি খাবারের আয়োজনেও থাকে উৎসবের ছোঁয়া। দুর্গোৎসবের কয়েকটি দিন যেন ধর্মীয় আচার, পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক মিলন এবং খাদ্যসংস্কৃতির এক সম্মিলিত আয়োজন। মণ্ডপে দেবীর সামনে অঞ্জলি দেওয়ার পর অনেকেই অপেক্ষা করেন ভোগের জন্য। কেউ প্রসাদ নিয়ে বাড়ি ফেরেন, কেউ মণ্ডপেই বসে ভোগ খান। পরিবারের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে ঘরোয়া আয়োজনে এসব সহজ পদ তৈরি করে উপভোগ করা যেতে পারে ষষ্ঠী ও সপ্তমীর আনন্দ।