বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা আজ শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে। আজ দুর্গাষষ্ঠী। এই দিনটি থেকে দেবীর মূল প্রতিমায় পূজা কার্যক্রম শুরু হবে। আগামী বুধবার বিজয়া দশমী পর্যন্ত টানা ছয় দিন ঢাক, ঢোল ও কাঁসরের বাদ্যে মুখর থাকবে সারা দেশের পূজামণ্ডপগুলো।
ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী, আজ পূর্বাহ্ণ বা সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে দেবী দুর্গার ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা সম্পন্ন হবে। আর সায়ংকালে বা সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হবে দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাস।
শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এবার দেবী দুর্গা ঘোটকে বা ঘোড়ায় চড়ে মর্ত্যলোকে আসছেন এবং বিদায় নেবেন নৌকায় করে। হিন্দু শাস্ত্র মতে, কন্যারূপে দেবী তার শ্বশুরবাড়ি কৈলাস থেকে বাপের বাড়ি বেড়াতে আজ মর্ত্যলোকে আগমন করছেন। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, এক সময় অসুর শক্তির কাছে পরাভূত হয়ে দেবতারা স্বর্গলোকচ্যুত হয়েছিলেন। সেই অশুভ শক্তিকে বিনাশ করার লক্ষ্যে দেবতারা একত্রিত হন। আর এই অসুর বিনাশের প্রয়োজনীয়তা থেকেই এক মহাশক্তির আবির্ভাব ঘটে। দেবতাদের তেজরশ্মির সমন্বয়ে আবির্ভূত হন অসুরবিনাশী দেবী দুর্গা।
দুর্গাপূজার আয়োজন উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলা প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সাথে এক মতবিনিময় সভা আয়োজন করেন বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ এবং মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতৃবৃন্দ। উক্ত সভায় সংগঠন দুটি জানিয়েছে, এবার সারাদেশে মোট ৩৩ হাজার ৮৫১টি দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে, যা গত বছরের ৩২ হাজার ৩৫১টির তুলনায় বেশি। অন্যদিকে, ঢাকা মহানগরে এবার ২৫৮টি পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে গত বছর এই সংখ্যা ছিল ২৬১টি।
পূজার সময়সূচি অনুযায়ী, এবার মহাসপ্তমী দুই দিনব্যাপী পালিত হবে। আগামীকাল শনিবার ও পরদিন রোববার মহাসপ্তমী। এরপর আগামী সোমবার মহা অষ্টমী, মঙ্গলবার মহানবমী এবং বুধবার বিজয়া দশমী ও দেবী বিসর্জন অনুষ্ঠিত হবে। বিজয়ার দিন বেলা তিনটায় ঢাকাসহ সারা দেশে শোভাযাত্রার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলোতে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। রাজধানীর রমনা কালীমন্দিরে প্রতিমা স্থাপন করা হলেও তা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। এছাড়া মন্দির প্রাঙ্গণে আকর্ষণীয় আলোকসজ্জার পাশাপাশি গেট ও মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। একইভাবে গতকাল দুপুরে দেখা যায়, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলা অঙ্গনের মণ্ডপেও প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছে এবং তা সাদা পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। তখন সেখানে শেষ পর্যায়ের কাজ চলছিল।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় এক লিখিত বক্তব্যে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস জানান, দুর্গাপূজার প্রস্তুতির এই সময়েই সিলেট, রাজবাড়ী, পঞ্চগড়, নেত্রকোনা ও টাঙ্গাইল জেলায় প্রতিমা ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী কালীমন্দিরে চুরির ঘটনা এবং সুনামগঞ্জে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, দোকানপাট ও মন্দিরে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। নওগাঁয় গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারী পরিচয় দিয়ে ডাকাতির খবর পাওয়া গেলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ায় অনেক দুর্বৃত্ত ধরা পড়েছে।
শারদীয় দুর্গাপূজার মধ্যে এমন হামলা দেখতে চান না বলে উল্লেখ করেন শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গতকাল ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে বিজিবি সদস্যদের অবস্থান নিতে দেখা যায়। বিজিবি সদর দপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব মুর্শেদ রহমান বাসসকে জানান, দুর্গাপূজায় এবার প্রায় ১০ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন থাকবে। গতকাল বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেছেন, “যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তুত রয়েছে।”
অন্যদিকে, গতকাল আনসার-ভিডিপি সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ জানান, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ রাখতে সারা দেশে আনসার-ভিডিপির ২ লাখ ১২ হাজার ৮১৮ জন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।