জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্র প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ করা হয়েছে যে, দরপত্র ফাঁস করে একটি বিশেষ চক্র প্রায় ২৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। এই দুর্নীতির নেপথ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, এনসিটিবি এবং প্রেস মালিকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি ত্রিপক্ষীয় সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে দাবি করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দৈনিক কালের কণ্ঠের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দরপত্রের একাধিক সিডিউল বিক্রি করা হলেও জমা পড়েছে মাত্র এক বা দুটি করে দরপত্র। এই প্রতিযোগিতাহীন প্রক্রিয়ায় উচ্চমূল্যের দরপত্র মূল্যায়ন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর) ২০২৫ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইতিমধ্যে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে এনসিটিবি কার্যালয়ে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য মোট ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই ছাপানোর প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকের জন্য ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০ কপি, প্রাথমিক স্তরের জন্য ৭ কোটি ৯৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৩৮ কপি এবং মাধ্যমিক স্তরের জন্য ২২ কোটি ১০ লাখ ৪২ হাজার ৯২৩ কপি বই ছাপানো হবে। এই বিশাল পরিমাণ বই ছাপাতে সরকারের মোট ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

সূত্রমতে, এনসিটিবির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক পাটওয়ারীর দায়িত্ব থাকাকালীন প্রাক-প্রাথমিক, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি, ইবতেদায়ি, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই ছাপানোর দরপত্র লাইভ করা হয়েছিল। সে সময় ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বই ছাপানোর প্রাক্কলিত দর নির্ধারণ করা হয় ৩.২৬ টাকা, ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ২.৮০ টাকা, সপ্তম শ্রেণির জন্য ২.৮১ টাকা এবং অষ্টম শ্রেণির জন্য ২.৯০ টাকা। তিনি হেড অব প্রকিউরিং এনটিটি (হোপ) হিসেবে যাচাই-বাছাই করে এসব দরের অনুমোদন দিয়েছিলেন। তবে চলতি বছরের ১০ জুন অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ওই পদে যোগদান করেন। অভিযোগ উঠেছে, তাকে ফাঁকি দিয়ে কৌশলে এনসিটিবির এক সদস্য প্রেস মালিকদের কাছে প্রাক্কলিত দর সরবরাহ করেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, একবার দরপত্র লাইভ হয়ে গেলে প্রাক্কলিত দর বাড়ানো বা কমানোর কোনো সুযোগ থাকে না। দরপত্রে এই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর গত মঙ্গলবার এনসিটিবিতে অভিযান চালায় দুদক এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র জব্দ করে। এই পরিস্থিতির পর গতকাল বুধবার এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ অনানুষ্ঠানিক উপায়ে অধিকাংশ প্রেস মালিককে ডেকে আনে। সেখানে প্রথম পর্যায়ের প্রাক্কলিত দর বাজার উপযোগী ছিল না—এই মর্মে তাদের কাছ থেকে প্যাডে ব্যাকডেটে লিখিত বিবৃতি নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিকের ফর্মাপ্রতি গড় দর দাঁড়িয়েছে ৩.৩২ টাকা এবং প্রাথমিকের ফর্মাপ্রতি গড় দর ৩.৫৪ টাকা। বিপরীতে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বই মুদ্রণে কোনো একক দরপত্র জমা পড়েনি; সে বছর মাধ্যমিকে ফর্মাপ্রতি গড় দর ছিল ২.৩১ টাকা এবং প্রাথমিকের ফর্মাপ্রতি গড় দর ছিল ৩.৪৪ টাকা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৮৫ হাজার মেট্রিক টন কাগজে বই ছাপা হচ্ছে। এই হিসাব অনুযায়ী, দরপত্র লাইভ থাকা অবস্থায় দর পরিবর্তন করে ২৫০ কোটি টাকার বেশি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান এই বিষয়ে বলেন, ‘দরপত্রে লাইভে চলে আসার পর নতুন করে দরপত্র প্রাক্কলনের কোনো সুযোগ নেই। অথচ এত বড় একটা অনিয়ম এনসিটিবি করল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও সব জেনেশুনে চুপ থাকল। এর প্রতিকার প্রয়োজন।’