‘সবাই আমরা যুদ্ধ করছি। সৈনিক, জনগণ সবাই। চরম সংকটে নেতারা যখন উধাও হয়ে গেল, সিদ্ধান্ত দেওয়ার মতো কেউ থাকলো না, তখন জাতির পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড়ো সিদ্ধান্ত আমাকে ঘোষণা করতে হলো।’
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিচারণে এভাবেই ফুটে উঠেছে মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলো। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যবইয়ে এই লেখাটি পড়ার সুযোগ পাবে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) নিশ্চিত করেছে যে, জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত ডায়েরির তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই এই লেখাটি বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জিয়াউর রহমানের লেখা এই প্রবন্ধে ১৯৭১ সালের মার্চের শুরু থেকে শুরু করে যুদ্ধের শেষ সময় পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধের আগাম আভাস পেয়ে তিনি কীভাবে সৈন্যদের প্রস্তুত করেছিলেন, কোথায় প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের বিষয়টি এই লেখায় বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।
‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ শীর্ষক এই প্রবন্ধটি সংবলিত পাঠ্যবইটি বর্তমানে মুদ্রণ পর্যায়ে রয়েছে। এখানে সরাসরি জিয়াউর রহমানের ভাষায় মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতি বর্ণিত হয়েছে। এনসিটিবি আরও জানিয়েছে, প্রবন্ধটির পাশাপাশি তাঁর সেই বিখ্যাত ডায়েরির একটি ছবিও বইয়ে যুক্ত করা হয়েছে।
মার্চের শুরুতেই যুদ্ধের প্রস্তুতি
জিয়াউর রহমানের স্মৃতিকথায় উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭১ সালের মার্চের শুরু থেকেই চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তখন সামরিক অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং বিমান ও জাহাজের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সেনাসদস্য আনা হচ্ছিল। সে সময় চট্টগ্রামের ষোলশহরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদর দপ্তর অবস্থিত ছিল এবং সেখানে অষ্টম ব্যাটালিয়ন গঠনের কাজ চলছিল। তবে ব্যাটালিয়নের অনেক সৈনিক ছুটিতে থাকায় দায়িত্বে ছিলেন মাত্র ২২০ জন। অস্ত্রের মজুদও ছিল অত্যন্ত সীমিত; ছিল কয়েক শ রাইফেল, চারটি হালকা মেশিনগান, দুটি মর্টার এবং সামান্য কিছু গোলাবারুদ।
তৎকালীন ব্যাটালিয়নের দ্বিতীয় কমান্ডিং অফিসার বা উপ-অধিনায়ক ছিলেন জিয়াউর রহমান। অধিনায়ক ছিলেন পাকিস্তানি কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল জানজুয়া। জিয়াউর রহমানের বর্ণনা অনুযায়ী, পাকিস্তানি বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তাঁরা আসন্ন বিপদের আভাস পাচ্ছিলেন। সেই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হামলা, নির্যাতন ও লুটপাটের খবরও তাঁদের কাছে পৌঁছাচ্ছিল।
৪ মার্চের দিকে জিয়াউর রহমান কোয়ার্টার মাস্টার ক্যা. ওয়ালীকে (অলি আহমদ) ডেকে পাঠান। ষোলশহর মার্কেটের ছাদে তাঁদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে স্বাধীনতাযুদ্ধের সম্ভাবনা এবং সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। পরবর্তীতে নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হয়।
‘উই রিভোল্ট’
‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ প্রবন্ধে বর্ণিত হয়েছে, মার্চের শেষ সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি যখন চরম উত্তপ্ত, তখন ২১ মার্চ পাকিস্তানের জেনারেল হামিদ চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে আসেন। ২৪ মার্চ পাকিস্তানি সৈন্যরা ‘সোয়াত’ জাহাজের অস্ত্র খালাস করতে বন্দরে যাওয়ার পথে সাধারণ জনতার তীব্র বাধার মুখে পড়েন, যার ফলে খণ্ডযুদ্ধে অনেক প্রাণহানি ঘটে।
এরপর আসে ২৫ মার্চের সেই কালো রাত। স্মৃতিকথা অনুযায়ী, রাত ১১টার দিকে তাঁকে চট্টগ্রাম বন্দরে জেনারেল আনসারীর কাছে রিপোর্ট করতে বলা হয়। তাঁকে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি সামরিক ট্রাক পাঠানো হয়েছিল, যাতে দুজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা এবং তাঁর নিজের ব্যাটালিয়নের মাত্র তিনজন সৈনিক ছিলেন।
গভীর রাতে রিপোর্ট করতে বলায় জিয়াউর রহমানের মনে আগে থেকেই সংশয় তৈরি হয়েছিল। তিনি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, ‘তারা চাইছিল, আমাকে শেষ করে ফেলতে। তাই সেই রাতেই তারা ষড়যন্ত্র এঁটে রেখেছিল।’
আগ্রাবাদের একটি বড় ব্যারিকেডের কাছে ট্রাকটি থামলে সবাই নেমে রাস্তায় পায়চারি করতে থাকেন। সেখানে মেজর খালিকুজ্জামান এসে জিয়াকে পাকিস্তানি বাহিনীর অভিযানের খবর জানান। সেই মুহূর্তেই জিয়াউর রহমান প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি লেখেন, ‘যে সময়ের জন্য এত দিন অপেক্ষা করছিলাম, সে সময় এসে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম, উই রিভোল্ট।’ এরপর তিনি ট্রাকে থাকা পাঞ্জাবি ড্রাইভারকে নির্দেশ দেন ট্রাক ঘুরিয়ে ব্যাটালিয়নের সদর দপ্তরে ফিরে যেতে।
ষোলশহর ফিরে এসে তিনি দ্রুত ট্রাক থেকে নামেন। সঙ্গে ছিলেন নৌবাহিনীর আটজন এসকর্ট। মুহূর্তের মধ্যে তাঁদের রাইফেল কেড়ে নিয়ে এক নেভাল অফিসারের দিকে রাইফেল তাক করে জিয়াউর রহমান বলেন, ‘হ্যান্ডস আপ’। অন্যদের দিকেও রাইফেল তাক করে তিনি অস্ত্র নামিয়ে আনার নির্দেশ দেন। এরপর ব্যাটালিয়ন কমান্ডারকে ঘুম থেকে জাগিয়ে এনে আটক করা হয় এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়ন থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়।
জিয়াউর রহমান লিখেছেন, ‘সেই মুহূর্তটি ছিল জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাটালিয়নের সব অফিসার আর জোয়ানদের একত্র করে ভাষণ দিলাম। বললাম, আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধে নেমেছি।’ তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, রাত ২টা ১৫ মিনিটের দিকে সৈনিকেরা যুদ্ধে নামার সব প্রস্তুতি শেষ করেন। ২৬ মার্চ ভোরে পটিয়ার পাহাড়ের দিকে রওনা হয়ে দুপুরে সেখানে পৌঁছান তাঁরা। পথে ইপিআরের প্রায় ১০০ সদস্য তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন এবং পটিয়ায় পৌঁছে প্রতিরোধের শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলা হয়। এর মাধ্যমেই চট্টগ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হয়।
কালুরঘাটে স্বাধীনতার ঘোষণা
২৭ মার্চ সন্ধ্যায় জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রে যান। তাঁর স্মৃতিকথা অনুযায়ী, সেখানে একটি খাতার পৃষ্ঠায় তিনি প্রথমে স্বাধীনতার ঘোষণাটি লিখেছিলেন এবং পরবর্তীতে তা বেতারে প্রচার করেন। ওই ঘোষণায় তিনি নিজেকে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণকারী হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দেশের জনগণকে জাতীয় প্রতিরক্ষায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
পরদিন সকাল থেকে নির্দিষ্ট বিরতিতে এই ঘোষণা প্রচার করা হয়, যাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণরা প্রতিরোধযুদ্ধে উৎসাহিত হয়। পরবর্তীতে ৩০ মার্চ রাজনৈতিক নেতাদের অনুরোধে দ্বিতীয়বার ঘোষণাটি প্রচার করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে যোগাযোগব্যবস্থা, অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণের তীব্র সংকট ছিল। তা সত্ত্বেও সামরিক সদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এগিয়ে আসেন। জিয়াউর রহমানের স্মৃতিকথায় এই প্রাথমিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার অভিজ্ঞতাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেন, এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বর্ণনায় বলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্রের সংকট ছিল সবচেয়ে বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছ থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে তা দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হতো।
এপ্রিলে স্বাধীনতাযুদ্ধের সদর দপ্তর রামগড়ে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায়ে ‘জেড ফোর্স’-এর অধিনায়কত্ব করেন। তাঁর স্মৃতিকথায় যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিরোধ সংগঠিত করা, সৈন্যদের প্রস্তুত করা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর অভিজ্ঞতা বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে।
যুদ্ধের সময় শুধু সম্মুখসমরই হয়নি, বিভিন্ন এলাকায় মুক্তাঞ্চল গড়ে তোলা এবং সেখানে প্রশাসনিক কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জিয়াউর রহমান জানান, সেপ্টেম্বরের মধ্যে উত্তর-পূর্ব সেক্টরের পুরো রৌমারী থানা, চিলমারী, উলিপুর ও দেওয়ানগঞ্জ হানাদারমুক্ত হয়। সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের বেসামরিক প্রশাসন চালু হয় এবং অফিস-আদালত পরিচালনার পাশাপাশি কর সংগ্রহের ব্যবস্থাও গড়ে ওঠে।
স্মৃতিকথার শেষাংশে তিনি মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতি ও স্বাধীনতার ব্যাপারে তাঁর প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বর্ণনায়, ‘৬ সেপ্টেম্বর পৌনে এক লাখ টাকার ট্যাক্স জমা হলো স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের তহবিলে। বেসামরিক শাসন চালু হওয়ার দিন রৌমারীতে বিশাল জনসমাবেশ হলো।’ তাঁর লেখায় উঠে এসেছে যুদ্ধে দেশের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কথা এবং সীমিত সরঞ্জাম নিয়েও পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার গল্প।
জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি হিসেবে জনগণের জাতীয় চেতনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, এই চেতনার প্রবল স্রোতের মুখে পাকিস্তানি দখলদারত্ব টিকতে পারবে না। এই বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তাঁর দৃঢ় প্রত্যয় এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
স্মৃতিকথা যেভাবে পাঠ্যবইয়ে
এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানের ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮০ সালে অধুনালুপ্ত দৈনিক দেশ পত্রিকার বর্ষপূর্তি সংখ্যায়। ওই পত্রিকার সম্পাদক সানাউল্লাহ নূরী জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত ডায়েরির বর্ণনা এবং তাঁর মুখে বলা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা অনুলিখন করে এই নিবন্ধটি প্রস্তুত করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ২৫ মার্চের সশস্ত্র প্রতিরোধ, কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সামরিক নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমানের স্মৃতিকথাটি সেই সময়ের একটি ব্যক্তিগত বয়ান হিসেবে এসব ঘটনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে। পাঠ্যবইয়ে এটি অন্তর্ভুক্ত হলে শিক্ষার্থীরা একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশগ্রহণকারীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ঘটনাগুলো জানার সুযোগ পাবে।
পাঠ্যবইয়ে এই লেখা যুক্ত করার বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য হলো, ইতিহাসে যার যা প্রাপ্য, সেটা আমরা দিতে চাই। যার যতটুকু অবদান, তা নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরাই আমাদের লক্ষ্য। শিক্ষার্থীরা যাতে সঠিক ইতিহাস জানতে পারে।’
ইতিহাসের সবার প্রাপ্য সমানভাবে দেওয়ার বিষয়টি সরকারের নির্দেশনা বলে উল্লেখ করে ফখরুল মাওলা বলেন, ‘পরবর্তী কারিকুলামে সেটা আরও বিস্তৃত আকারে আনা হবে। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।’