আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য দুটি করে মোট চারটি নতুন পাঠ্যবই যুক্ত করা হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণির জন্য নির্ধারিত নতুন বই দুটি হলো ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’। অন্যদিকে, ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য আনা হচ্ছে ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’ নামের দুটি বই।

রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আজ রোববার জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) পৃথক সভায় এই চারটি বইয়ের অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এনসিসিসি দুটি আলাদা কমিটি হিসেবে কাজ করে—একটি মাধ্যমিক পর্যায়ের জন্য এবং অন্যটি প্রাথমিক পর্যায়ের জন্য। প্রাথমিক এনসিসিসির সভায় চতুর্থ শ্রেণির বই দুটি এবং মাধ্যমিক এনসিসিসির সভায় ষষ্ঠ শ্রেণির বই দুটির অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রয়োজনীয় পরিমার্জন-প্রির্জন সাপেক্ষে এই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একজন কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছেন, যে পরামর্শগুলো দেওয়া হয়েছে, সে অনুযায়ী আগামীকালের (আজ সোমবার) মধ্যে পরিমার্জন সম্পন্ন করে বইগুলো চূড়ান্ত করা হবে।

উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব আবদুল খালেক, প্রধান তথ্য কমিশনার নাহরিন ইসলাম খান, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী গিয়াস উদ্দিন এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসচিব জেসমিন নাহারসহ অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

এনসিটিবির সূত্র অনুযায়ী, এই দুই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন চারটি বই বাধ্যতামূলক করা হবে। তবে একটি বিশেষ সিদ্ধান্ত হলো, এসব বিষয়ে কোনো বার্ষিক পরীক্ষা নেওয়া হবে না; বরং ধারাবাহিক মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের যাচাই করা হবে। নতুন এই বইগুলোর মোট সংখ্যা দেড় কোটির বেশি। অনুমোদনের দিনই মুদ্রণকারীদের নোটিশ অব অ্যাওয়ার্ড (নোয়া) প্রদান করা হয়েছে যাতে দ্রুত ছাপার কাজ শুরু করা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ষষ্ঠ শ্রেণির নতুন বই ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’র মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে কারিগরি শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা। বইটিকে কয়েকটি বিশেষ অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে কারিগরি শিক্ষা পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি ও নতুন বিশ্ব, যারা বানায় তারাই পৃথিবী বদলায়, সমস্যা ও সমাধান করি, ছোট উদ্যোগ বড় সম্ভাবনা, ভবিষ্যৎ পেশা ও দক্ষতা, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপন এবং শব্দকোষ।

অন্যদিকে, ষষ্ঠ শ্রেণির আরেকটি নতুন বই ‘আনন্দময় শিক্ষা’য় মূলত মূল্যবোধের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এই বইটিও কয়েকটি অধ্যায়ে বিভক্ত, যার মধ্যে রয়েছে আমি ও আমরা, আমার পুষ্টি ও স্বাস্থ্যগত জীবনযাপন, প্রযুক্তির সঙ্গে খেলি, নতুন কিছু করি, পরিষ্কার থাকি পরিচ্ছন্ন রাখি, উদ্‌যাপনের দিনগুলো ও আনন্দে থাকি, আনন্দে রাখি।

চতুর্থ শ্রেণির নতুন বই ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’তে সংস্কৃতির মৌলিক ধারণা, ব্যক্তিজীবনে এর প্রভাব, জাতীয়, ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি এবং সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্ব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে। আর ‘খেলাধুলা’ বইটিতে আটটি নির্দিষ্ট খেলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কাবাডি, দাবা, অ্যাথলেটিকস, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট।

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে ব্যাপক পরিবর্তন আনছে এনসিটিবি। এই পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা যুক্ত করা।

এছাড়া নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধটি যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা সংক্রান্ত বর্ণনায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এ বিষয়ে পরিবর্তন করা হয়েছিল। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের পাঠ্যবই, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংশোধিত বই এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে প্রস্তুত করা বইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনা তিন ধরনের রূপ পাচ্ছে।

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লার আইকন (ছবি) রাখা হয়েছিল। তবে এ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হলে ছবিটি বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে বইটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিটিবি।

এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বইটির সংশ্লিষ্ট পাতাটি পরিবর্তন করে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে কোনো ছবি বা আইকন ছাড়াই বই ছাপানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে যেসব বই ছাপিয়ে পাঠানো হয়েছিল, সেগুলো ফেরত এনে এবং সরবরাহের অপেক্ষায় থাকা বইগুলো সংশোধন করে দেওয়া হবে। আলাদা কোনো খরচ ছাড়াই মুদ্রণকারীরা ওই সংশোধন করে দিতে রাজি হয়েছেন। ফলে এনসিটিবির বাড়তি খরচ হবে না।”

উল্লেখ্য, চলতি বছরের পাঠ্যবইয়ে দাঁড়িপাল্লার ছবিটি ছিল না, তবে আগামী বছরের বইয়ে তা নতুন করে যুক্ত করা হয়েছিল। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এনসিটিবির একজন কর্মকর্তাকে আজ খাগড়াছড়িতে বদলি করেছে। ওই কর্মকর্তা শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য।

এদিকে কয়েকটি পাঠ্যবইয়ে নৌকার ছবি থাকা নিয়েও এক পক্ষের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে এনসিটিবির একাধিক কর্মকর্তার দাবি, বিষয়বস্তু ও আধেয়রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ছবিগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। আবহমান বাংলার সবুজ প্রকৃতি বোঝাতে নৌকা, ধান কাটা ও এ ধরনের প্রাসঙ্গিক দৃশ্য পাঠ্যবইয়ে রাখা হয়েছে। এসব ছবি এবারই প্রথম ব্যবহার করা হয়নি; অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুই দফায় এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে আগামী শিক্ষাবর্ষের বই পরিমার্জনের সময়ও ছবিগুলো রাখা হয়েছে।