২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্রতীকটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় তা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

গত বৃহস্পতিবার রাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বইটির ছাপানোর কাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সাথে মাঠপর্যায়ে যেসব বই ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছে, সেগুলো পুনরায় সংগ্রহ করে প্রতীকটি পরিবর্তন করার পর শিক্ষার্থীদের মাঝে সরবরাহ করার পরিকল্পনা জানিয়েছে সংস্থাটি।

তবে মুদ্রণমালিকদের দাবি, বইটির ছাপানো, বাঁধাই এবং বিতরণের কাজ অনেক আগেই সম্পন্ন হয়েছে। তাঁদের মতে, মাঠপর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া বইগুলো পুনরায় সংগ্রহ করে সংশোধন করতে হলে এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হবে এবং সময়েরও প্রয়োজন হবে।

এনসিটিবির বই ছাপানোর হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মাধ্যমিক স্তরের বিভিন্ন শ্রেণির বই ছাপানোর গতি বেশ ধীর। এমতাবস্থায়, মাঠ থেকে বই তুলে এনে পরিমার্জন করে পুনরায় শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দিতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বই বিতরণ প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মুক্তকণ্ঠর সাথে আলাপকালে এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক মো. রিয়াজুল ইসলাম জানান, যেসব বই ইতিমধ্যে মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, সেগুলো সংগ্রহ করে প্রতীকটি পরিমার্জন করা হবে এবং পুনরায় শিক্ষার্থীদের কাছে সরবরাহ করা হবে। বর্তমানে ছাপার কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে এবং মাঠ থেকে বই সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যাতে কোনো ভুল তথ্য না পায়, সেটা আমরা নিশ্চিত করতে চাই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, দাঁড়িপাল্লা মূলত একটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রতীক। আর এই কারণেই প্রতীকটি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে।

বইয়ে যেভাবে দাঁড়িপাল্লার ব্যবহার করা হয়েছে

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বইয়ের ‘উপাত্ত ও তথ্য’ শীর্ষক পাঠে জ্ঞানের পিরামিডের একটি ধারণা দেওয়া হয়েছে। এই পিরামিডের চারটি স্তর রয়েছে। নিচ থেকে পর্যায়ক্রমে স্তরগুলো হলো— উপাত্ত, তথ্য, জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা। প্রতিটি স্তরকে বোঝানোর জন্য আলাদা আলাদা প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে।

উপাত্তের স্তরে ব্যবহার করা হয়েছে পাই চার্ট বা ঘড়ির মতো একটি বৃত্তাকার প্রতীক। তথ্যের স্তরে পরমাণু কিংবা নেটওয়ার্কের মতো দেখতে একটি প্রতীক রাখা হয়েছে। জ্ঞানের স্তরটি বোঝাতে মানুষের মস্তিষ্কের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। আর পিরামিডের সর্বোচ্চ স্তর অর্থাৎ প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে রাখা হয়েছে দাঁড়িপাল্লার ছবি।

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বইয়ের প্রায় ৩৮ লাখ কপি ছাপানো হচ্ছে, যার অধিকাংশ কাজ ইতিমধ্যে শেষ। এছাড়া ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য সব মিলিয়ে প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপানোর কাজ চলমান রয়েছে।

পূর্ববর্তী শিক্ষাবর্ষের বইয়ের সাথে তুলনা করলে প্রজ্ঞার প্রতীক পরিবর্তনের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই অনুযায়ী, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের জন্য পরিমার্জিত ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বইয়ে প্রজ্ঞার স্তরে দাঁড়িপাল্লার ছবি ছিল।

তবে চলতি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের হাতে থাকা বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে মানুষের মস্তিষ্কের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে পুনরায় দাঁড়িপাল্লার ছবি ফিরে আসায় বিতর্ক তৈরি হয় এবং এখন তা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে নির্দিষ্ট কোনো ছবির সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা নেই। ইতিহাস, দর্শন ও সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে প্যাঁচা কিংবা বইয়ের মতো প্রতীকগুলোও প্রজ্ঞার প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। তবে সংশোধনের পর ষষ্ঠ শ্রেণির বইয়ে শেষ পর্যন্ত কোন প্রতীকটি রাখা হবে, সে বিষয়ে এখনো কিছু জানায়নি এনসিটিবি।