প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বর্তমানে মারাত্মক শিখনঘাটতি নিয়ে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হচ্ছে। এই পরিস্থিতির পেছনে শিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের অভাব বড় কারণ হিসেবে গণ্য হলেও, শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো পাঠ্যবই পৌঁছে দিতে না পারার ব্যর্থতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গত দুই শিক্ষাবর্ষের অভিজ্ঞতা এর প্রকট দৃষ্টান্ত। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে সময়মতো পাঠ্যবই মুদ্রণ সম্পন্ন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এবারও নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রারম্ভেই সব শিক্ষার্থীর হাতে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এমন নেতিবাচক দৃষ্টান্তের পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

মুক্তকণ্ঠের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট প্রায় ৩১ কোটি বই মুদ্রণের কাজ চলছে। প্রাথমিক স্তরের ক্ষেত্রে অগ্রগতির চিত্রটি কিছুটা আশাব্যঞ্জক। ২০ অক্টোবর পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী ৮৬ শতাংশের বেশি বই ছাপা হয়েছে এবং তার মধ্যে ৭৪ শতাংশ সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। তবে মাধ্যমিক স্তরের চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও উদ্বেগজনক। ২০ কোটি ৮৪ লাখের বেশি বইয়ের প্রায় অর্ধেক ছাপা হয়ে থাকলেও সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ। আরও আশঙ্কার বিষয় হলো, নবম ও দশম শ্রেণির মাত্র ৩ শতাংশের মতো বই এখন পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়েছে।

জাতীয় পাঠ্যপুস্তক and রেকর্ড বোর্ড (এনসিটিবি) দাবি করছে, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপানোর কাজ শেষ করে সেগুলো মাঠপর্যায়ে পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, জানুয়ারিতে শিক্ষার্থীরা সব বই হাতে পাবে। তবে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রাখলে এনসিটিবির এই বক্তব্যে আশ্বস্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। চলতি শিক্ষাবর্ষে শতভাগ বই সরবরাহ করতে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় লেগেছিল। তার আগের বছর এই প্রক্রিয়ায় প্রায় তিন মাস সময় লেগেছিল। এখন প্রশ্ন উঠেছে, বই ছাড়াই শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়, তার দায়ভার কে গ্রহণ করবে?

এর পাশাপাশি এবার চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির চারটি বই নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, ‘খেলাধুলা’, ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’—এই চারটি বইয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৫ অক্টোবর। শিক্ষাবর্ষ শুরুর মাত্র দুই মাস আগে নতুন বইয়ের অনুমোদন এবং কার্যাদেশের প্রক্রিয়া চলমান থাকাটা পরিকল্পনার চরম ঘাটতিকেই নির্দেশ করে। বছরের শেষভাগে এসে পাঠ্যবই অনুমোদন করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে। ইতিহাস ও স্বাধীনতার ঘোষণাসহ বেশ কিছু বিষয়ে এবার পরিবর্তন আনা হচ্ছে। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পাঠ্যবইয়ের ভাষ্য ও ব্যাখ্যা বদলে যাওয়ার এই প্রবণতা সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। বিষয়বস্তুর যেকোনো পরিবর্তন হতে হবে নিবিড় গবেষণা, সঠিক ঐতিহাসিক তথ্য এবং বিশেষজ্ঞ মতামতের ভিত্তিতে; রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়। একই সাথে সংশোধন ও পরিমার্জনের কাজ যথেষ্ট আগে শেষ করতে হবে, যাতে মুদ্রণ ও সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় সময় কমে না যায়। শেষ মুহূর্তে বিষয়বস্তু পরিবর্তন করা হলে ভুল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়।

শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো বই পৌঁছে দেওয়ার তাড়াহুড়োতে ছাপা, কাগজের মান ও বাঁধাইয়ের গুণগত মানের সাথে কোনোভাবেই আপস করা যাবে না। অতীতে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার, ঝাপসা ছাপা এবং দুর্বল বাঁধাইয়ের বিষয়ে অনেক অভিযোগ উঠেছে। এ বছর যেন সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে। আমরা মনে করি, নির্দিষ্ট সময়ে বই ছাপানো এবং ছাপার মান নিশ্চিত করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব এনসিটিবির। কোনো মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান কাজ করতে পিছিয়ে থাকলে এখনই তার কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিদিনের কাজের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে তদারকি করতে হবে এবং কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত তার সমাধান করতে হবে।

আমাদের বিশ্বাস, শিক্ষাব্যবস্থায় যে শিখনঘাটতি নিয়ে শিক্ষার্থীরা বড় হচ্ছে, তা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর অন্যতম প্রধান উপায় হলো বছরের প্রথম দিনই শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজে এনসিটিবির ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়।