সকালে বানানো চা ঠান্ডা হয়ে গেলে আবার গরম করে পান করা অনেকেরই অভ্যাস। বিশেষ করে দুধ-চা ফেলে না দিয়ে চুলায় বসিয়ে গরম করার প্রবণতা বেশি। তবে এই অভ্যাসটি স্বাস্থ্যের জন্য কতটা নিরাপদ? আসলে ঝুঁকির মূল কারণ চা পুনরায় গরম করা নয়, বরং চা কতক্ষণ ঘরের তাপমাত্রায় পড়ে ছিল, তাতে দুধ ছিল কি না এবং সংরক্ষণের পদ্ধতি—এই বিষয়গুলোই নির্ণায়ক।
চা বারবার গরম করলে এর স্বাদ ও গন্ধের পরিবর্তন হতে পারে। দীর্ঘ সময় রেখে দেওয়া চা আবার গরম করলে ট্যানিন নামক যৌগের প্রভাবে স্বাদ তেতো বা কষা লাগতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ঠান্ডা চা খেলেই শরীরের ক্ষতি হবে। কয়েক মিনিট ঠান্ডা থাকা চা এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকা চায়ের ঝুঁকি এক নয়।
ঝুঁকির প্রধান কারণ হলো জীবাণুর বৃদ্ধি। চা দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় রাখলে জীবাণু বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়, যা দুধযুক্ত চায়ের ক্ষেত্রে আরও বেশি। বিভিন্ন গবেষণা ও মার্কিন কৃষি বিভাগের খাদ্যনিরাপত্তা নির্দেশনা অনুযায়ী, পচনশীল খাবার ঘরের তাপমাত্রায় দুই ঘণ্টার বেশি রাখা উচিত নয়। যদি আবহাওয়ার তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়, তবে এই সময়সীমা কমে এক ঘণ্টায় নেমে আসে। বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া বিবেচনা করে দুধযুক্ত চা দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা থেকে বিরত থাকাই ভালো।
দুধযুক্ত চা সাধারণ চায়ের তুলনায় দ্রুত নষ্ট হতে পারে। দীর্ঘ সময় অনিরাপদ তাপমাত্রায় থাকলে দুধ ও অন্যান্য উপাদানে জীবাণু বৃদ্ধি পায়। এমনকি পরে চা গরম করলেও সেই জীবাণুগুলো তৈরি করা কিছু বিষাক্ত উপাদান সম্পূর্ণ নষ্ট নাও হতে পারে। মার্কিন কৃষি বিভাগ স্পষ্ট করে জানায়, অনিরাপদভাবে দীর্ঘ সময় রাখা খাবার শুধু পরে গরম করলেই সব ধরনের ঝুঁকি দূর হয় না। তাই কয়েক ঘণ্টা বাইরে পড়ে থাকা দুধ-চা আবার গরম করে খাওয়ার চেয়ে তা ফেলে দেওয়াই নিরাপদ।
চা গরম করলে এর সব পুষ্টিগুণ নষ্ট হয়ে যায়, এমন কথা বলা ঠিক নয়। তবে অতিরিক্ত বা বারবার তাপ প্রয়োগ করলে সংবেদনশীল যৌগের গুণাগুণে পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে উপকারী বৈশিষ্ট্য ও সুগন্ধ কমে যেতে পারে। তাই চা খাওয়ার সবচেয়ে ভালো অভ্যাস হলো প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমাণ করে তাজা চা বানিয়ে পান করা।
চা সংরক্ষণের নিরাপদ উপায় কী?
চা অনেকক্ষণ পরে খাবেন বলে বানিয়ে রাখার বদলে প্রয়োজনমতো অল্প পরিমাণে বানানো সহজতর উপায়। যদি কিছুক্ষণ পর পান করার পরিকল্পনা থাকে, তবে পরিষ্কার ইনসুলেটেড ফ্লাস্ক বা থার্মোসে চা গরম অবস্থায় রাখা যেতে পারে। এতে ঘরের তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় পড়ে থাকার সমস্যা হয় না। চা সংরক্ষণ করতে হলে দ্রুত ঠান্ডা করে পরিষ্কার পাত্রে ফ্রিজে রাখা উচিত। মার্কিন কৃষি বিভাগ খাদ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখার এবং ঘরের তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় না রাখার পরামর্শ দেয়।
চা ঠান্ডা হয়ে গেছে বলেই তা ফেলে দিতে হবে, এমন নয়। মূল বিষয় হলো কতক্ষণ এবং কীভাবে রাখা হয়েছে। ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে ঠান্ডা হওয়া চা এবং পাঁচ-ছয় ঘণ্টা টেবিলে পড়ে থাকা চায়ের ঝুঁকি এক নয়। একইভাবে কালো চা, গ্রিন টি বা হার্বাল চা এবং দুধ-চায়ের সংরক্ষণ পরিস্থিতিও ভিন্নভাবে বিচার করা উচিত। তবে চায়ের অস্বাভাবিক গন্ধ, স্বাদ, দুধ কেটে যাওয়া বা ছত্রাকের মতো লক্ষণ দেখা দিলে সেটি না খাওয়াই নিরাপদ।
প্রতিদিনের অভ্যাসে কয়েকটি বিষয় মেনে চলতে পারেন: যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু চা বানান; দুধ-চা দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় রাখবেন না; পচনশীল খাবারের ক্ষেত্রে দুই ঘণ্টার নিরাপত্তা নিয়মটি মনে রাখুন; গরম আবহাওয়ায় সময়সীমা আরও কমে যায়; পরে খেতে হলে দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখুন; এবং বারবার গরম করার বদলে প্রয়োজনমতো নতুন করে চা বানানো ভালো।
সবশেষে বলা যায়, একবার চা গরম করলেই সেটি বিষাক্ত হয়ে যায়, এমন ধারণার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই। আসল উদ্বেগ হলো দীর্ঘ সময় অনিরাপদ তাপমাত্রায় পড়ে থাকা চা, বিশেষ করে দুধযুক্ত চা। তাই চা যতটা সম্ভব তাজা পান করা এবং দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় পড়ে থাকা চা এড়িয়ে চলাই নিরাপদ অভ্যাস।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া