ডিম কি শুধু প্রোটিনেরই সহজলভ্য উৎস, নাকি মস্তিষ্কের সুস্থতা ও জটিল স্নায়বিক কার্যক্রমেও এর কোনো বিশেষ ভূমিকা রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে আধুনিক বিজ্ঞান। ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় প্রায় এক লাখ মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, ডিম খাওয়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের বয়সজনিত পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক সম্পর্ক বিদ্যমান। পাশাপাশি, ডিমের কোলেস্টেরল নিয়ে দীর্ঘদিনের যে প্রচলিত ধারণা ছিল, তাকেও এখন নতুনভাবে মূল্যায়ন করছে বিজ্ঞান।

আজ ৯ অক্টোবর, বিশ্ব ডিম দিবস। এ বছর এই দিবসটির ৩০ বছর পূর্তি পালিত হচ্ছে। এবারের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে—‘প্রোটিন, যা শক্তি দেয় ও সুরক্ষা করে’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দিবসটির গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর। কারণ, বর্তমান সময়ে ডিম কেবল পুষ্টির উৎস হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এটি একটি অপরিহার্য স্তম্ভে পরিণত হয়েছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জার্নাল অব হিউম্যান নিউট্রিশন অ্যান্ড ডায়েটেটিকসে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ২১টি ভিন্ন সমীক্ষার ৯৯ হাজার ৪৫৩ জন মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, দৈনিক প্রায় ৫০ থেকে ৬০ গ্রাম ডিম খাওয়ার সঙ্গে বয়সজনিত জ্ঞানীয় অবনতির (কগনিটিভ ডিক্লাইন) তুলনামূলক কম ঝুঁকির একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।

ডিমের কুসুমে বিদ্যমান ‘কোলিন’ মানবদেহে ‘অ্যাসিটাইলকোলিন’ নামক গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটার তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে, যা মানুষের স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা ও মনোযোগের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণাতেও প্রবীণদের মধ্যে নিয়মিত ডিম খাওয়ার ফলে আলঝেইমারজনিত স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি কমার ইতিবাচক দিক উঠে এসেছিল। যদিও এটি চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দেয় না, তবে মস্তিষ্কের পুষ্টি জোগানে ডিমের কার্যকারিতা অত্যন্ত সুস্পষ্ট।

ডিম নিয়ে সমাজে সবচেয়ে প্রচলিত একটি বিভ্রান্তি হলো এর কোলেস্টেরল। অনেক মানুষ এখনো ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে কুসুম বাদ দিয়ে শুধু সাদা অংশ খেয়ে থাকেন। অথচ কুসুমেই রয়েছে কোলিন, লুটেইন ও জেক্সানথিনের মতো অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদান। ২০২৫ সালে দ্য আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনে প্রকাশিত এক গবেষণায় খাদ্যের কোলেস্টেরল ও সম্পৃক্ত চর্বির (স্যাচুরেটেড ফ্যাট) প্রভাব মূল্যায়ন করে দেখা গেছে, রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বৃদ্ধির জন্য খাদ্যের কোলেস্টেরলের চেয়ে সম্পৃক্ত চর্বিই মূল দায়ী।

সুতরাং, ডিমকে এককভাবে দায়ী না করে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসকে গুরুত্ব দেওয়াই হবে যুক্তিসংগত। এছাড়া লাল ডিম ও সাদা ডিমের পুষ্টিমানের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই; খোসার রং মূলত নির্ভর করে মুরগির জাতের ওপর এবং কুসুমের রং নির্ভর করে তাদের খাদ্যের ওপর। তাই রঙের বিভ্রান্তি ছেড়ে মানসম্মত উৎপাদনকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত।

প্রায় ৫০ গ্রাম ওজনের একটি ডিমে ছয় গ্রামের বেশি উচ্চমানের প্রোটিন এবং ৭০ থেকে ৭৫ কিলোক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়। এতে মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় ৯টি অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিডের পাশাপাশি ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন এ, সেলেনিয়াম ও কোলিন থাকে। ডিমের প্রোটিন শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি এবং প্রবীণদের বয়সজনিত পেশিক্ষয় (সারকোপেনিয়া) প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর। পাশাপাশি কুসুমে থাকা লুটেইন ও জেক্সানথিন চোখের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে ডিমকে একক কোনো অলৌকিক সমাধান না ভেবে সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।

বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্প গত দেড় দশকে অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০-১১ অর্থবছরে দেশে যেখানে ৬০৮ কোটি ডিম উৎপাদিত হতো, ২০২৪-২৫ সালে তা প্রায় ৪ গুণ বেড়ে ২,৪৪১ কোটিতে পৌঁছেছে। দেশে নির্ধারিত ১,৮৫০ কোটি চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে মাথাপিছু বার্ষিক প্রাপ্যতা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩৭টি। এটি আমাদের খামারি ও পোলট্রি খাতের এক বিশাল অর্জন হিসেবে গণ্য করা হয়।

তবে উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এলেও পুষ্টি গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য রয়ে গেছে। ইউনিসেফ ও বিবিএসের ২০২৫ সালের জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের প্রায় ৬৫ শতাংশ এখনো চরম খাদ্যদারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। পোলট্রি খাতের এই বিপুল সাফল্যকে শিশুদের অপুষ্টি দূর করতে কাজে লাগানো এখন সময়ের দাবি। শিশুদের ছয় মাস বয়সের পর সম্পূরক খাবারে ডিম অন্তর্ভুক্ত করা গেলে জাতীয় পর্যায়ে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা সংক্রান্ত গবেষণায় দেখা গেছে, পোলট্রি বাজারের সব ধরনের আর্থিক ও বাজারভিত্তিক ঝুঁকি এককভাবে বহন করেন প্রান্তিক খামারিরা। বাজারে পোলট্রি খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ও সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থার অভাবে খামারিরা কখনো নিঃস্ব হন, আবার কখনো ভোক্তাকে চড়া দামে ডিম কিনতে হয়। তাই খামারির জন্য ন্যায্য লাভজনক মূল্য এবং সাধারণ ভোক্তার জন্য সাশ্রয়ী দাম নিশ্চিত করতে পোলট্রি ফিডের দাম স্থিতিশীল রাখা ও সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা আনা জরুরি।

বাংলাদেশের অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্র আবহাওয়া পোলট্রি খামারের জন্য নতুন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অতিরিক্ত তাপে ডিম উৎপাদন কমে যায় এবং খোসা পাতলা হয়। এ কারণে ভবিষ্যতে শুধু উন্নত জাতের মুরগি নয়; বরং তাপসহনশীল খামার ব্যবস্থাপনা, জৈবনিরাপত্তা এবং খামারের বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস ও সোলার পাওয়ারের মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে নজর দিতে হবে।

এর পাশাপাশি সনাতন খোসাসহ ডিম বিক্রির বাইরে তরল ডিম (লিকুইড এগ), পাস্তুরিত উপাদান ও ডিমের গুঁড়ার (এগ পাউডার) মতো প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরির শিল্প বিকাশ প্রয়োজন। বেকারি, হোটেল ও তৈরি পোশাক খাতের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বাজারে এর ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে মাননিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে ডিম রপ্তানির নতুন দুয়ারও খুলে দিতে পারে।

বিশ্ব ডিম দিবসের ৩০ বছর পূর্তিতে আমাদের মূল অঙ্গীকার হওয়া উচিত—বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে একদিকে যেমন শিশু, নারী ও প্রবীণদের পুষ্টির অধিকার নিশ্চিত করা, অন্যদিকে খামারিদের স্বার্থ রক্ষা করে পোলট্রি শিল্পকে পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও রপ্তানিমুখী অর্থনৈতিক খাতে রূপান্তর করা।

— এ কে এম হুমায়ুন কবির
শিক্ষক ও গবেষক, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়।