সকালের নাশতা কেমন হবে, তা নিয়ে অনেকেরই ভাবনা থাকে। ব্যস্ততার কারণে কেউ শুধু চা-বিস্কুট খেয়ে দিন শুরু করেন, কেউ আবার নাশতা না করেই কাজে বেরিয়ে পড়েন। অথচ দিনের শুরুতেই এমন কিছু খাবার খাওয়া ভালো, যা কিছুটা সময় পেট ভরা রাখবে এবং শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেবে। এ ক্ষেত্রে খুব সাধারণ একটি খাবারের কথা বলা যায়—গুড় ও ভাজা ছোলা। ভারতীয় উপমহাদেশে দীর্ঘদিন ধরে এই দুই খাবার একসঙ্গে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। ছোলায় থাকে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, খাদ্য আঁশ ও বিভিন্ন খনিজ; গুড়ে থাকে চিনি এবং সামান্য কিছু খনিজ। তাই পরিমিত পরিমাণে গুড় ও ছোলা একসঙ্গে খেলে একটি সহজ ও পুষ্টিকর নাশতা হতে পারে। তবে গুড় ও ছোলা খেলেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যাবে, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বা রক্তস্বল্পতা দূর হয়ে যাবে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ডায়াবেটিস থাকলে গুড় খাওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

ছোলা ডালজাতীয় খাবার। এতে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, খাদ্য আঁশ, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম এবং বিভিন্ন বি ভিটামিন রয়েছে। অন্যদিকে গুড় আখ বা খেজুরের রস থেকে তৈরি মিষ্টিজাতীয় খাবার। পরিশোধিত সাদা চিনির তুলনায় গুড়ে কিছু খনিজ ও অন্যান্য উপাদান থাকতে পারে; তবে গুড়ও মূলত চিনি, তাই এটিকে ইচ্ছেমতো স্বাস্থ্যকর মিষ্টি হিসেবে খাওয়া ঠিক নয়। গুড়ের চিনি শরীরকে দ্রুত শক্তি দিতে পারে, আর ছোলার জটিল কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও আঁশ তুলনামূলকভাবে ধীরে হজম হয়। এই দুই ধরনের খাবার একসঙ্গে খেলে শুধু মিষ্টি খাওয়ার তুলনায় পেট কিছুটা বেশি সময় ভরা থাকতে পারে। ফলে সকালের নাশতায় গুড় ও ছোলা খেলে দিনের শুরুতে ক্ষুধা সামলাতে সুবিধা হতে পারে। এই সংমিশ্রণকে সকালের জন্য শক্তিদায়ক খাবার হিসেবে ধারণা করা হয়। তবে দীর্ঘস্থায়ী শক্তির জন্য শুধু গুড় ও ছোলার ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন, শাকসবজি, ফল ও পূর্ণ শস্য রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ছোলার অন্যতম বড় সুবিধা হলো এতে খাদ্য আঁশ থাকে। পর্যাপ্ত আঁশ অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে এবং মল নরম রাখতে সাহায্য করতে পারে। তাই নিয়মিত পরিমাণমতো ছোলা খেলে কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমাতে সহায়তা করতে পারে। গুড়েরও হালকা রেচক প্রভাব রয়েছে বলে প্রচলিত ধারণা আছে এবং মূল প্রতিবেদনে এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে শুধু গুড় খাওয়ার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়; পর্যাপ্ত পানি পান, শাকসবজি ও ফল খাওয়া এবং নিয়মিত হাঁটাচলাও গুরুত্বপূর্ণ। ছোলায় প্রোটিন ও আঁশ থাকায় এটি পেট ভরিয়ে রাখতে পারে, ফলে খাবারের মাঝখানে অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগা বা বারবার নাশতা করার প্রবণতা কমতে পারে। ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে ভাজা ছোলা ভালো নাশতা হতে পারে; তবে এর সঙ্গে বেশি গুড় যোগ করলে অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরি গ্রহণ হয়ে যেতে পারে। তাই ওজন কমানোর পরিকল্পনায় ছোলার পরিমাণ ঠিক রেখে গুড় অল্প পরিমাণে খাওয়াই ভালো।

যারা নিরামিষ খাবার খান, তাদের জন্য ছোলা প্রোটিন পাওয়ার সহজ উৎস; পেশি, কোষ ও বিভিন্ন জৈবিক কার্যক্রমের জন্য প্রোটিন প্রয়োজন। সকালের নাশতায় ছোলা খেলে দিনের মোট প্রোটিন গ্রহণ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে ডিম, দুধ বা মাছ-মাংস কম খাওয়া হলে ডাল, ছোলা, মটরশুঁটি, সয়া ও বাদামের মতো উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের উৎস খাদ্যতালিকায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ছোলা ও গুড়—দুটোতেই কিছু পরিমাণ আয়রন রয়েছে, যা হিমোগ্লোবিন তৈরিতে ভূমিকা রাখে; তাই আয়রনসমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় থাকা প্রয়োজন। তবে গুড় ও ছোলা খেলেই রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া সেরে যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। অ্যানিমিয়ার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ও আয়রনের ওষুধ প্রয়োজন হতে পারে। আয়রনের ঘাটতি থাকলে ছোলার সঙ্গে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার—লেবু, পেয়ারা বা কমলা—খাওয়া যেতে পারে; ভিটামিন সি উদ্ভিজ্জ উৎস থেকে আয়রন শোষণে সহায়তা করতে পারে।

ছোলায় থাকা খাদ্য আঁশের একটি অংশ অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে নিয়মিত ডালজাতীয় খাবার খাওয়া অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের জন্য উপকারী হতে পারে। সুস্থ অন্ত্রের জন্য শুধু ছোলা নয়, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল ও অন্যান্য আঁশসমৃদ্ধ খাবারও খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ছোলায় ম্যাগনেশিয়াম ও ফসফরাসসহ বিভিন্ন খনিজ আছে, যা হাড়ের গঠন ও কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত; তবে হাড় শক্ত রাখতে শুধু ছোলা ও গুড় যথেষ্ট নয়। পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, প্রোটিন এবং নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডও গুরুত্বপূর্ণ।

গুড়কে অনেক সময় সাদা চিনির স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে প্রচার করা হয়। সত্য হলো, গুড়ে সাদা চিনির তুলনায় কিছু খনিজ ও অন্যান্য উপাদান থাকতে পারে, কিন্তু গুড়ও মূলত চিনি এবং এতে যথেষ্ট ক্যালরি থাকে। তাই চিনি বাদ দিয়ে গুড় ব্যবহার করলেই খাবার স্বাস্থ্যকর হয়ে যাবে—এমন নয়; চা, দুধ, মিষ্টি বা অন্য খাবারে গুড় বেশি ব্যবহার করলে মোট চিনি গ্রহণও বেড়ে যেতে পারে। সুতরাং গুড় খেতে চাইলে অল্প পরিমাণে খাওয়াই ভালো।

ডায়াবেটিস থাকলে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সতর্কতা প্রয়োজন। মূল প্রতিবেদনে গুড়ের কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু গুড়কে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের খাবার হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়; গুড়েও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চিনি থাকে। ছোলার খাদ্য আঁশ ও প্রোটিন খাবারের পর রক্তে শর্করার ওঠানামা ধীর করতে সহায়তা করতে পারে, তবে গুড় যোগ করলে খাবারে অতিরিক্ত চিনি যুক্ত হয়। তাই ডায়াবেটিস থাকলে গুড়ের পরিমাণ বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ব্যক্তিগত খাদ্যতালিকার জন্য চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।

গুড় ও ছোলা খাওয়ার জন্য খালি পেট কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নয়। সকালে খেলে এটি নাশতার অংশ হতে পারে; আবার দিনের অন্য সময়ও স্বাস্থ্যকর নাশতা হিসেবে খাওয়া যায়। শরীরের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পুরো দিনের খাদ্যতালিকার ভারসাম্য। খালি পেটে খেলেই গুড় ও ছোলার পুষ্টিগুণ হঠাৎ বেড়ে যায়—এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। পরিমাণ ব্যক্তির বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম ও স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে। সাধারণ নাশতা হিসেবে এক মুঠো ভাজা ছোলার সঙ্গে অল্প পরিমাণ গুড় খাওয়া যেতে পারে। তবে গুড়ের পরিমাণ বাড়িয়ে খাওয়ার প্রয়োজন নেই; ছোলা বেশি খেলেও কারও কারও গ্যাস, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যা থাকলে নিয়মিত খাবারের তালিকায় বড় পরিবর্তন আনার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

খাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো এক মুঠো ভাজা ছোলার সঙ্গে অল্প গুড় খাওয়া; চাইলে এর সঙ্গে কয়েকটি বাদামও যোগ করা যায়। আরও পুষ্টিকর করতে ভাজা ছোলা, শসা, টমেটো, পেঁয়াজ, ধনেপাতা ও লেবুর রস দিয়ে চাট তৈরি করা যায় এবং এর সঙ্গে সামান্য গুড় রাখা যেতে পারে। সকালের নাশতায় চাইলে ভাজা ছোলা, একটি ডিম ও একটি ফলও রাখা যায়; এতে প্রোটিন, আঁশ ও অন্যান্য পুষ্টির বৈচিত্র্য বাড়বে।

গুড় ও ছোলা খাওয়ার সময় কয়েকটি ভুল এড়িয়ে চলা উচিত। অতিরিক্ত গুড় খাওয়া ঠিক নয়; গুড় স্বাস্থ্যকর মিষ্টি নয়, পরিমিত খেতে হবে। শুধু এই খাবারের ওপর নির্ভর না করে শরীরের সব পুষ্টির চাহিদা পূরণে বৈচিত্র্যময় খাবার প্রয়োজন। আঁশ বেশি খেলে পর্যাপ্ত পানি পান করাও জরুরি। ডায়াবেটিস থাকলে গুড় খাওয়ার আগে খাদ্যতালিকা ও রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ বিবেচনা করতে হবে। পেটের সমস্যা হলে পরিমাণ কমাতে হবে; ছোলা বেশি খেলে গ্যাস বা পেট ফাঁপার সমস্যা হতে পারে।

গুড় ও ভাজা ছোলা খুব সাধারণ খাবার হলেও এতে পুষ্টির ভালো সমন্বয় রয়েছে। ছোলা থেকে পাওয়া যায় প্রোটিন, খাদ্য আঁশ ও বিভিন্ন খনিজ; অন্যদিকে গুড় দ্রুত শক্তি দেওয়ার মতো চিনি সরবরাহ করে এবং এতে সামান্য কিছু খনিজও থাকে। তাই অল্প গুড়ের সঙ্গে এক মুঠো ছোলা সকালের নাশতা বা হালকা খাবার হিসেবে খাওয়া যেতে পারে। তবে গুড়কে স্বাস্থ্যকর চিনি ভেবে বেশি খাওয়া ঠিক নয়, বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা ওজন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে গুড়ের পরিমাণে নজর রাখা জরুরি। সবশেষে মনে রাখা ভালো, কোনো একটি খাবার একাই স্বাস্থ্য ভালো রাখে না। গুড় ও ছোলার পাশাপাশি শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণ শস্য, মাছ, ডিম বা প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য প্রোটিনের উৎস মিলিয়ে বৈচিত্র্যময় খাদ্যতালিকাই দীর্ঘমেয়াদে বেশি উপকারী।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া