রংপুর মহানগরীতে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে খুনের ঘটনার সময় নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য দিয়েছে পুলিশ। শুরুতে খুনের ঘটনাটি দিবাগত রাতে ঘটেছে বলে জানালেও, পরবর্তীতে পুলিশ দাবি করেছে ঘটনাটি ঘটেছে সকালবেলায়। একই ঘটনা নিয়ে তথ্যের এই ভিন্নতার কারণে তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তদন্তের অগ্রগতি জানাতে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টায় রংপুর মহানগর পুলিশ এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এই সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ তদন্তের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

গত শনিবার (২৩ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরীর কামালকাছনা মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাসা থেকে সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রাপ্তি ও ছেলে আয়ুস চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পরদিন রোববার সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামে দুই মামাতো ভাইকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় পুলিশ জানিয়েছিল, বৃহস্পতিবার রাতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

প্রাথমিক তথ্যে পুলিশ জানিয়েছিল, গণপতির বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবন করার সময় শব্দ পেয়ে তিনি সেখানে উঠলে গামছা দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। এরপর সিঁড়িতে স্ত্রী প্রীতিলতা এবং ঘর থেকে বেরিয়ে আসা মেয়ে আগামীকে হত্যা করা হয়। সবশেষে পরিচয় প্রকাশ পাওয়ার ভয়ে শিশু আয়ুশকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে অভিযুক্তরা।

তদন্তের গতি বাড়াতে এবং দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিলের লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার মামলার তদন্তভার কোতোয়ালি থানা থেকে ডিবি শাখায় হস্তান্তর করা হয়। এদিকে, অভিযুক্তদের বন্ধু সীমান্ত দাস মঙ্গলবার রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের কাছে ১৬৪ ধারায় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।

তবে বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ নতুন তথ্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, "হত্যার দিন ৯টি ইয়াবা সেবন করেছিল খুনিরা। তারা এর আগে এত বেশি ইয়াবা সেবন করেনি। এর আগে সর্বোচ্চ দুইটা ইয়াবা সেবন করেছিল। প্রথমে রাত তিনটা পর্যন্ত সীমান্তের বাড়িতে তারা ইয়াবা সেবন করেছিল। এরপর গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশের দেবুর ভবনের ছাদ দিয়ে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গণপতির বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা পানির ট্যাংকির আড়ালে মাদক সেবন করছিলেন। ইয়াবা সেবন করতে করতে ভোরের আলো ফুটে ওঠে।"

পুলিশ কমিশনার আরও জানান, সকালে ছাদে হাঁটতে এসে গণপতি তাদের দেখে ধমক দিয়ে বলেন–“তোরা এখানে কি করিছ”। তখন মান-সম্মানের ভয়ে তারা গণপতির গামছা দিয়ে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর পালিয়ে যাওয়ার সময় স্ত্রী ও মেয়ের চিৎকার শুনে প্রীতিলতার গলা চেপে ধরা হয়। সিদ্ধার্থ এক হাতে আগামী চক্রবর্তীর গলা চেপে ধরে এবং নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য কবুতরের খাবারের বাক্স থেকে রশি এনে তাকে হত্যা করে। সিসি ক্যামেরার ভয়ে সিদ্ধার্থ প্লাস দিয়ে বিদ্যুতের লাইন কেটে দেয় এবং লাশগুলো সিঁড়ির মধ্যে সরিয়ে রাখে।

মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, "তিনজনকে হত্যার পরে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ গণপতির রুমে ঢুকলে তখন বাচ্চাটা (আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম) জেগে উঠে। বাচ্চাটা সিদ্ধার্থকে দেখে বলে–‘দাদা তুমি এখানে কেন?’ তখন দুইজনে বাচ্চাটাকে বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে।"

পুলিশের দাবি, খুনের পর তারা ডাকাতির নাটক সাজাতে ড্রয়ার এলোমেলো করে এবং ১৫ হাজার টাকা ও কিছু স্বর্ণালঙ্কার চুরি করে। জুমার নামাজের সময় তারা দেয়াল টপকে পালিয়ে যায়। পরে সিদ্ধার্থ স্বর্ণালঙ্কারগুলো ‘পূর্ণিমা কাকীর’ বাসার পেছনে মাটিতে পুঁতে রাখে।

পুলিশের এই পরিবর্তিত বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব ও আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ। তিনি বলেন, "আসামিরা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে এখন কারাগারে রয়েছেন। আসামিদের জবানবন্দির পর পুলিশ বক্তব্য দিয়েছিল হত্যাকাণ্ড নিয়ে। পুলিশের আজকের বক্তব্যের সঙ্গে আগের বক্তব্যের বিস্তর অমিল রয়েছে।"

তিনি আরও প্রশ্ন করেন, আসামিদের রিমান্ডে নেওয়া বা নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদ না করেই পুলিশ এই নতুন তথ্য কোথায় পেল। শুরু থেকেই পুলিশের বক্তব্যে বিতর্ক ও সন্দেহ ছিল, যা এখন আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।