মেহেরপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ও ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে এক সংঘবদ্ধ চক্র ব্ল্যাকমেইলিং ও অর্থ আদায়ের বাণিজ্য চালাচ্ছে। মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষ ও অপরাধীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মুক্তকণ্ঠের হাতে এসেছে কল রেকর্ড, হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনশট, মোবাইল নম্বর, কললিস্ট এবং আর্থিক লেনদেনের নথিপত্র।
অনুসন্ধানে জানা যায়, খুলনার সাবেক পুলিশ সুপার তাজুল ইসলামের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ আইডি খোলা হয়েছে। এক ব্যক্তিকে ফোন করে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলার তালিকা দিতে বলা হয়। কলদাতা নিজেকে খুলনার পুলিশ সুপার পরিচয় দিয়ে অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে বলেন—‘মামলা বা গ্রেপ্তার নিয়ে তার কোনো চিন্তা নেই।’ কথিত ওই পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রতারক ব্যক্তিকে ‘খুশি’ রাখলেই সব ঠিক থাকবে বলে তাকে বলা হয়। শুধু তাই নয়, মেহেরপুরের পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করলেও থানা থেকে সে ‘সোজা বের হয়ে চলে আসবে’। এ বিষয়ে মেহেরপুরের পুলিশ সুপারকে বলে দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয়।
একই কল রেকর্ডে আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্যের নাম উঠে আসে। সেখানে ‘রুবেল’ নামের বরখাস্ত এক পুলিশ সদস্যকে খুশি করে দেওয়ার কথা বলা হয়। তার জন্য যতটুকু সম্ভব তা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। অন্যদিকে বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে কর্মরত এসআই শাহজাহান নামের এক ব্যক্তি এক সপ্তাহের মধ্যে মেহেরপুরে বদলি হবেন বলেও ওই কলদাতা দাবি করেন। তার সঙ্গে সখ্য তৈরি এবং তাকেও ‘খুশি’ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। একপর্যায়ে ওই প্রতারক অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে বলেন, ‘আমাকে কবে দাওয়াত দিচ্ছেন।’ এরপর ঢাকায় অথবা চট্টগ্রামে বসে দেখা করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। বলা হয়, এতে ওই ব্যক্তি ‘উপকৃত’ হবেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, যে নম্বর দিয়ে খুলনার সাবেক এসপির ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে কল করা হয়েছিল, সেটির অবস্থান ছিল মেহেরপুর সদর উপজেলায়। এবং সেই নম্বরটি মেহেরপুর শহরের মল্লিকপাড়ার রুকায়া কুলসুম কান্তা নামের এক নারীর নামে নিবন্ধিত। আরেকটি হোয়াটসঅ্যাপ স্ক্রিনশটে দেখা যায়, খুলনার সাবেক পুলিশ সুপার তাজুল ইসলামকে ‘খুশি’ করার কথা বলে প্রথমে ৫০০ ডলার এবং পরে এক হাজার ডলার চাওয়া হয়েছে। সবশেষ চাওয়া হয় ৫০ হাজার টাকা। অনুসন্ধানে ওই নম্বরটির লোকেশন মেহেরপুরের নতুনপাড়া এলাকায় পাওয়া গিয়েছিল। গত ৬ আগস্টের পর থেকে নম্বরটি বন্ধ রয়েছে। তবে ওই নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট এখনো চালু রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মেহেরপুর সদর উপজেলার বিলকোলা গ্রামের জিহাদ ওরফে জাহিদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ, গত প্রায় দেড় বছর ধরে তিনি নিজেকে মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার ডিজিএফআইয়ের প্রধান পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল ও জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করে আসছেন। একসময় মেহেরপুরের সাবেক কোর্ট ওসি বজলুর রহমান তাকে সহায়তা করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন মামলার আসামিদের তালিকা ও মামলার বিবরণ কোর্ট পুলিশ পরিদর্শকের কাছ থেকে সংগ্রহ করতেন জিহাদ। পরে এসব তথ্য ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ব্ল্যাকমেইল করা হতো। ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে আদায় করা টাকা বিভিন্ন এজেন্ট ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে সংগ্রহ করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জাহিদের একটি কল রেকর্ড মুক্তকণ্ঠের হাতে এসেছে। সেখানে একজন ব্যক্তিকে ‘জিজ্ঞাসাবাদের’ জন্য ডাকা হচ্ছে। একই সঙ্গে অন্য এক অপরাধীর বর্তমান অবস্থা উল্লেখ করে অপর প্রান্তের ব্যক্তিকে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করতে শোনা যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা নেওয়ার তথ্যও অনুসন্ধানে জানা গেছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, জাহিদ মেহেরপুর সদর উপজেলার বিলকোলা গ্রামের সাজাহান আলীর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ব্যবহার করে একটি গ্রামীণফোন সিম কেনেন। সিমটি কেনা ও সক্রিয় করার লোকেশন বগুড়া দেখালেও বছরের বেশিরভাগ সময় সেটি মেহেরপুর এলাকায় সক্রিয় থাকে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
জাহিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি ব্যস্ততার কথা জানিয়ে বলেন, গাংনী র্যাব ক্যাম্পের কমান্ডার তাকে ডাকছেন। এ কারণে তিনি মেহেরপুর থেকে গাংনীর দিকে যাচ্ছেন এবং ওই মুহূর্তে দেখা করা সম্ভব নয়। মেহেরপুরে ডিজিএফআইয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্জেন্ট কবির হোসেন বলেন, বিষয়টি মেহেরপুরের পুলিশ সুপারকে জানানো হয়েছে। তবে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে দাবি করেন তিনি। এরপর বিষয়টি নিয়ে আর কোনো খোঁজখবর নেওয়া বন্ধ রেখেছেন বলেও জানান সেই সার্জেন্ট।
অভিযোগের বিষয়ে খুলনার পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমি গত পরশু খুলনা জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেছি। তবে অডিওতে যে গলাটি শোনা যাচ্ছে, সেটি আমার পূর্ববর্তী পুলিশ সুপার তাজুল ইসলামের নয়। সম্ভবত কোনো প্রতারক চক্র অপরাধীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিতে এই পন্থা অবলম্বন করছে।” তিনি বলেন, “ইতিপূর্বে আমি যখন ডিটেকটিভ স্কুলে কর্মরত ছিলাম, সে সময় আমার নামেও এরকম একটি ভুয়া হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট করেছিল কিছু প্রতারক চক্র।”
মেহেরপুরের পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার রায় বলেন, “বিষয়টি সামনে আনার জন্য মুক্তকণ্ঠকে ধন্যবাদ। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করব। প্রতারণায় ব্যবহৃত ফোন নম্বরগুলো শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি বলেন, “কেউ পুলিশের নাম, কোনো কর্মকর্তার পরিচয় কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো সংস্থার নাম ব্যবহার করে অপরাধ করলে তার দায় কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট সংস্থার ওপর বর্তাবে না। তবে অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” ভুক্তভোগীদের উদ্দেশে মেহেরপুরের পুলিশ সুপার বলেন, “আপনারা যদি এ ধরনের কোনো প্রতারণার শিকার হন, তাহলে ভয় পাওয়ার বা প্রতারকদের টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সরাসরি পুলিশকে বিষয়টি জানান। কল রেকর্ড, হোয়াটসঅ্যাপের স্ক্রিনশট, ব্যবহৃত নম্বর, অর্থ লেনদেনের তথ্যসহ যত ধরনের প্রমাণ আছে সেগুলো সংরক্ষণ করুন। এসব তথ্য তদন্তে অপরাধীদের শনাক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
এদিকে গত ১১ জুন নিজেকে পুলিশের বিশেষ শাখা (ডিএসবি) বা গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) পদে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাড়ে ছয় লাখ টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে শামীম হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেছিল মেহেরপুর সদর থানা পুলিশ। এ ঘটনায় মেহেরপুর সদর থানায় প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছে। আবার গত ১৮ আগস্ট মেহেরপুর সদর উপজেলার রায়পুর গ্রামে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সদস্যের ভুয়া পরিচয় ধারণ করে মাদক উদ্ধারে গিয়ে মামুন নামের এক যুবক স্থানীয়দের হাতে আটক হন। পরে তাকে সদর থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
সম্প্রতি মেহেরপুর র্যাব ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডারের দেওয়া একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি একটি প্রতারক চক্র ০১৯১৮৮৬৫১৬৫ নম্বর ব্যবহার করে স্থানীয় জনসাধারণ, রাজনৈতিক ব্যক্তি, বিশিষ্ট ব্যবসায়ীসহ অন্যদের নিকট র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয় প্রদান করে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অপতৎপরতা চালাচ্ছে। এটি সম্পূর্ণ একটি প্রতারণামূলক প্রক্রিয়া। এতে আরও বলা হয়, র্যাব বা অন্য কোনো সরকারি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ফোনে কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন করে না। এই ধরনের কোনো সন্দেহজনক ফোন বা বার্তা আসিলে কোনো অবস্থাতেই অর্থ লেনদেন না করার জন্য অনুরোধ করা হলো। একই সাথে বিষয়টি দ্রুত র্যাব অথবা স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার পরামর্শ দেওয়া হলো.