দীর্ঘ আট বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও বাংলাদেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। আজ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে শুরু হচ্ছে ছয়টি দলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী দিনেই মাঠে নামছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তান। দিনের দ্বিতীয় ম্যাচে স্বাগতিক বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হিসেবে মাঠে নামবে ভুটান। তবে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই টিকিটের অত্যধিক মূল্য, দর্শকদের আগ্রহের অভাব এবং আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। মাঠের বাইরের এসব বিতর্ক ছাপিয়ে এখন কেবল ফুটবলেই মনোযোগ দিতে চান সমর্থকেরা। যারা স্টেডিয়ামে যেতে পারবেন না, তারা টেলিভিশন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সরাসরি এই আসরের ম্যাচগুলো উপভোগ করতে পারবেন।
এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ১৫তম আসরে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও ভুটান। ছয়টি দলকে দুটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। ‘এ’ গ্রুপে বাংলাদেশের সঙ্গী হিসেবে রয়েছে ভুটান ও শ্রীলঙ্কা। অন্যদিকে ‘বি’ গ্রুপে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ভারত, পাকিস্তান ও মালদ্বীপ। প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করবে।
উদ্বোধনী দিনে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য দুটি আকর্ষণীয় ম্যাচ রাখা হয়েছে। প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হবে ভারত ও পাকিস্তান। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টায় শুরু হবে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই। এরপর রাত ৮টায় ভুটানের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামবে বাংলাদেশ।
টুর্নামেন্টের সব ম্যাচ সরাসরি সম্প্রচারের স্বত্ব পেয়েছে দেশের বেসরকারি ক্রীড়াভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল টি স্পোর্টস। দক্ষিণ এশীয় ফুটবল ফেডারেশন (সাফ) এরই মধ্যে চ্যানেলটিকে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সম্প্রচার অংশীদার হিসেবে নিশ্চিত করেছে।
তবে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের টিভি সম্প্রচারের সময় নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের টিভি সূচিতে টি স্পোর্টসে ম্যাচটির সম্প্রচার বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে সাফের নির্ধারিত সূচি এবং সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, খেলা শুরু হবে বিকেল সাড়ে ৩টায়। ফলে ম্যাচটি টেলিভিশনে শুরু থেকে সরাসরি দেখা যাবে কি না, তা জানতে চ্যানেলটির হালনাগাদ সম্প্রচারসূচি দেখে নেওয়া ভালো। তবে বাংলাদেশের ম্যাচের সময় নিয়ে এমন কোনো বিভ্রান্তি নেই। রাত ৮টায় টি স্পোর্টসে বাংলাদেশ-ভুটান ম্যাচের সম্প্রচার নির্ধারিত রয়েছে।
টেলিভিশনের পাশাপাশি অনলাইনেও খেলা দেখার সুযোগ রয়েছে। বাংলালিংকের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম টফির অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে সরাসরি সম্প্রচারিত হবে টুর্নামেন্টের ম্যাচগুলো। এ জন্য ৯৯ টাকায় পুরো টুর্নামেন্টের পাস কেনার সুযোগ রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। আগে ৪৯ টাকার বিশেষ ছাড় থাকলেও সেই অফারের মেয়াদ ছিল টুর্নামেন্ট শুরুর আগের দিন পর্যন্ত।
এ ছাড়া ডিজিটাল সম্প্রচারস্বত্ব পাওয়া বঙ্গোর অ্যাপ ও ওয়েবসাইটেও দেখা যাবে সাফের খেলা। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত ও পাকিস্তান বাদে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে টুর্নামেন্টটি সম্প্রচারের স্বত্ব পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বঙ্গোও পুরো টুর্নামেন্টের জন্য বিশেষ পাসের ব্যবস্থা করেছে। তবে পাসের বর্তমান মূল্য ও ব্যবহারসংক্রান্ত শর্ত সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্ম থেকে জেনে নিতে হবে।
মোবাইল ফোন, কম্পিউটার কিংবা সমর্থিত স্মার্ট টিভিতে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে খেলা দেখতে পারবেন দর্শকেরা। ফলে স্টেডিয়ামে যেতে না পারলেও ঘরে বসেই উপভোগ করা যাবে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের এই আসর।
অন্যদিকে গ্যালারিতে বসে খেলা দেখতে আগ্রহীদের জন্য টিকিট বিক্রি হচ্ছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম টিকিফাইয়ে। সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম শুরু হচ্ছে ৯৯৯ টাকা থেকে। ভ্যাটসহ খরচ পড়ছে প্রায় ১ হাজার ৭০ টাকা। ক্লাব হাউসের টিকিট ৩ হাজার ৯৯৯ টাকা এবং ভিআইপি টিকিটের দাম ৬ হাজার ৯৯৯ টাকা, ভ্যাট ছাড়া।
তবে একটি টিকিটেই একই দিনের দুটি ম্যাচ দেখার সুযোগ পাবেন দর্শকেরা। অর্থাৎ উদ্বোধনী দিনের টিকিট কিনলে ভারত-পাকিস্তান ও বাংলাদেশ-ভুটান, দুটি ম্যাচই দেখা যাবে। আলাদা করে দ্বিতীয় ম্যাচের টিকিট কেনার প্রয়োজন নেই।
যদিও টিকিটের উচ্চমূল্য নিয়ে শুরু থেকেই সমালোচনা চলছে। গত ২ নভেম্বর দ্য ডেইলি স্টারের প্রকাশিত প্রতিবেদনে টিকিফাইয়ের বিভিন্ন গ্যালারির আসন বিশ্লেষণ করে জানানো হয়, তখনো পর্যবেক্ষণ করা আসনগুলোর আনুমানিক ৮৫ শতাংশ অবিক্রীত ছিল। ফলে টুর্নামেন্ট শুরুর দিন গ্যালারিতে কতটা দর্শক উপস্থিত থাকবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
শুধু টিকিটের দাম নয়, টুর্নামেন্ট ঘিরে প্রচার-প্রচারণার ঘাটতিও আলোচনায় এসেছে। আট বছর পর ঢাকায় ফিরলেও সাফকে ঘিরে প্রত্যাশিত উন্মাদনা তৈরি হয়নি বলে স্বীকার করেছেন বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল। তবে মাঠের খেলা শুরু হলে দর্শকদের আগ্রহ বাড়বে বলে আশা তাঁর।
আয়োজনের প্রস্তুতি ও সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর অনুশীলনের সময়সূচি, আগমনের তথ্য এবং সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগে ঘাটতির অভিযোগ এসেছে। ভারতীয় দলের আবাসনসংক্রান্ত জটিলতার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ফুটবল প্রতিযোগিতার মাঠের বাইরের প্রস্তুতিও এখন আলোচনায়।
বাংলাদেশের জন্য মাঠের চ্যালেঞ্জও কম নয়। সবশেষ ২০০৩ সালে ঘরের মাঠে সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। এরপর কেটে গেছে ২৩ বছর। ২০০৫ সালে ফাইনালে উঠলেও আর শিরোপার দেখা পায়নি বাংলাদেশ।
এবার সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটানোর স্বপ্ন দেখছে থমাস ডুলির দল। তবে প্রথম ম্যাচেই পাওয়া যাচ্ছে না তারকা মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরীকে। ক্লাবের ব্যস্ততার কারণে ভুটানের বিপক্ষে খেলতে পারবেন না তিনি। একই কারণে থাকছেন না ইংল্যান্ডপ্রবাসী ফুটবলার ফারহান আলী ওয়াহিদও। অন্যদিকে চোটের কারণে পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে গেছেন তরুণ ফরোয়ার্ড রোনান সুলিভান।
প্রস্তুতির জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ অনুশীলন ম্যাচও খেলতে পারেনি বাংলাদেশ। এমন পরিস্থিতিতে দলের সমন্বয় ও আক্রমণভাগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। তবে ঘরের মাঠের সুবিধা কাজে লাগিয়ে ভালো শুরুর ব্যাপারে আশাবাদী স্বাগতিকরা।
ভুটানের পর গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা। আগামী ১১ নভেম্বর রাত ৮টায় অনুষ্ঠিত হবে সেই ম্যাচ। গ্রুপ পর্ব শেষে ১৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে দুটি সেমিফাইনাল। আর ১৭ নভেম্বর শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ দিয়ে পর্দা নামবে এবারের আসরের।
দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে সবচেয়ে সফল দল ভারত। এখন পর্যন্ত রেকর্ড নয়বার সাফের শিরোপা জিতেছে তারা। অন্যদিকে বাংলাদেশের একমাত্র শিরোপা এসেছে ২০০৩ সালে। দীর্ঘ বিরতির পর ঘরের মাঠে আবারও সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তির সুযোগ লাল-সবুজের সামনে।
তবে শিরোপার স্বপ্ন কতটা বাস্তব হবে, তার প্রথম পরীক্ষা আজ রাতেই। মাঠের বাইরের নানা প্রশ্ন পেছনে ফেলে ভুটানের বিপক্ষে জয় দিয়ে সাফ অভিযান শুরু করতে পারে কি না বাংলাদেশ, সেটিই এখন দেখার।