মাঠের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং অংশগ্রহণকারী দলগুলোও একে একে ঢাকায় পৌঁছাতে শুরু করেছে। আর মাত্র দুই দিন পরেই ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে শুরু হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। তবে টুর্নামেন্টকে ঘিরে যে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকার কথা ছিল, বাস্তবে তার তেমন কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। টিকিটের চড়া দাম এবং আয়োজকদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কারণে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই আয়োজনের জৌলুশে ভাটা পড়েছে। আজ দুপুর পর্যন্ত পাওয়া তথ্যানুযায়ী, উদ্বোধনী দিনের সাধারণ গ্যালারির প্রায় ৭৫ শতাংশ টিকিটই এখনো অবিক্রীত রয়ে গেছে। অথচ এই বিশেষ দিনেই মাঠে নামবে স্বাগতিক বাংলাদেশ দল।

জাতীয় স্টেডিয়ামের মোট আসনসংখ্যা প্রায় ২২ হাজার, যার মধ্যে সাধারণ গ্যালারির আসন সংখ্যা ১৮ হাজার ৩০০টি। টিকিট বিক্রির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান টিকিফাইয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, আজ বেলা ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত উদ্বোধনী দিনের জন্য ১৩ হাজার ৭৩৬টি টিকিট অবিক্রীত ছিল।

আগামী বৃহস্পতিবার উদ্বোধনী দিনে মোট চার দল মাঠে নামবে। বেলা সাড়ে তিনটায় লড়াই করবে ভারত ও পাকিস্তান। আর রাত আটটায় স্বাগতিক বাংলাদেশের মুখোমুখি হবে ভুটান। একই দিনে দুটি ম্যাচ দেখার সুযোগ থাকলেও দর্শকদের মধ্যে টিকিট কাটার তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। সাধারণ গ্যালারির প্রতিটি টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার টাকা। আয়োজকদের যুক্তি হলো, একটি টিকিটের মাধ্যমেই দিনের দুটি ম্যাচ দেখা যাবে। তবে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের আর্থিক সামর্থ্যের কথা চিন্তা করলে এক হাজার টাকা যথেষ্ট বেশি। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খেলা দেখতে গেলে এই খরচ আরও বাড়বে, যা দর্শকদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে টিকিটের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে দর্শকদের কথা কতটা বিবেচনা করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

টিকিটের উচ্চমূল্যের পাশাপাশি দর্শক টানতে প্রচারণার চরম ঘাটতিও পরিলক্ষিত হচ্ছে। একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতার আগে যে ধরনের ব্যাপক প্রচার প্রয়োজন, সাফের ক্ষেত্রে তার ধারেকাছেও কিছু দেখা যাচ্ছে না। অথচ ২০০৩ কিংবা ২০১৮ সালে ঢাকায় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আয়োজন ছিল অত্যন্ত বর্ণাঢ্য ও আকর্ষণীয়।

জানা গেছে, স্বাগতিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে ৫০ লাখ টাকা প্রদান করেছে সাফ। দক্ষিণ এশীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি টুর্নামেন্টের পুরো আয়োজন নিজেদের ব্যবস্থাপনায় করার জন্য বাফুফের সঙ্গে চুক্তি করেছে। এই কারণে আয়োজনের সার্বিক পরিস্থিতি অনেকটা দূর থেকেই পর্যবেক্ষণ করছে বাফুফে।

এই বিষয়ে সাফের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন বাফুফের কম্পিটিশন কমিটির চেয়ারম্যান গোলাম গাউস। সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “এবার সাফ নিজেরাই সবকিছু করছে। আমাদের কথাও সেভাবে শুনছে না। কিছু জানতে চাইলে বলছে, সব সময়মতো হয়ে যাবে। অথচ খেলা শুরু হতে আর দুই দিন বাকি।”

গোলাম গাউস এই কথা বললেও, স্বাগতিক দেশ হিসেবে টুর্নামেন্টটিকে আকর্ষণীয় করে তোলার ক্ষেত্রে বাফুফের কি কোনো দায়িত্ব নেই—এই প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত বাফুফেকে খুব একটা সক্রিয় মনে হচ্ছে না; তারা সবকিছুর দায়িত্ব সাফের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ফলে এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ শুরুর আগে জনমনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি আয়োজকরা।

আয়োজনের দুর্বলতা কেবল টিকিট বিক্রিতেই নয়, বরং তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রেও প্রকট। কোন দল কখন ঢাকায় পৌঁছাবে, কোথায় অনুশীলন করবে এবং অনুশীলনের সময়সূচি কী—এই বিষয়গুলোতে সাফের পক্ষ থেকে নিয়মিত ও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

ইতিমধ্যেই দলগুলো ঢাকায় আসা শুরু করেছে। সবার আগে পৌঁছেছে ভুটান। আজ এসেছে ভারত ও শ্রীলঙ্কা। পাকিস্তান দলেরও আজ ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। দলগুলো যখন টুর্নামেন্টের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন আয়োজকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে গণমাধ্যমকর্মীদের রীতিমতো গলদঘর্ম হতে হচ্ছে।

সাফের ইতিহাসে বাংলাদেশের আবেগ ও প্রত্যাশা বরাবরই অনেক বেশি। ১৯৯৩ সালে শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে সফল দল ভারত, যারা নয়বার শিরোপা জিতেছে। মালদ্বীপ জিতেছে দুটি শিরোপা এবং আফগানিস্তান ও শ্রীলঙ্কা একবার করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বাংলাদেশের সাফল্য এসেছে মাত্র একবার, ২০০৩ সালে। সেবার ঢাকায় ফাইনালে মালদ্বীপকে টাইব্রেকারে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল বাংলাদেশ। দীর্ঘ ২৩ বছর পর আবারও ঘরের মাঠে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছে লাল-সবুজের দল।

তবে এবারও শিরোপার অন্যতম প্রধান দাবিদার ভারত। পাশাপাশি অন্য দলগুলোরও নিজেদের প্রমাণের সুযোগ রয়েছে। মাঠে ছয় দলের লড়াই জমে উঠতে পারে, কিন্তু সেই লড়াইয়ের উত্তাপ গ্যালারিতে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়।

একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের সাফল্য কেবল মাঠের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না। দর্শকের উপস্থিতি, সঠিক প্রচারণা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে সমন্বয়—সব মিলিয়েই তৈরি হয় একটি আসরের জৌলুশ। সাফ শুরুর আগেই এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি স্পষ্ট। এক হাজার টাকার টিকিট, প্রচারণার অভাব এবং তথ্য সরবরাহে উদাসীনতা মিলিয়ে দর্শকদের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি করেছেন আয়োজকরা।

শেষ মুহূর্তে প্রচারণা বাড়িয়ে এবং টিকিট বিক্রিতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা বদলানোর সুযোগ এখনো আছে। তবে প্রস্তুতির যে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, তাতে উদ্বোধনী দিনেও গ্যালারির বড় অংশ ফাঁকা থাকার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সাফের মঞ্চ তৈরি হলেও দর্শকদের জন্য সেই মঞ্চ উৎসবমুখর করতে আয়োজকরা কতটা প্রস্তুত—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।