কেউ ২০০৩ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতেছিলেন, আবার কেউ ২০১০ সালের এসএ গেমসে এনেছিলেন স্বর্ণপদক। বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসের এই দুই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের নায়করা দীর্ঘ সময় পর আবারও একত্রিত হলেন একই সবুজ গালিচায়। সময়ের আবর্তনে বয়স বেড়েছে, অনেকের ফুটবল মাঠের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে বহু বছর আগে। তবে ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে বল পায়ে নামতেই যেন তারা ফিরে গেলেন সেই সোনালি দিনগুলোতে। আসন্ন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আগে দুই চ্যাম্পিয়ন দলের এই মিলনমেলায় ছিল স্মৃতিচারণ, আবেগ এবং বর্তমান প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য অনুপ্রেরণা। একটি প্রীতি ম্যাচে ২০০৩ সালের সাফজয়ী দলকে ২-১ গোলে পরাজিত করেছে ২০১০ সালের এসএ গেমসে সোনাজয়ী দল।

রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে এই ব্যতিক্রমী প্রীতি ম্যাচের আয়োজন করা হয়। দুই দলের ফুটবলাররা মাঠে নামেন তাদের ঐতিহাসিক সাফল্যের সময়কার জার্সির আদলে তৈরি পোশাক পরে। ৬০ মিনিটের এই ম্যাচে জয়-পরাজয়ের লড়াই থাকলেও মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের ফুটবলের সোনালি অতীতকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং বর্তমান জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের উৎসাহিত করা।

মাঠে উপস্থিত ছিলেন আলফাজ আহমেদ, আরমান মিয়া, বিপ্লব ভট্টাচার্য্য, এনামুল হক, জাহিদ হাসান এমিলি, মামুনুল ইসলামসহ দুই প্রজন্মের জনপ্রিয় ফুটবলাররা। দীর্ঘ বিরতির পর একসঙ্গে মাঠে নেমে তাদের পায়ের কারিকুরি, নিখুঁত পাস এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল যেন পুরোনো দিনের সেই ঝলককেই মনে করিয়ে দিচ্ছিল।

ম্যাচের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। বাংলাদেশের ফুটবলের এই দুটি ঐতিহাসিক সাফল্যেরই অংশ ছিলেন সাবেক এই গোলরক্ষক। ২০০৩ সালে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর ২০১০ সালের এসএ গেমসেও সোনার পদক জিতেছিলেন তিনি। ফলে দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ে তাঁকে খেলতে হলো দুই পক্ষের হয়েই।

প্রথমার্ধে ২০০৩ সালের সাফজয়ী দলের ৯ নম্বর জার্সি পরে আক্রমণভাগে খেলেন আমিনুল। বিরতির পর তিনি ২০১০ সালের সোনাজয়ী দলের ১ নম্বর জার্সি গায়ে মাঠে নামেন। যদিও গোলরক্ষক হিসেবে তিনি সুপরিচিত, তবে এদিন আক্রমণভাগে গোল করার সুযোগ পেয়েও তা কাজে লাগাতে পারেননি তিনি।

খেলার লড়াইয়ে প্রথমে এগিয়ে যায় ২০১০ সালের এসএ গেমসে সোনাজয়ী দল। নাসিরুল ইসলাম নাসিরের গোলে তারা লিড নিলেও তা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনি। পেনাল্টি থেকে গোল করে ২০০৩ সালের সাফজয়ীদের সমতায় ফেরান আলফাজ আহমেদ। তবে পরবর্তীতে মিঠুন চৌধুরীর গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে অপেক্ষাকৃত তরুণ দলটি।

ম্যাচের শেষ দিকে ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন আমিনুল। কিন্তু তাঁর নেওয়া পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেন বিপ্লব ভট্টাচার্য্য। ফলে জয় পেলেও ব্যবধান আর বাড়াতে পারেনি এসএ গেমসের সোনাজয়ীরা। তবে এই ম্যাচে ফলাফলের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল সাবেক তারকাদের এই পুনর্মিলন।

বাংলাদেশের ফুটবলে ২০০৩ সালের সাফ জয়ের স্মৃতি এখনো বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। সেবার জাতীয় স্টেডিয়ামে মালদ্বীপকে টাইব্রেকারে হারিয়ে প্রথমবার দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হয়েছিল বাংলাদেশ। ফাইনালে প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি ঠেকিয়ে শিরোপা জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন আমিনুল।

সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারেননি সাবেক এই গোলরক্ষক। ফাইনালের টাইব্রেকারে মালদ্বীপের দ্বিতীয় শট ঠেকানোর পর সুজনের নেওয়া শেষ শট জালে জড়াতেই পুরো স্টেডিয়াম উল্লাসে ফেটে পড়েছিল বলে স্মরণ করেন তিনি।

সাত বছর পর একই স্টেডিয়ামে আরেকটি স্মরণীয় সাফল্য পেয়েছিল বাংলাদেশ। ২০১০ সালের এসএ গেমস ফুটবলের ফাইনালে আফগানিস্তানকে ৪-০ গোলে হারিয়ে স্বর্ণপদক জিতেছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। সেই দলের অন্যতম ফরোয়ার্ড জাহিদ হাসান এমিলিও ছিলেন রোববারের পুনর্মিলনীতে।

ম্যাচের আয়োজনে বিশেষ মুহূর্ত তৈরি হয় বিরতির সময়। ২০০৩ সালে বাংলাদেশকে সাফের শিরোপা জেতানো প্রয়াত অস্ট্রিয়ান কোচ জর্জ কোটানের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন সাবেক শিষ্যরা। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মারা যান বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকা এই কোচ।

কোটানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ২০০৩ সালের দলের ফুটবলাররা। আলফাজ আহমেদ স্মরণ করেন, “ফাইনালের আগে দলের বৈঠকে কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন কোটান।” কোচের সেই আবেগ ফুটবলারদের শিরোপা জয়ের জন্য আরও বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল।

পুরোনো জার্সি গায়ে আবার মাঠে নামার অভিজ্ঞতা বিশেষ হয়ে ছিল রোকনুজ্জামান কাঞ্চনের কাছেও। ২০০৩ সালের সাফে তিন গোল করা এই ফরোয়ার্ডের কাছে ২৩ বছর আগের স্মৃতি যেন নতুন করে ফিরে এসেছে।

এবারের পুনর্মিলনীর পেছনে অবশ্য আরও একটি বড় লক্ষ্য রয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকায় শুরু হচ্ছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। ঘরের মাঠের এই আসরে দীর্ঘ ২৩ বছরের শিরোপাখরা কাটাতে চায় বাংলাদেশ। বর্তমান জাতীয় দলকে সেই স্বপ্ন পূরণের অনুপ্রেরণা দিতেই সাবেক দুই চ্যাম্পিয়ন দলকে নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে প্রীতি ম্যাচ।

আমিনুলের প্রত্যাশা, বর্তমান ফুটবলাররাও নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়ে দেশের জন্য খেলবেন। ২০০৩ ও ২০১০ সালের সাফল্যের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে আবারও দেশের মানুষকে শিরোপা জয়ের আনন্দে ভাসাবেন তারা।