গতকাল সন্ধ্যায় জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রবেশ করলেই টুর্নামেন্টের আমেজ স্পষ্টভাবে টের পাওয়া যাচ্ছিল। মাঠের চারপাশ জুড়ে ব্যস্ততা চলছে ইলেকট্রনিক বিলবোর্ড স্থাপনের। এক প্রান্তে গায়ক সঞ্জয়ের নাচ-গানের মহড়া মাত্রই শেষ হয়েছে। খেলার জন্য মাঠের প্রস্তুতিও এখন সম্পূর্ণ। সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আজ ঢাকায় শুরু হতে যাচ্ছে ১৫তম সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ।
১৯৯৩ সালে পাকিস্তানে প্রথম আয়োজিত হওয়ার পর থেকে ‘দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ’ হিসেবে পরিচিত সাফের ৩৩ বছরের ইতিহাসে মোট ১৪টি আসরের মধ্যে ৯টিতেই শিরোপা জিতেছে ভারত। মালদ্বীপ জিতেছে দুবার, আর বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান একবার করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তবে ২০১৩ সালের চ্যাম্পিয়ন আফগানিস্তান ২০১৮ সাল থেকে এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ না করায় প্রতিযোগিতার তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পায়। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ফিরিয়ে আনতে ২০২৩ আসরে অতিথি দল হিসেবে কুয়েত ও লেবাননকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও ভারতকে থামানো যায়নি। সর্বশেষ দুটি আসরেই তারা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।
তবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, ভারত এখন আর আগের মতো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে না। বর্তমান ফিফা উইন্ডোতে তারা তাদের মূল দলকে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ খেলতে পাঠিয়েছে। আর ঢাকায় তারা পাঠিয়েছে অনূর্ধ্ব-২৩ দল। যদিও ২০০৯ সালেও দ্বিতীয় সারির দল নিয়ে ঢাকা থেকে ট্রফি জিতে নিয়ে গিয়েছিল প্রতিবেশী এই দেশটি।
ভারতের মূল দলের অনুপস্থিতি অন্য দলগুলোর জন্য নিঃসন্দেহে একটি স্বস্তির খবর, বিশেষ করে স্বাগতিক বাংলাদেশের জন্য। ভারতের মূল দল না আসা এবং ফিফা নিষেধাজ্ঞার কারণে নেপালের ছিটকে পড়ার ফলে ২৩ বছর পর শিরোপা পুনরুদ্ধারের এক নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের সামনে।
নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দল নিয়ে ঘরের মাঠে সাফ লড়াইয়ে নামছে বাংলাদেশ। হামজা চৌধুরী এবং শমিত সোমসহ ১০ জন প্রবাসী ফুটবলারকে নিয়ে গঠিত এই দলটি যদি ২৩ বছরের খরা ঘোচাতে ব্যর্থ হয়, তবে তা হবে এক বড় ব্যর্থতা। শুধু বাংলাদেশই নয়, ১৬ জন প্রবাসী ফুটবলার নিয়ে গঠিত শ্রীলঙ্কা দলও এবার প্রতিপক্ষের মনে সমীহ জাগাচ্ছে।
বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে পাকিস্তান দলও। তবে তাদের স্কোয়াডে সাতজন প্রবাসী থাকলেও ক্লাবের ছাড়পত্র না পাওয়ায় কয়েকজন ফুটবলার এখনো পৌঁছাতে পারেননি। দল সেমিফাইনালে উঠলে তাঁরা যোগ দেবেন বলে জানা গেছে। সব মিলিয়ে এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ যেন প্রবাসীদের লড়াইয়ের এক মঞ্চে পরিণত হতে যাচ্ছে।
আজ উদ্বোধনী দিনে বেলা সাড়ে তিনটায় দর্শকদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে ভারত-পাকিস্তান লড়াই। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বৈরিতার মাঝে ভারতের কোচ নওশাদ মুসা গতকাল এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, “অবশ্যই তাঁরা পাকিস্তানের ফুটবলারদের সঙ্গে করমর্দন করবেন, প্রয়োজনে কোলাকুলিও করবেন ভারতের ফুটবলাররা।” তাঁর এই মন্তব্য যেন শান্তির বার্তাই ছড়িয়ে দিয়েছে।
মালদ্বীপ দল আজ রাতে ঢাকায় পৌঁছাবে। টুর্নামেন্ট শুরুর আগের দিন বাকি পাঁচ দল ঢাকার একটি হোটেলে প্রথাগত সংবাদ সম্মেলন করেছে। শ্রীলঙ্কা ও ভারতের কোচ সরাসরি না বললেও পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন যে, এবার বাংলাদেশই ফেবারিট। শ্রীলঙ্কার কুয়েতি কোচ আল মুতাইরি সংবাদ সম্মেলনে রসিকতার ছলে একটি মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলেছেন। তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশ ম্যাচে ফারহান আলী ওয়াহিদের জার্সি যেন তাঁর দলের কোনো ফুটবলার না নেয়, নিলে তাঁকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হবে! লাগলে যেন হামজারটা নেয়। কারণ, ফারহানেরটা নাকি তিনি নিজেই নেবেন!”
এবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনে নতুনত্বের পাশাপাশি কিছু অব্যবস্থাপনার ছাপও দেখা যাচ্ছে। সাফের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভিএআর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে এবার। তবে ট্রফি উন্মোচন না হওয়া, বিমানবন্দর ও হোটেল সংক্রান্ত জটিলতা এবং প্রচার-প্রচারণার অভাব নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। এখন মাঠের রোমাঞ্চকর ফুটবলই পারে এই সব ঘাটতি ভুলিয়ে দিতে।