ভোর হওয়ার সাথে সাথেই খুলনার ভৈরব নদের তীরের ব্যবসায়িক ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। ওয়েস্ট মেকট রোডের মতো সংকীর্ণ সড়কগুলোর অর্ধেকটা দখল করে থাকে সারি সারি দোকানের মালামাল, যার মাঝে ঠাসাঠাসি করে চলে ঠেলাগাড়ি, ভ্যান আর রিকশা। কুলিদের উচ্চকণ্ঠের হাঁকডাক আর ক্রেতা-বিক্রেতাদের দর-কষাকষির শব্দে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এক সময় ভৈরব নদের পাড়ে দিনরাত মালবাহী নৌযানের দীর্ঘ সারি দেখা যেত, যা এখন প্রায় বিলীন। রেলের বগিতে করে পণ্য আসার সেই পুরোনো দৃশ্যপটও এখন স্মৃতি। বর্তমানে সিংহভাগ মালামাল সড়কপথে ট্রাকের মাধ্যমে এখানে পৌঁছায়। পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার এই আমূল পরিবর্তনই জানান দেয়, এই অঞ্চলটি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র—ঐতিহ্যবাহী ‘বড় বাজার’। যদিও আগের সেই জৌলুস কিছুটা ম্লান হয়েছে, তবুও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার হিসেবে এই প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্রটি এখনো তার অবস্থান ধরে রেখেছে।

খুলনার এই প্রাচীন বড় বাজারে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় প্রধান খাদ্যপণ্য চাল ও মসলার। খুলনা ধান-চাল বণিক সমিতি এবং খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি মো. মুনীর আহমেদ বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হয় চাল ও মসলার। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসার পরিমাণ আগের তুলনায় কমেছে, তবু এখনো বাজারের মোট বাণিজ্যের অর্ধেকটাই হচ্ছে চাল ও মসলা।’

খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক সময় এই বাজারের মাসিক লেনদেনের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত, যা বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে ৬৫০ থেকে ৭৫০ কোটি টাকায়। বর্তমানে এখানে দৈনিক গড়ে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়। এই হিসেবে বছরে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

বড় বাজারের চালের পাইকারি মোকামগুলোতে দেশের বিভিন্ন জেলা যেমন—কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, টাঙ্গাইল, রংপুর ও রাজশাহী থেকে চাল আসে। ওয়েস্ট মেকট রোডের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে অবস্থিত চালের পাইকারি মোকামগুলোর সংখ্যা বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০টি। এখান থেকেই পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাইকারি বাজারগুলোতে চাল সরবরাহ করা হয়। দিনাজপুর চাল ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী মো. ফারুক শেখ জানান, বর্তমানে চিকন চাল ও আটাশ (২৮) চালের চাহিদা ও বিক্রি সবচেয়ে বেশি। তবে এর পাশাপাশি অন্যান্য জাতের চালও প্রচুর পরিমাণে বিক্রি হয়। এই অঞ্চলের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীরা মূলত এখান থেকেই চাল সংগ্রহ করেন।

ওয়েস্ট মেকট রোড পেরিয়ে ভৈরব স্ট্র্যান্ড রোডের দিকে এগোলে চোখে পড়ে কাঁচা মসলার পাইকারি আড়তগুলো। স্থানীয়ভাবে ‘কাঁচাপট্টি’ নামে পরিচিত এই পাইকারি দোকানগুলোর প্রধান পণ্য হলো পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, হলুদ, আদা এবং অন্যান্য মসলা। ঠিক পাশেই অবস্থিত মসলাপট্টির খুচরা দোকানগুলোতে প্রক্রিয়াজাত বা গুঁড়া মসলা বিক্রি হয়। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কাঁচাপট্টিতে ব্যবসা করছেন মেসার্স নিউ মেহেদী বাণিজ্য ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী শেখ মো. আবুল হাসান। তিনি বলেন, ‘এখানে পাইকারি কাঁচা মসলার শতাধিক দোকান রয়েছে। আমরা কাঁচা মসলার পাশাপাশি মৌসুমে পাইকারি ফলের ব্যবসা করি। বিভিন্ন জায়গা থেকে এখানে পণ্য আসে। এরপর এখান থেকেই খুলনাসহ আশপাশের জেলাগুলোতে সরবরাহ হয়।’

চাল ও মসলার পাশাপাশি এখানে ফলমূল, প্রসাধনী, কাপড়, প্লাস্টিক সামগ্রী, সবজি ও অলংকারের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কেসিসির ট্রেড লাইসেন্স শাখার সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট শেখ হুমায়ুন কবীর জানান, এই বাজারে ট্রেড লাইসেন্সপ্রাপ্ত ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩ হাজার ৬৫০টি। এছাড়া দৈনিক টোলের ভিত্তিতে অনুমোদিত দোকানের সংখ্যা ৪৬০ থেকে ৪৭০টি। এর পাশাপাশি প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি ভাসমান দোকান ও হকার এখানে ব্যবসা করেন। সব মিলিয়ে পাঁচ হাজারের বেশি ব্যবসায়ী এই বাজারের সাথে জড়িত। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আয় হয় ছয় কোটি টাকার বেশি। কেসিসির বাজার সুপারিনটেনডেন্ট শেখ শফিকুল হাসান দিদার জানান, দৈনিক টোলের ভিত্তিতে পরিচালিত অস্থায়ী দোকানগুলো থেকে বছরে গড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার রাজস্ব আদায় করা হয়।

এই বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কথা মাথায় রেখে এখানে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা। ব্র্যাক ব্যাংকের বড় বাজার শাখার ব্যবস্থাপক এস এম আশরাফুল ইসলাম জানান, এই বাজার এলাকা ঘিরে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের মোট ৩৩টি শাখা রয়েছে। শুধু ব্র্যাক ব্যাংকই বাজারের ৭৭৪টি প্রতিষ্ঠানকে বছরে গড়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ঋণ প্রদান করছে।

তবে ভৈরব নদের ভাঙন এবং উন্নয়নের প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণের ফলে বাজারের আয়তন ও প্রসারে কিছুটা সংকুচিত হয়ে এসেছে। তবে পণ্যের ক্ষেত্রে এসেছে নতুন বৈচিত্র্য। এক সময় এখানে শুধু পাইকারি ব্যবসার আধিপত্য থাকলেও বর্তমানে খুচরা দোকানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্যবসায়ীদের মতে, ২০ বছর আগেও এই অঞ্চলের ভোগ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ সরবরাহ হতো এই বাজার থেকে। তবে এখন ব্যবসার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে। মেসার্স মুনীর আহমেদ অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী ও ব্যবসায়ী নেতা মুনীর আহমেদ বলেন, বড় বাজারের দোকানপাট বাড়লেও বাজারের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি। রাস্তাগুলো এতই সরু যে কোনো মালবাহী ভারী যানবাহন সহজে ঢুকতে পারে না। চালের বস্তার মতো ভারী পণ্য বাজারের বাইরে থেকে কুলির মাধ্যমে দোকানে আনতে হয়। এমন নানা সমস্যায় বাড়তি ব্যয়ের কারণে অনেক ব্যবসায়ী অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।

পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভোগ্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণকারী ঐতিহ্যবাহী বড় বাজার এখনো একটি বৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্র। তবে আধুনিক ব্যবসার ধরন, পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং অবকাঠামোগত সংকটের কারণে বাজারটির পুরোনো প্রভাব ও প্রতাপ অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছে। তা সত্ত্বেও হাজার হাজার ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কুলি ও আড়তদারের দৈনন্দিন জীবিকা এখনো এই বাজারের ওপরই নির্ভরশীল।