খুলনা নগরীর লবণচড়া এলাকায় বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যক্রমে বাধা প্রদান, গাছ কেটে ক্ষতিগ্রস্ত করা, সাইনবোর্ড ভাঙচুর এবং ভয়ভীতি দেখানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে শ্রমিকদল নেতাসহ কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে। পরিবেশকর্মী সাবিহা আক্তার রেশমীর দাবি, ওই জায়গাটি দখল করে সেখানে ইট-বালির ব্যবসা এবং দোকানপাটসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি থানায় একটি লিখিত আবেদন জানিয়েছেন।
সাবিহা আক্তার রেশমী হলেন হেলো পিপলস সমাজকল্যাণ যুব সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। তার করা আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২১ সাল থেকে লবণচড়া এলাকার ক্ষেত্রখালী খালপাড়ে দারোগার লিজসংলগ্ন স্থান এবং নেহালউদ্দিন সড়কের পাশে তার সংগঠনের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ, পুষ্টিবাগান ও নার্সারি কার্যক্রম চালানো হয়ে আসছে। এখন পর্যন্ত সেখানে দুই শতাধিক গাছ লাগানো হয়েছে, যার মধ্যে শতাধিক গাছ বর্তমানে টিকে আছে। এই বৃক্ষগুলোর মধ্যে আম, বাদাম, কাঁঠাল, সুপারি, অর্জুন ও হরতকীসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ অন্তর্ভুক্ত। এর পাশাপাশি লালশাক, পুঁইশাক, বেগুন, শিম, লাউশাক, কাঁচামরিচ, পেঁপে ও কলাসহ বিভিন্ন শাকসবজি ও ফলের গাছ লাগিয়ে একটি পুষ্টিবাগান ও নার্সারি গড়ে তোলা হয়েছিল।
রেশমীর দাবি, খুলনা সিটি করপোরেশনের অনুমতি ও সম্মতি নিয়েই সেখানে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল এবং স্থানীয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও এ বিষয়ে অবগত ছিলেন। তবে দীর্ঘ সময় ধরে তাদের এই পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমে বাধা দেওয়া, ভয়ভীতি দেখানো ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তিনি। আবেদনে আরও বলা হয়েছে, সম্প্রতি কিছু গাছ কেটে বা ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি সংগঠনটির সাইনবোর্ডও ভাঙচুর করা হয়েছে।
আবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী ওই জায়গাটি দখল করে ইট-বালির ব্যবসা, দোকানপাট কিংবা মার্কেটসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা করছে। এই ঘটনায় ৩১ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিকদলের সভাপতি বালি জাহাঙ্গীর, চায়ের দোকানদার সেলিম, খলিল ও ইসমাইলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে রেশমী অনুরোধ জানিয়েছেন, নিরপেক্ষ তদন্তের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে দায়ীদের শনাক্ত করা হোক।
রেশমী আরও জানান, সম্প্রতি তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে খুলনা ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন ছিলেন, যার ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ নিতে তার কিছুটা দেরি হয়েছে।
এই অভিযোগের বিষয়ে মহানগর শ্রমিকদলের সদস্যসচিব শফিকুল ইসলাম শফিঁ বলেন, “শ্রমিকদলের কেউ অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। গাছ কাটার মতো কাজে কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, অভিযোগ অস্বীকার করে ৩১ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিকদলের সভাপতি জাহাঙ্গীর বলেন, “ওরা বিভিন্ন সরকারি জায়গায় গাছ লাগিয়ে থাকে। প্রায় এক বছর আগে সেখানে গাছ লাগানো হয়েছিল। আমি কেন সেই গাছ কাটতে যাব? পূর্বশত্রুতার জের ধরে আমার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।”
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) খুলনা জেলার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, “রেশমীর উদ্যোগ পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানবিক সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে প্রশংসনীয়। শিশুর জন্ম উপলক্ষে গাছের চারা রোপণ বা উপহার দেওয়া, বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো এবং সবজি উৎপাদনের এ উদ্যোগ অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “সামান্য ব্যবসায়িক লাভের আশায় রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এমন উদ্যোগ নষ্ট করা এবং প্রতিবাদ করায় রেশমীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ দুঃখজনক। সরকারি জমি দখলের চেষ্টা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে রাজনৈতিক দলের নেতাদেরও এগিয়ে আসা উচিত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত রেশমী ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে সুষ্ঠু সমাধান না করলে পরিবেশবাদীরা নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাবেন।”
খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “আমরা ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা গাছ লাগিয়েছি, সাধারণ মানুষও গাছ লাগিয়েছেন। সেই গাছ যেই কাটুক না কেন, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
লবণচড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মোশারেফ হোসেন জানান, তারা অভিযোগটি পেয়েছেন এবং বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।