মশার লার্ভা নিধনের জন্য কেনা ওষুধের মান যাচাই পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফলাফল না আসায় দুই হাজার লিটার ওষুধের কার্যাদেশ বাতিল করেছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। একই সাথে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে এই ওষুধ দ্রুত ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, এই ওষুধ সংগ্রহের পেছনে ব্যয় করা হয়েছিল প্রায় ৫৬ লাখ টাকা।

আজ মঙ্গলবার কেসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান স্বাক্ষরিত একটি চিঠির মাধ্যমে ঢাকার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স এম আর এন্টারপ্রাইজকে এই নির্দেশনা প্রদান করা হয়।

সংগৃহীত দুই হাজার লিটার লার্ভিসাইড পরীক্ষায় মান উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে দ্রুত নতুন ওষুধ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিটি করপোরেশন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন কেনা ওষুধের মানও যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হবে।

এদিকে, এম আর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. মাহবুবুর রহমান গাজী মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “কার্যাদেশ বাতিলের কোনো চিঠি এখনো আমরা পাইনি। তবে তাঁদের পরীক্ষার পদ্ধতিই ঠিক ছিল না। তাঁরা তাঁদের মতো করে পরীক্ষা করেছেন। আমরা আবেদন করেছিলাম। তাঁরা বলেছিলেন, পুনরায় পরীক্ষা করবেন। বিষয়টি হলো, চিকিৎসক রোগীকে ওষুধ দিয়ে খাওয়ার নিয়ম বলে দিলেন। রোগী যদি নিজের মতো করে ওষুধ খেয়ে বলেন, এটি কার্যকর নয়, তাহলে তো হবে না।”

কেসিসির প্রেরিত চিঠিতে বিস্তারিত জানানো হয়েছে যে, এম আর এন্টারপ্রাইজ গত ৮ সেপ্টেম্বর দুই হাজার লিটার লার্ভিসাইড (ক্লোরপাইরিফস ২০ ইসি) সরবরাহ করেছিল। পরবর্তীতে ১২ সেপ্টেম্বর কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত একটি কমিটি ওই ওষুধের নমুনা সংগ্রহ করে মান যাচাই কার্যক্রম পরিচালনা করে। পরীক্ষায় দেখা যায়, ওষুধ প্রয়োগের ২৪ ঘণ্টা elapsed হওয়ার পর লার্ভার মৃত্যুর হার ছিল মাত্র ১২ শতাংশ। এই ফলাফল সন্তোষজনক নয় বলে বিবেচনা করে কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে। কমিটির সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই ওষুধের কার্যাদেশ বাতিল এবং ওষুধ ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কেসিসি সূত্রে জানা গেছে, মশার লার্ভা ও উড়ন্ত মশা নিধনের লক্ষ্যে সম্প্রতি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে দুই হাজার লিটার লার্ভিসাইড এবং ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে তিন হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইড (উড়ন্ত মশার জন্য) কেনা হয়েছিল। এর মধ্যে লার্ভিসাইডের কার্যকারিতা পরীক্ষায় ব্যর্থতা ধরা পড়ে।

মান পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া ওষুধের বিকল্প হিসেবে নতুন করে লার্ভিসাইড সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেসিসি। মঙ্গলবার নগর ভবনের শহীদ আলতাফ মিলনায়তনে সিটি করপোরেশনের পরিচালনা কমিটির এক সভায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড থেকে আপাতত এক হাজার লিটার ওষুধ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ডিপিএম (ডিরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড) পদ্ধতিতে এই ওষুধ কেনা হবে এবং আগামী সপ্তাহের মধ্যে তা সরবরাহের কথা রয়েছে।

কেসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান জানান, সাধারণত লার্ভা নিধনের ওষুধের প্রতি লিটারের দাম প্রায় ২ হাজার ৮০০ টাকা। তবে নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড থেকে যে নতুন ওষুধ কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে, তাতে প্রতি লিটারে খরচ পড়বে প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা। তিনি আরও বলেন, “আগের কেনা দুই হাজার লিটার লার্ভিসাইড পরীক্ষায় মান উত্তীর্ণ হয়নি। তবে বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত নতুন ওষুধ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেটারও মান পরীক্ষা করা হবে।”

উক্ত সভায় ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধ এবং নগরের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে আরও বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে ইউনিপোল, বিলবোর্ড, প্যানা ও ফেস্টুনের মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হবে। এছাড়া পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা এখন থেকে দৈনিক দুই শিফটে চার ঘণ্টা করে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

অন্যদিকে, উড়ন্ত মশা নিধনে ব্যবহৃত নতুন ওষুধ ‘সাইপারমেথ্রিন’-এর কার্যকারিতা যাচাই করতে পরীক্ষা চালিয়েছে কেসিসি। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে তিনটার দিকে নগরের কেসিসি গ্যারেজে কীটতত্ত্ববিদ, কীটনাশক বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক এবং নাগরিক নেতাদের উপস্থিতিতে এই পরীক্ষা সম্পন্ন হয়। পুরো কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে সেখানে যান কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু।

এর আগে গত শনিবার নতুন ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কীটতত্ত্ববিদ, কীটনাশক বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক নেতাদের অনুপস্থিতির কারণে সেদিন পরীক্ষাটি করা সম্ভব হয়নি। পরীক্ষা শেষে নজরুল ইসলাম মঞ্জু জানান, মশারি টানিয়ে তার ভেতরে মশা রেখে ফগার মেশিনের মাধ্যমে ওষুধ ছিটিয়ে কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টা মশার ওপর ওষুধের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং এরপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ওষুধটি কার্যকর প্রমাণিত হলে তা ব্যবহার করা হবে, অন্যথায় বিকল্প ওষুধের কথা ভাবা হবে।

কেসিসি প্রশাসক আরও বলেন, খুলনায় ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রী তিন মাস সময় দিয়েছেন। এরই মধ্যে এক মাস পার হয়েছে। আগামী দুই মাস সিটি করপোরেশনের কর্মসূচি চলবে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি প্রায় দুই কোটি টাকা আর্থিক সহযোগিতা করেছেন। নগরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম চালানো হবে।