খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) ট্রেড লাইসেন্স শাখায় দীর্ঘ সময় ধরে চলা আর্থিক অনিয়ম ও নথিপত্র গায়েব করার ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ৩৪ লাখ ২১ হাজার ১১৫ টাকা আত্মসাৎ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের ১১টি লাইসেন্স বই নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগে পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুদকের খুলনা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে এই মামলা দুটি দায়ের করা হয়। দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. আশিকুর রহমান বাদী হয়ে এই আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেন।
প্রথম মামলার বিবরণ অনুযায়ী, কেসিসির লাইসেন্স পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান (৪৩), সিনিয়র লাইসেন্স কর্মকর্তা ফারুক হোসেন তালুকদার (৫৫) এবং হিসাব বিভাগের ক্যাশিয়ার সঞ্জীব কুমার সাহার (৩৯) বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদকের এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেসিসির ট্রেড লাইসেন্স শাখায় আদায় করা ৩৪ লাখ ২১ হাজার ১১৫ টাকা আত্মসাতের সরাসরি অভিযোগ রয়েছে লাইসেন্স পরিদর্শক হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে। তবে কেসিসি কর্তৃপক্ষের নিজস্ব নিরীক্ষা ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় এই অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি সামনে আসার পর, অভিযুক্ত ব্যক্তি ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ওই টাকা ফেরত দিয়েছেন বলে এজাহারে জানানো হয়েছে।
মামলার এজাহারে আরও বলা হয়েছে, সিনিয়র লাইসেন্স কর্মকর্তা হিসেবে ফারুক হোসেন তালুকদার তার অধীনস্থ লাইসেন্স পরিদর্শকদের কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারকি করেননি, যা চরম দায়িত্ব অবহেলার শামিল। অন্যদিকে, ক্যাশিয়ার সঞ্জীব কুমার সাহার বিরুদ্ধে অভিযোগ যে, তিনি রাজস্বের টাকা জমা নেওয়ার সময় সঠিক হিসাব সংরক্ষণ করেননি এবং অন্যদের সঙ্গে যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতের কাজ করেছেন। জানা গেছে, ফারুক হোসেন বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় রয়েছেন।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় মামলায় আসামি করা হয়েছে চার লাইসেন্স পরিদর্শক—হাবিবুর রহমান, মনিরুল ইসলাম (৫৯), শেখ শাহেদ হাসান (৪০) ও কাজী মনজুর-উল-আলমকে (৪২)। এই মামলায় সিনিয়র লাইসেন্স কর্মকর্তা ফারুক হোসেন তালুকদারকেও আসামি করা হয়েছে।
দুদকের এজাহার অনুযায়ী, কেসিসির ট্রেড লাইসেন্স শাখার ২০১৬-১৭ অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের ১১টি লাইসেন্স বই রহস্যজনকভাবে গায়েব করা হয়েছে। অপরাধের প্রমাণ ও আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে বইগুলো সরিয়ে ফেলার অভিযোগ আনা হয়েছে চার লাইসেন্স পরিদর্শকের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি, অধীনস্থ কর্মকর্তাদের তদারকিতে ব্যর্থ হয়ে দায়িত্বে অবহেলা এবং তাদের সহায়তায় যোগসাজশের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে ফারুক হোসেন তালুকদারের বিরুদ্ধে। বর্তমানে মনিরুল ইসলাম ও কাজী মনজুর-উল-আলম কেসিসির কনজারভেন্সি সুপারভাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আইনি ধারার বিষয়ে দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, প্রথম মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪০১ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৮৯-এর ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। দ্বিতীয় মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৯, ২০১ ও ১০৯ ধারা এবং একই আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
কেসিসির রাজস্ব আদায়, হিসাব সংরক্ষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি ব্যবস্থাপনায় এই ধরনের গুরুতর অনিয়মের ঘটনা সংস্থাটির আর্থিক জবাবদিহি ও প্রশাসনিক তদারকির সক্ষমতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।