স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের আইটি বিভাগে তথাকথিত ভুয়া কেনাকাটার আশ্রয় নিয়ে ৬ কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাতের এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এসেছে। তিনটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে এই অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আত্মসাৎ করা মোট অর্থের পরিমাণ ৬ কোটি ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫০ টাকা। ব্যাংকের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ তদন্তে এই বিশাল অঙ্কের অনিয়ম ধরা পড়লেও এখন পর্যন্ত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
কাগজে-কলমে ২০২২ সালে আধুনিক প্রযুক্তির সফটওয়্যার ও ডেটাবেজ কেনা হয়েছে বলে দেখানো হয়। সেই অনুযায়ী কার্যাদেশ প্রদান, বিল প্রস্তুত এবং পেমেন্ট সম্পন্ন করা হয়। এমনকি পরবর্তীতে রক্ষণাবেক্ষণ বা এএমসি বাবদও অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। তবে বাস্তবে এসব সেবা বা পণ্যের কোনো অস্তিত্ব নেই বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৫ সালের মে মাসে প্রস্তুত করা প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা ছিল না, তাদের হাতেই কাজ দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে টেন্ডারের শর্তাবলি উপেক্ষা করে কার্যাদেশ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এমনকি পণ্য বা সেবা সরবরাহের আগেই বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়।
এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির সুপারিশ করে প্রতিবেদনটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে প্রতিবেদনটি মুক্তকণ্ঠের হাতে পৌঁছায়।
ঘটনার সূত্রপাত ওরাকল ডেটাবেজ ১৯সি সংগ্রহ নিয়ে। ১২টি সিপিইউ লাইসেন্সসহ ওরাকল ডেটাবেজ ১৯সি সংগ্রহ, ইনস্টলেশন ও কনফিগারেশনের উদ্যোগ নেওয়া হলে ইআরএ ইনফো টেক লিমিটেডকে নির্বাচন করা হয়। প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে একাধিক গুরুতর অনিয়মের তথ্য তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ব্যাংকের আইসিসি ডিভিশনের অডিট দল নিয়মিত নিরীক্ষায় লক্ষ্য করে, ১২টি সিপিইউ লাইসেন্স কেনা হলেও চারটি ডেটাবেজ সার্ভার তখনও ১৯সি-র পরিবর্তে পুরনো ওরাকল ডেটাবেজ ১১জির অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। এই অসংগতি ধরা পড়ার পর ২০২৫ সালের ১২ মে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আইটি বিভাগের তৎকালীন প্রধান ও সিআইটিও সুফি তোফায়েল আহমেদের অনিয়মের আলামত কমিটির কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তদন্ত প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, “সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাজটির জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তাদের কাজ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।”
২০২২ সালের ১২ এপ্রিল তিন সদস্যের টেকনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট কমিটি ইআরএ ইনফো টেক লিমিটেডকে কাজ দেওয়ার সুপারিশ করে। ওই কমিটির সদস্য ছিলেন সুফি তোফায়েল আহমেদ, মহি উদ্দিন ও শেখ শরিফুল ইসলাম। তবে দেখা গেছে, ডেটাবেজ ইনস্টলেশন ও কনফিগারেশন বিষয়ে মূল্যায়নকারী কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় পেশাগত ডিগ্রি ছিল না। কারিগরি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছিল, তারও কোনো স্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায়নি। দরপত্রে অংশ নেওয়া অন্য চারটি প্রতিষ্ঠান ২১ থেকে ২১ দশমিক ৫০ নম্বর পেলেও ইআরএ ইনফো টেক লিমিটেড ২৭ দশমিক ২৫ নম্বর পায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে অতি মূল্যায়ন করা হয়েছে।
২০২২ সালের ২০ এপ্রিল ক্রয় কমিটির এক সভায় টেকনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট কমিটির মূল্যায়নের ভিত্তিতে ইআরএ ইনফো টেক লিমিটেডকে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর ৫ মে প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ক্রয় কমিটির সদস্য ছিলেন রফিকুল ইসলাম, সুফি তোফায়েল আহমেদ, আলী রেজা ও মেজর (অব.) মো. সাইফুল ইসলাম। তবে আলী রেজা সভায় অনুপস্থিত ছিলেন এবং তার পরিবর্তে মাকসুদুর রহমানকে পাঠান। কার্যাদেশে স্বাক্ষর করেন রফিকুল ইসলাম, সুফি তোফায়েল আহমেদ ও মেজর (অব.) মো. সাইফুল ইসলাম।
তদন্তে দেখা গেছে, ওই কার্যাদেশে টেন্ডার শিডিউলের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বাদ দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে জরিমানা সংক্রান্ত ধারাটিও ছিল। অডিটে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর ফলে ব্যাংকের স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কার্যাদেশে ১৯সি লাইসেন্স ও বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ (এএমসি) চুক্তির কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
বিল পরিশোধের প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত রহস্যজনক। সম্পূর্ণ বিল দাখিল না করে শুধুমাত্র ইনভয়েস পাওয়ার পর ২০২২ সালের ২৭ জুন ৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা ইআরএ ইনফো টেক লিমিটেডকে দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে সাধারণ সেবা বিভাগের পরিবর্তে আইটি বিভাগ থেকেই অফিস নোট ইস্যু করা হয়েছিল। তদন্ত দলের কাছে এটি ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। অর্থাৎ, যে বিভাগ প্রযুক্তিগত প্রয়োজন নির্ধারণ করেছে, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছে এবং কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল, অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়াটিও তাদের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে।
কার্যাদেশের শর্ত অনুযায়ী, ওরাকল ডেটাবেজের সরবরাহ, ইনস্টলেশন ও কনফিগারেশনের পর পেমেন্ট করার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে কোনো ইনস্টলেশন বা কনফিগারেশন ছাড়াই বিল পরিশোধ করা হয়। ২০২২ সালের ৬ জুলাই ইআরএ ইনফো টেক লিমিটেডের হিসাব থেকে চেকের মাধ্যমে নগদ অর্থ তোলা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে এই কথিত ‘ফিকটিশাস পারচেজ’-এর সঙ্গে তিনটি প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে। ইআরএ ইনফো টেক লিমিটেডের নামে ওরাকল ডেটাবেজ ১৯সি সরবরাহ, ইনস্টলেশন, কনফিগারেশন ও এএমসি বাবদ ৫ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেডের নামে ওরাকল ডেটাবেজ ১৯সি-এর এএমসি-সংক্রান্ত সেবা বাবদ ৯৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। আর করপোরেট প্রযুক্তি লিমিটেডের নামে মাইক্রোসফট ৩৬৫ এফথ্রি ও মাইক্রোসফট ৩৬৫ অ্যাপস বাবদ ৪৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে মোট ৬ কোটি ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫০ টাকা বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের হিসাব থেকে অসাধু পদ্ধতিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। ব্যাংকের পুরনো ওরাকল ডেটাবেজ ১১জি থেকে ১৯সি-তে মাইগ্রেশন করার কথা থাকলেও তদন্তে দেখা গেছে, বাস্তবে কোনো মাইগ্রেশন হয়নি। একই ডেটাবেজের এএমসি বাবদ অর্থ পরিশোধ নিয়ে নিরীক্ষকরা প্রশ্ন তুলেছেন।
স্মার্ট টেকনোলজিসের সঙ্গে পরবর্তীতে নতুন করে এএমসি চুক্তি করা হয়। ২০২৪ সালের ১৯ মে তিন বছরের জন্য এই চুক্তি হয় এবং এক বছরের এএমসি বাবদ ৭৮ হাজার ডলার বা ৯৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। অন্যদিকে, মাইক্রোসফট ৩৬৫ নিয়ে আইটি বিভাগের এক চিঠিতে স্বীকার করা হয়েছে যে, ব্যাংকের কোনো কম্পিউটারে এই সফটওয়্যার ইনস্টল করা হয়নি।
সুফি তোফায়েল আহমেদ, মো. মোহন মিয়া ও মেজর (অব.) আহমেদ মোস্তফা সাইরাস কারচুপির মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই স্মার্ট টেকনোলজিসের সঙ্গে এই নতুন চুক্তি করেন। মাইক্রোসফট ৩৬৫ বাবদ অর্থ পরিশোধ করা হয় ২০২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বরের পেমেন্ট অর্ডারের (নম্বর ২৯৩৩১২৫) মাধ্যমে। পরিচালনা পর্ষদকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে মাইক্রোসফট ৩৬৫ এফথ্রি ও অ্যাপস না কিনেই অর্থ উত্তোলন করা হয়। এই কাজে সহযোগিতা করেন সুফি তোফায়েল আহমেদ, রফিকুল ইসলাম, মো. ওয়াহিদ জামান ও মাকসুদুর রহমান।
তদন্তে সুফি তোফায়েল আহমেদ, আলী রেজা, মো. মোহন মিয়া, মাকসুদুর রহমান, জয়নুল আবেদীন, মেজর (অব.) মো. সাইফুল ইসলাম, মেজর (অব.) আহমেদ মোস্তফা সাইরাস, রফিকুল ইসলাম ও তৌহিদুল ইসলাম খানের নাম উঠে এসেছে। সুপারিশে বলা হয়েছে, এসব কর্মকর্তার ভূমিকা খতিয়ে দেখলে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইআরএ ইনফো টেক, স্মার্ট টেকনোলজিস ও করপোরেট প্রযুক্তি লিমিটেডের সঙ্গে অবৈধ প্রক্রিয়ায় ৬ কোটি ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫০ টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। এক্ষেত্রে আইটি বিভাগের সংবেদনশীল ও কারিগরি ব্যবস্থার সুযোগ নেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় ইআরএ ইনফো টেকের মার্কেটিং বিভাগের কর্মকর্তা রেজাউর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সফটওয়্যার আপডেটের জন্য কিছু কাজ করা হয়েছে। সেখানে কোনো অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ সত্য নয়। তাদের সঙ্গে আমাদের চুক্তি অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্র সাবমিট করে কাজ করা হয়েছে।’
ব্যাংকের আইটি বিভাগের সাবেক প্রধান সুফি তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মোবাইলে বা হোয়াটসঅ্যাপে তাকে পাওয়া যায়নি।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে ইস্টার্ন ব্যাংকের হেড অব কোর ব্যাংকিং সিস্টেম মহিউদ্দিন আহমেদ কোনো তথ্য দিতে পারেননি। তিনি জানান, তিনি সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির সদস্য ছিলেন না, ফলে এ বিষয়ে তার কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।