খুলনা নগরীর সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক ১৮টি পুকুর সংরক্ষণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনের লক্ষ্যে ২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি)। এই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ৯টি পুকুরে উন্নয়নকাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব পুকুরে খনন কাজ, পানি পরিবর্তন, হাঁটার পথ বা ওয়াকওয়ে, ঘাট, রিটেইনিং ওয়াল (ধারণকারী দেয়াল), বসার স্থান এবং শৌচাগার নির্মাণ করা হবে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে যে, পুকুরের গভীরতা বৃদ্ধি ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোর চেয়ে সৌন্দর্যবর্ধনমূলক অবকাঠামো নির্মাণকেই কি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রথম পর্যায়ে যে ৯টি পুকুরে কাজ শুরু হবে, সেগুলো হলো— সরকারি বিএল কলেজ পুকুর, হরাইজন কলোনি পুকুর, লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ পুকুর, মিউনিসিপ্যাল ট্যাংক রোড পুকুর, তালিমুল মিল্লাত রহমতিয়া ফাজিল মাদরাসা পুকুর, তালতলা হাসপাতাল পুকুর, ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক পুকুর, ১৬ নম্বর ওয়ার্ড অফিস পুকুর এবং মহাশ ট্যাংক পুকুর।
কেসিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ‘খুলনা শহর এলাকার উন্নয়ন (ফেজ-২)’ প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে ২৩টি পুকুর উন্নয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে প্রাক্কলিত ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রথম ধাপে ২৩টির পরিবর্তে ৯টি পুকুরের কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ডিপিপি সংশোধনের পর পর্যায়ক্রমে বাকি পুকুরগুলোর উন্নয়নকাজ সম্পন্ন করা হবে।
এর আগে নগরীর ১৮টি সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক পুকুর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল কেসিসি। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে কেসিসির প্রকল্প পরিচালক ও প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আবির উল জব্বার জানিয়েছিলেন, পুকুরগুলোর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের নকশা প্রণয়নের কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে।
পানি ধারণক্ষমতা নাকি সৌন্দর্যবর্ধন
এই প্রকল্পের বিষয়ে তালিমুল মিল্লাত রহমতিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা নাজমুস সউদ বলেন, “পুকুরটির বর্তমান অবস্থা ভালো এবং পানিও সুন্দর। মাদরাসার মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, পুকুরটি বিদ্যমান অবস্থায় থাকবে। দীর্ঘমেয়াদে ক্যাম্পাসের পুকুর ও খেলার মাঠ অক্ষুণ্ণ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও জানান, কেসিসিকে তাদের নির্দিষ্ট শর্ত অনুযায়ী কাজ করার জন্য অনাপত্তিপত্র (এনওসি) প্রদান করা হয়েছে।
সরকারি বিএল কলেজের শিক্ষার্থী হযরত আলী বলেন, “পুকুরটি বর্তমানে মূলত শিক্ষার্থীদের গোসল এবং মসজিদের মুসল্লিদের অজুর কাজে ব্যবহৃত হয়।” সংস্কারের পর পুকুরটির পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তার মতে, উন্নত ঘাট, অজু ও গোসলের জন্য পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা এবং পুকুরের পাড় সংস্কার করা হলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারী ও মুসল্লিরা উপকৃত হবেন। তবে সৌন্দর্যবর্ধনের চেয়ে পুকুরের পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোকে তিনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তার ভাষ্য, এতে বেশি পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং পুকুরটি দীর্ঘমেয়াদে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে।
অন্যদিকে, ট্যাংক রোড পুকুরপাড়ের বাসিন্দা কামাল হোসেন জানান, পুকুরের পানি বর্তমানে স্বচ্ছ নয়। পানি পরিষ্কার করা প্রয়োজন, যাতে শিশুরা নিরাপদ পরিবেশে সাঁতার শিখতে পারে। খুলনায় সাঁতার প্রতিযোগিতার জন্য আলাদা সুইমিং পুল নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুকুরগুলোতে সাঁতার শেখার উপযুক্ত ব্যবস্থা করা গেলে শিশুরা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও অবদান রাখতে পারবে। পাশাপাশি পুকুরগুলোর কিছু আধুনিকায়ন করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
প্রকল্পের আওতায় পুকুর খনন ও পানি পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রতিটি পুকুরের পাশে শৌচাগার, ঘাটলা এবং সৌন্দর্যবর্ধনমূলক বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পুকুরগুলোর বর্তমান গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা কত এবং সংস্কারের পর তা কতটা বাড়বে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্যের প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেসিসির প্রকল্প পরিচালক আবির উল জব্বার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “১৮টি পুকুরের জন্য মোট প্রকল্প ব্যয় ২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় সৌন্দর্যবর্ধন, খনন, পানি পরিবর্তন এবং প্রতিটি পুকুরের পাশে শৌচাগার ও ঘাটলা নির্মাণ করা হবে। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে রক্ষণাবেক্ষণ কমিটিও গঠন করা হয়েছে।”
বিলীন ৮০ জলাশয়, ঝুঁকিতে পরিবেশ
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) ২০২৫ সালের এক জরিপ অনুযায়ী, নগরের ৩১টি ওয়ার্ডে ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) মানচিত্রে চিহ্নিত ২৯৮টি জলাশয়ের মধ্যে ৮০টির অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়া আরও ২৭টি জলাশয় আংশিক ভরাট করা হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. সালাউদ্দীন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ১৮টি পুকুর সংস্কার করা হলে নগরের জলাবদ্ধতা কমাতে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা যাবে। পুকুরগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করতে পারে। তিনি আরও বলেন, খুলনা নগরে প্রতিবছর তাপমাত্রা বাড়ছে কিংবা অতিরিক্ত তাপমাত্রা অনুভূত হচ্ছে। পুকুরগুলো সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব।
কংক্রিটের ব্যবহারে সুফল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা
তবে পুকুর সংস্কারের সময় পাড়ে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেছেন এই বিশেষজ্ঞ। তার মতে, পুকুরের পাড় ও আশপাশের সৌন্দর্যবর্ধনের নামে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহার এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ, পুকুরে পানি সংরক্ষণ করে জলাবদ্ধতা কমানো ও তাপমাত্রার প্রভাব প্রশমনের যে সুফল পাওয়ার আশা করা হচ্ছে, চারপাশে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহার করলে তা ব্যাহত হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, কংক্রিটের পরিবর্তে ছিদ্রযুক্ত বা পানি চুইয়ে মাটিতে প্রবেশ করতে পারে—এমন ব্যবস্থা না রাখলে অতিরিক্ত কংক্রিট ব্যবহারের কারণে তাপমাত্রা কমানোর সুফলও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। অধ্যাপক সালাউদ্দীনের মতে, উন্মুক্ত স্থান, পার্ক ও নগরের জলাধার বা ‘ব্লু-স্কেপ’ সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এসব স্থানে অতিরিক্ত কংক্রিটের ব্যবহার এড়ানোর বিষয়েও সচেতন থাকতে হবে।
প্রকল্পের প্রকৃত অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন
কেসিসির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, প্রকল্পটির উদ্দেশ্য শুধু সৌন্দর্যবর্ধন নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, নগরের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণেও এসব পুকুরকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কেসিসির আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও সরকারি পুকুর পুনঃসংস্কারের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে ভূমিকা রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেও কেসিসির এক প্রকল্প অবহিতকরণ সভায় নগরের পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে। ২৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকার মধ্যে পুকুর খনন, গভীরতা বৃদ্ধি ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়াতে কত টাকা ব্যয় হবে এবং হাঁটার পথ, ঘাট, ধারণকারী দেয়াল ও শৌচাগারসহ সৌন্দর্যবর্ধনমূলক অবকাঠামো নির্মাণে কত টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে? ব্যয়ের খাতভিত্তিক হিসাব প্রকাশ করা হলে পুকুর সংরক্ষণে প্রকল্পটির প্রকৃত অগ্রাধিকার আরও স্পষ্ট হবে।