উপকূলীয় অঞ্চলের সুপেয় পানির তীব্র সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিদ্যমান পানির উৎসগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে সুন্দরবনের ভারসাম্য রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং বন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আরও সুস্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে।
‘উপকূলে পানির সংকট ও সুন্দরবনের প্রতিবেশ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব গুরুত্বপূর্ণ দাবি ও প্রস্তাবনা উঠে এসেছে। গতকাল রোববার সকালে মোংলা উপজেলার ফ্রেন্ডশিপ রিজিওনাল অফিস মিলনায়তনে মুক্তকণ্ঠের উদ্যোগে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, স্থানীয় বাসিন্দা, গবেষক, সরকারি কর্মকর্তা, পরিবেশকর্মী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বনজীবী এবং উন্নয়নকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
আলোচনার মূল সুর ছিল উপকূলের পানির সংকট এবং সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সংকটের পারস্পরিক সম্পর্ক। বক্তারা একমত হন যে, এই দ্বিমুখী সংকট নিরসনে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের বদলে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মুক্তকণ্ঠের জলবায়ু প্রকল্প ব্যবস্থাপক খলিলউল্লাহর সঞ্চালনায় শুরু হওয়া এই সভায় প্রথমে পানি ও সুন্দরবনের বর্তমান সংকট নিয়ে একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করেন মুক্তকণ্ঠের সহকারী বার্তা সম্পাদক পার্থ শঙ্কর সাহা।
আলোচনায় সুন্দরবন একাডেমির চেয়ারপারসন অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের বৈশিষ্ট্য সব জায়গায় এক রকম নয়। কোথাও লবণাক্ততা বেশি, কোথাও আয়রন বা অন্য উপাদানের সমস্যা রয়েছে। ফলে সারা দেশের জন্য একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার না করে এ অঞ্চলের জন্য উপযোগী প্রযুক্তি নির্বাচন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবন রক্ষার দায়িত্ব কার, এর আসল অভিভাবক কে—এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে জাহাজ চলাচলের সময় তেল ছড়িয়ে পড়া, বর্জ্য ফেলা, শব্দ ও কৃত্রিম আলোর কারণে বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে থাকে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব সুস্পষ্ট করা এবং কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, সুন্দরবনের জন্য একটা একক মন্ত্রণালয় থাকা দরকার।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. কামরুজ্জামান বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষের অন্যতম বড় সমস্যা সুপেয় পানির সংকট। দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষ পানির জন্য সংগ্রাম করছেন। বিভিন্ন সময়ে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা পুকুরের পানি পরিশোধন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু অনেক জায়গায় এগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। ফলে একসময় এসব ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়ে। তাই শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, সেগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহার উপযোগী রাখার ব্যবস্থাও করতে হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, শুধু পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করলেই হবে না, পানি নিরাপদ কি না, সেটিও একটি জরুরি বিষয়। দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে স্থানীয় মানুষের সম্মিলিতভাবে দাবি তোলা প্রয়োজন, যাতে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা কার্যকর উদ্যোগ নিতে বাধ্য হয়। এ ছাড়া সুন্দরবনের ওপর মানুষের নির্ভরশীলতা কমাতে বিকল্প জীবিকার কথা বলা হয়। কিন্তু বিকল্প জীবিকা এমন হতে হবে, যা স্থানীয় পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নতুন চাপ তৈরি করবে না।
সুন্দরবনে পর্যটন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে মো. কামরুজ্জামান বলেন, সংরক্ষিত বন ঘোষণা করলেই যে বন সুরক্ষিত থাকবে, তা নয়। সুন্দরবনের ধারণক্ষমতা বিবেচনা না করে পর্যটন বা অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো ঠিক নয়।
মুক্তকণ্ঠের সম্পাদক মতিউর রহমান আলোচনায় বলেন, নাগরিক অধিকার, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমস্যা এবং দেশের প্রকৃতি, পরিবেশ, নদী ও বন রক্ষার বিষয়গুলো মুক্তকণ্ঠ গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করে। সুন্দরবন এসব কাজের একটি বিশেষ ক্ষেত্র।
মতিউর রহমান বলেন, সুন্দরবন বাংলাদেশের গর্ব। সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়, এটি উপকূলের মানুষের সুরক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি বলেন, ‘২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর সুন্দরবনের অনেক গাছপালা ভেঙে পড়েছিল। তখন সেগুলো পরিষ্কার করার একটি উদ্যোগের কথা শোনা যাচ্ছিল। আমরা এ বিষয়ে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছিলাম। সেখানে বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে হবে, অপ্রয়োজনে সেখানে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। আমরা তখন শিরোনাম করেছিলাম, সুন্দরবনকে কেউ বিরক্ত করবেন না। পরে সরকার ওই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার সময় সুন্দরবন উপকূলের মানুষকে বড় ধরনের সুরক্ষা দিয়েছে। আমরা চাই, সুন্দরবন ধ্বংস না হোক। এর জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাক। বনটি তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে টিকে থাকুক।’
উপকূলের নিরাপদ পানির সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, উপকূলের মানুষের পানির সংকট এবং পানিতে আর্সেনিক ও সিসার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে মানুষ পান করছে। কিন্তু সেই পানিও পরীক্ষা করে দূষিত উপাদান পাওয়া গেলে তা উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, ‘আমরা এখানে এসেছি সুন্দরবন সম্পর্কে আরও জানতে, আপনাদের কথা শুনতে এবং কীভাবে এই বনকে রক্ষা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করতে। স্থানীয় মানুষ, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সমাজকর্মী, বন বিভাগের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সবার অভিজ্ঞতা ও মতামত আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’
বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, উপকূলের সুপেয় পানির সংকট ও সুন্দরবনের পরিবেশ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। উপকূলের নারীরা অনেক কষ্ট করে দূর থেকে পানি সংগ্রহ করেন। এত কষ্টে আনা পানিও সব সময় নিরাপদ নয়। পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁদের শারীরিক সমস্যা ও স্যানিটেশন–সংক্রান্ত নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বন রক্ষা করা কঠিন কাজ। সুন্দরবন রক্ষার দায়িত্ব বন বিভাগের হলেও স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া এ দায়িত্ব পালন করা কঠিন। বনের আশপাশে কেউ বিষ দিয়ে মাছ ধরলে বা বন্য প্রাণী শিকার করলে স্থানীয় মানুষ তা জানতে পারেন। তাঁরা যদি প্রতিবাদ করেন এবং বন বিভাগকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন, তাহলে অপরাধ প্রতিরোধ করা সহজ হবে।
ইমরান আহমেদ জানান, বন অপরাধ শনাক্ত করতে ড্রোন ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। তবে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বন বিভাগের জলযানের ঘাটতি রয়েছে। গত বছর ১০টি জলযান কেনার পরিকল্পনা থাকলেও তা হয়নি। সুন্দরবনে টহলের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে অনেক জায়গায় নৌকায় করে টহল দেওয়া হতো; এখন পায়ে হেঁটে টহলের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এতে হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধারের সুযোগ বেড়েছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, সুন্দরবনে প্লাস্টিক বর্জ্যের অন্যতম উৎস হলো নৌযান ও লঞ্চে ব্যবহার করা চিপস, বিস্কুটসহ বিভিন্ন পণ্যের প্যাকেট। খুলনা থেকে কয়রা ও মোংলার দিকে চলাচলকারী নৌযানগুলোয় এসব বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে বন বিভাগের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের লবণাক্ততা শুধু গাছপালার ওপর প্রভাব ফেলছে না, জলজ প্রাণীর ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। ইরাবতী ডলফিন তুলনামূলক লবণাক্ত পানির পরিবেশে থাকতে পারে। অন্যদিকে গাঙ্গেয় শুশুক মিঠাপানির পরিবেশ বেশি পছন্দ করে। লবণাক্ততা বাড়ায় এসব প্রাণীর বিচরণক্ষেত্র বদলে যেতে পারে।
ওয়াটারএইড বাংলাদেশের প্রকল্প সমন্বয়ক মোহাম্মদ নেহাল আজমাত মহী বলেন, উপকূলের নিরাপদ পানির সংকট, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির সমস্যাগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। নিরাপদ পানির প্রযুক্তি স্থাপন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। এসব ব্যবস্থার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কার জরুরি।
সভায় আরও বক্তব্য দেন মোংলা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অর্থিতা হাওলাদার, সহকারী পুলিশ সুপার (মোংলা সার্কেল অফিস) মো. রেফাতুল ইসলাম, মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহীন, মোংলার জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম এবং মোংলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পিযুষ রায়।
উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে আমন্ত্রিতরা তাদের মতামত ও সমাধানের পথ তুলে ধরেন। মোংলা উপজেলার চাঁদপাই ইউনিয়নের দক্ষিণ কাইনমারী গ্রামের বনজীবী নারী কমলা সরকার বলেন, ‘আমাদের পানির সংকট শুধু খাওয়ার পানিতে সীমাবদ্ধ নেই; রান্না, গোসল, এমনকি গবাদিপশু ও পাখির জন্যও পানির সমস্যা রয়েছে। লবণপানিতে মাছ ধরতে গিয়ে নারীরা নানা শারীরিক সমস্যায় পড়েন। কিন্তু অনেকের চিকিৎসা করানোরও সামর্থ্য নেই।’
জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির মোংলা শাখার সভাপতি বিদ্যুৎ মণ্ডল বলেন, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের নিরাপত্তা, সুপেয় পানি, স্যানিটেশন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। এ ছাড়া বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধের পাশাপাশি জাহাজের বর্জ্য ও বন্দরকেন্দ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’–এর সমন্বয়কারী নূর আলম শেখ বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য পুরোনো পুকুর সংস্কার ও সংরক্ষণ, নতুন পুকুর খনন এবং সরকারি ও জেলা পরিষদের পুকুরগুলো খাবার পানির জন্য উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। সুন্দরবন রক্ষায় শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাংমারি ডলফিন সংরক্ষণ দলের দলনেতা ইস্রাফিল বয়াতি বলেন, ‘সুন্দরবনের নদী-খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে। সেই পানি প্রবাহিত হয়ে লোকালয়ে আসছে, আর মানুষ তা ফিটকিরি দিয়ে পরিশোধন করে পান করছে। আমরা এই সংকট থেকে মুক্তি চাই।’
মোংলার সুন্দরবন জাদুঘরের পরিচালক সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, জেলেদের অভিযোগ, মাছ ধরতে গেলে বিভিন্ন টহল ফাঁড়ি ও ডাকাতদের টাকা দিতে হয়। বন রক্ষার পরিকল্পনায় স্থানীয় মানুষের জীবিকা, অভিজ্ঞতা ও বাস্তব সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
উন্মুক্ত আলোচনায় আরও অংশ নেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের সভাপতি ফ্রান্সিস সুদান হালদার, উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মো. সেলিম, মোংলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আহসান হাবিব হাসান, ইয়ুথ লিডার জান্নাতুল সাদিয়া এবং উন্নয়ন কর্মী মার্গারেট দাস।
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর গড়া সংগঠন ‘অন্তর বাজাও’-এর সদস্যদের সুন্দরবনবিষয়ক একটি গানের মধ্য দিয়ে আলোচনা সভাটি শেষ হয়।