যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারণার সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভোটারদের প্রতি অন্তত ৪৭ বার এই আহ্বান জানিয়েছিলেন যে, ব্যালটে তাঁর নাম আছে বলে ধরে নিয়েই যেন তাঁরা ভোট প্রদান করেন। তবে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল এসেছে সম্পূর্ণ বিপরীত। গতকাল বুধবার সকাল পর্যন্ত পাওয়া প্রতিনিধি পরিষদের জাতীয় নির্বাচনের তথ্যানুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা প্রায় ১৩ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। ১৯৭৬ সালের পর কংগ্রেস নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় ব্যবধান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর ট্রাম্পের দাবি, ব্যালটে যদি তাঁর নাম থেকে থাকত, তবে রিপাবলিকানরা বিপুল ভোটে জয়লাভ করতেন। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন; হোয়াইট হাউস গত এপ্রিল মাস থেকেই এমন পরাজয়ের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল। নতুন কোনো আইন প্রণয়ন ছাড়াই কীভাবে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করা যায় এবং কংগ্রেসের সম্ভাব্য তদন্তগুলো কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা নিয়ে পরিকল্পনা করছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার কথা বলেছেন। তবে মনে রাখতে হবে, ডেমোক্র্যাটদের পাস করা যেকোনো বিলে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা এখনো তাঁর হাতেই রয়েছে। আগামী জানুয়ারিতে যখন নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন বসবে, তখন বাজেট প্রণয়ন, বিভিন্ন তদন্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থানের কঠিন পরীক্ষা হবে।
ডেমোক্র্যাটদের পরিকল্পনা থাকতে পারে ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক লেনদেন, প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয় এবং এপস্টিন-সংক্রান্ত গোপন নথি নিয়ে তদন্ত শুরু করার। প্রয়োজনে তাঁদের কংগ্রেসের সামনে তলব করা হতে পারে। এমনকি ট্রাম্পের ওপর অভিশংসনের খড়্গও ঝুলতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়া শুরু হলেও তাঁকে চূড়ান্তভাবে অপসারণ করতে সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন, যা বেশ কঠিন।
অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস নতুন শুল্ক আরোপ এবং ভিসার শর্ত আরও কঠোর করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে। তবে বাজেট পাস কিংবা বড় কোনো আইন কার্যকর করতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসা, প্রতিরক্ষা ব্যয় ও এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি নিয়ে তদন্ত করতে পারেন। চাইলে তাঁদের কংগ্রেসের সামনে ডাকাও হতে পারে। রয়েছে অভিশংসনের খড়্গ। অবশ্য সেই উদ্যোগ নিলেও তাঁকে সরাতে সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন।
তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই বড় পরাজয় মানেই ২০২৮ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের দলের পুনর্নির্বাচনের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। এই পরাজয়ের ফলে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন; ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব তৈরি করা তাঁর জন্য এখন একটি বড় সিদ্ধান্ত হতে পারে। জেডি ভ্যান্সের পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসও ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে নামার কথা ভাবতে পারেন।
মূলত, মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় পরাজয় মানেই ২০২৮ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের দলের পুনর্নির্বাচনের পথ বন্ধ নয়। কারণ, আগামী দুই বছরে ডেমোক্র্যাটরা ভোটারদের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ করতে সক্ষম হন, তার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করবে।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়নে তারা এখন আরও সময় নিতে পারে। অন্যদিকে, চীনও দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ট্রাম্পের এই দুর্বল অবস্থানকে নিজেদের সুবিধার্থে কাজে লাগাতে চাইতে পারে।