আমার সহকর্মী এবং ছোট ভাই নোয়েল। ওর নামকরণের পেছনে একটি মজার গল্প আছে। ওর বাবা চেয়েছিলেন ওর নাম হোক নোবেল, আর মা চেয়েছিলেন কোয়েল। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে তীব্র কথা কাটাকাটি হয়। শেষ পর্যন্ত মায়ের এক শান্তি প্রস্তাবে মিটে যায় ঝামেলা; ঠিক হয় নোবেলের ‘নো’ আর কোয়েলের ‘য়েল’ মিলিয়ে নাম রাখা হবে নোয়েল।

গল্পটি প্রথমবার শোনার পর আমি উচ্চস্বরে হেসেছিলাম। নোয়েল খুব চমৎকারভাবে গল্প বলতে পারে এবং সে সব সময় হাসিখুশি থাকে। তবে আজ তাকে খুব বিষণ্ন দেখাচ্ছিল, তাই আমি ওর কাছে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম ওর চোখের নিচে কালি পড়েছে এবং সে বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে, নোয়েল?’

নোয়েল মাথা তুলে বলল, ‘ভাই, পায়েলের সাথে আমার বিয়েটা ভেঙে গেছে।’

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘আরে বলো কী? কেন? তোমাদের এত দিনের প্রেম…’

সে উত্তর দিল, ‘আমাদের বাড়ি মোহাম্মদপুরে, তাই।’

আমি বুঝতে না পেরে বললাম, ‘মানে?’

নোয়েল জানাল, ‘পায়েলের পরিবার এই শুক্রবার এসেছিল আমাদের বাসায়। বিয়ের দিন–তারিখও ঠিক হয়েছিল। কিন্তু তারা ফেরার পথে ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে। আইফোন, টাকা, গহনা সব তো গেছেই। পায়েলের বাবার স্যান্ডো গেঞ্জিটা পর্যন্ত ছিনতাইকারী রেখে দিয়েছে।’

আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম, ‘কিন্তু এতে তোমার দোষ কোথায়?’

নোয়েল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘পায়েলের মা–বাবা বলছে, মোহাম্মদপুরে মেয়ের বিয়ে দেবে না।’

আমি তাকে পরামর্শ দিলাম, ‘আরে অন্য এলাকায় বাসা নাও।’

নোয়েল বলল, ‘ভাই, অনেকভাবেই বোঝানোর চেষ্টা করছি। দেখি, কী হয়। দোয়া করবেন।’

সারা দিন আমি নোয়েলকে একের পর এক বুদ্ধি দিতে থাকলাম, যাতে কোনোভাবে তার বিয়েটি জোড়া লাগে।

এদিকে আমার বসকে অনুরোধ করে একটু আগেভাগেই অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লাম। কারণ, আজ সোনিয়ার সাথে আমার নিউমার্কেটে যাওয়ার কথা ছিল। আমি একটি অ্যাপ-চালিত বাইকে উঠলাম। কিন্তু বাইকারটি খুব বিপজ্জনকভাবে বাইক চালাচ্ছিল এবং ব্রেক করতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। হঠাৎ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি রেঞ্জ রোভার গাড়িতে সজোরে ধাক্কা দিল বাইকটি। ভাগ্য ভালো যে গাড়িতে কেউ ছিল না। আমি রাস্তায় লুটিয়ে পড়লাম এবং আমার কনুই ও হাঁটুর ছাল উঠে গেল। তবুও আমি দ্রুত উঠে দাঁড়ালাম, কারণ নিউমার্কেটে পৌঁছাতে দেরি হলে আমার পিঠের ছালও আর থাকবে না বলে আশঙ্কা করলাম।

আমি বাইকারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী রে ভাই, বাইকের ব্রেক নাই?’

বাইকার মাথা চুলকে উত্তর দিল, ‘সকাল থেকে ব্রেক কাজ করছে না। ভাবছিলাম, আপনাকে নামিয়ে দিয়ে ব্রেক ঠিক করতে যাব।’

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘এই সব কী কন? আরেকটু হলে তো নিউমার্কেটের বদলে গোরস্তানে নামিয়ে দিতেন।’

এরপর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে একটি সিএনজিতে করে গন্তব্যের দিকে রওনা হলাম। নিউমার্কেটে পৌঁছে দেখলাম, সোনিয়া আমার জন্য অপেক্ষা না করে আগেই কেনাকাটা শুরু করে দিয়েছে।

হঠাৎ পুরো মার্কেট ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল এবং সাথে শোনা গেল এক বিকট শব্দ। আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। ধোঁয়ার কারণে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না এবং ভিড়ের মধ্যে সোনিয়াকেও হারিয়ে ফেললাম। আমি চিৎকার করে বলতে লাগলাম, ‘সোনিয়া, সোনিয়া, আগুন আগুন।’ ভাগ্যক্রমে ধোঁয়ার মধ্যেই সোনিয়াকে খুঁজে পেলাম। আমি দ্রুত ওর হাত ধরে দৌড়াতে শুরু করলাম। মনে মনে ভাবলাম, যেভাবে হোক আমাদের বাঁচতে হবে। সোনিয়া চিৎকার করে কিছু বলছিল এবং হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু আমি শক্ত করে ধরে দৌড়াতে থাকলাম। মিনিট তিনেক পর ধোঁয়া কমে এলে নিরাপদ জায়গা দেখে আমি থামলাম।

তখনই সোনিয়া বলল, ‘আগুন কই পেলেন? এটা তো মশার ওষুধ।’

কণ্ঠস্বরটি কেমন যেন অন্যরকম মনে হলো। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, আমি এক অচেনা মেয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছি।

আমি চমকে গিয়ে হাত ছেড়ে দিয়ে বললাম, ‘স৵রি, আমি ভেবেছি আমার বউ।’

মেয়েটি কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে সোনিয়া সেখানে হাজির হলো এবং অনেক স৵রিটরি বলে মেয়েটিকে সামাল দিল। এরপর সোনিয়া ঝাঁজালো গলায় আমাকে বলল, ‘তুমি নিজের বউকেও চেনো না! তোমার সাথে সংসার করব না আমি।’

এই বলে সে উল্টো দিকে হাঁটা দিল। আমি সাথে সাথে নোয়েলকে ফোন দিলাম এবং বললাম, ‘নোয়েল, আমারও বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে। দোয়া কোরো।’

নোয়েল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী বলেন! আপনার হয়ে যাওয়া বিয়ে কীভাবে ভেঙে যাচ্ছে?’

আমি উত্তর দিলাম, ‘বউ চিনতে ভুল করেছি।’

ফোন রেখে আমি সোনিয়ার পেছনে ছুটলাম। বুঝলাম, আজকে আমার খবর আছে।