বাজারে মাছ, মাংস, তেল, ডাল এবং শাকসবজির দাম বাড়ার ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত একতা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন বিপুল চৌধুরী। তিনি ভাবছিলেন, এই পণ্যগুলো কত চমৎকারভাবে নিজেদের দাম বাড়িয়ে নিচ্ছে! মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি ভাবলেন, এই একতা যদি মানব সম্প্রদায়ের মধ্যেও থাকত, তবে কত ভালো হতো। কারণ বর্তমানে মানুষের দাম কত নিদারুণভাবে কমছে!

এমন সময় হঠাৎ বাসার গেটের দিকে নজর যেতেই তাঁর এই উচ্চমার্গীয় চিন্তার পথ বাধাগ্রস্ত হলো। তিনি দেখলেন, গেটের সামনে একটি চ্যাংড়া ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটি কিছুক্ষণ পরপর মাথা উঁচু করে তাঁর বাসার দিকে তাকাচ্ছে এবং পুনরায় চোখ নামিয়ে হাঁটছে। দৃশ্যটি দেখে বিপুলের ভুরু কুঁচকে গেল। তিনি মনে মনে ভাবলেন, এই ছেলেটি এখানে কী চায়? বর্তমান সময়ে দিনকাল খুব একটা ভালো নেই, তবে সে কি কোনো চোরছ্যাঁচড়?

সন্দেহ দূর করতে বিপুল চৌধুরী দ্রুত গতিতে গেটের সামনে ছুটে এলেন। তিনি কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাসার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে এমন ঘুরঘুর করছ কেন, কাকে চাই?’

ছেলেটি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর দিল, “—না মানে গেটে কোনো দারোয়ান দেখছি না তো, তাই”

বিপুল চোখ পাকিয়ে তাকে ঝাড়ি দিয়ে বললেন, ‘আমি আছি, বলো।’

ছেলেটি তখন বিনয়ের সাথে জানাল, “—আসলে হয়েছে কী দারোয়ান চাচা, আমি সুমিদের বাসায় যেতে চাইছিলাম। ও এই বিল্ডিংয়েই থাকে। আমাকে ব্লক করে রাখায় মোবাইল ফোনে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না।”

ছেলেটি তাকে ‘দারোয়ান চাচা’ বলে সম্বোধন করায় বিপুল চৌধুরীর মনে তীব্র ক্ষোভ জন্মাল। তিনি তাকে একটি চড় মারার সুপ্ত বাসনা অনুভব করলেও আপাতত তা দমিয়ে রাখলেন। তবে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল, ছেলেটি তাঁর ভার্সিটিতে পড়া মেয়েকে খুঁজছে কেন? আর সুমি কেন তাকে ব্লক করে রেখেছে? পুরো ঘটনাটি না জানা পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনা ঘটানো ঠিক হবে না বলে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন। মাথা ঠান্ডা রেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাকে খুঁজছ সুমিকে? কিন্তু তুমি কে?’

ছেলেটি কিছুটা রক্ষণাত্মক হয়ে উত্তর দিল, “—সেটা আপনাকে বলব কেন? এটা ওর আর আমার পার্সোনাল ব্যাপার।”

এই কথা শুনে বিপুল চৌধুরী আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না এবং ফোঁসফোঁস করে উঠলেন। তিনি বললেন, ‘এটা আমারও পার্সোনাল ব্যাপার।’

ছেলেটি অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল এবং জিজ্ঞেস করল, “—আপনার ব্যাপার মানে?”

বিপুল তখন গম্ভীর হয়ে জানালেন, ‘আমি সুমির বাবা। এবার বলো, তোমার পরিচয় শুনি।’

নিজের ভুল বুঝতে পেরে ছেলেটি কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “—ইয়ে মানে আংকেল, আমি সরি। সুমি আমার ক্লাসফ্রেন্ড। আমার বাড়ি হাতিয়া। এখানে ভার্সিটি হলে থাকি।”

বিপুল এবার জানতে চাইলেন, ‘ঠিক আছে, এবার বলো, সুমিকে খুঁজছ কেন?’

ছেলেটি কথা বলতে গিয়ে ইতস্তত করতে লাগল এবং বলল, “—আমি আপনার কাছে”

বিপুল বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘এত ইতস্তত করছ কেন? কী ব্যাপার বলবে তো?’

ছেলেটি আমতা আমতা করে বলল, “—আমি সুমিকে... মানে সুমি আমাকে বলেছিল”

বিপুল চৌধুরী কথা শেষ করতে দিলেন না, তিনি সরাসরি বললেন, ‘সুমি যা–ই বলে থাকুক, লাভ নেই। সুমি এখনো অনার্স পাস করেনি।’

ছেলেটি অবাক হয়ে বলল, “—তাতে কী? আমার তো এখনই চাই।”

বিপুল কড়া সুরে উত্তর দিলেন, ‘তুমি চাইলেই হলো? আমরা এখন চাইছি না।’

ছেলেটি আবারও অনুরোধ জানাল, “—কিন্তু সুমি যে বলেছিল”

বিপুল চৌধুরী তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘সুমি কী বলেছিল, সেটা ব্যাপার না। সুমির বাবা কী বলছে, সেটাই আসল ব্যাপার। বুঝতে পেরেছ?’

ছেলেটি মাথা নিচু করে বলল, “—জি আংকেল, পেরেছি। কিন্তু সুমি তো বলেছিল”

বিরক্ত হয়ে বিপুল চৌধুরী চিৎকার করে বললেন, ‘সেই কখন থেকে সুমি বলেছিল, সুমি বলেছিল করছ। কী বলেছিল ও তোমাকে?’

সবশেষে ছেলেটি আসল কথাটি খুলে বলল, “—বলেছিল, আমার কাছ থেকে ধার নেওয়া দুই হাজার টাকা পূজার ছুটির আগেই ফেরত দেবে। আর কদিন পরেই পূজা। টাকা না পেলে পূজায় বাড়ি যাবার টিকিট কাটব কী করে!”