বর্তমান সময়ে ফেসবুক খুললেই সাররাজ এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে। তার মনে হচ্ছে সে যেন গৃহবন্দী হয়ে পড়েছে। কারণ তার নিউজ ফিড এখন রঙিন বাংলাদেশ ম্যাপে ছেয়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বর্তমানে ‘বাংলাদেশ ভ্রমণ ম্যাপ’ নামের একটি নতুন ট্রেন্ড চলছে, যেখানে ব্যবহারকারীরা দেখাচ্ছেন তারা দেশের কতটি জেলা ভ্রমণ করেছেন। এই প্রতিযোগিতায় সাররাজ নিজেকে বড্ড অসহায় মনে করছে। তার অভিজ্ঞতায় জেলা আছে মাত্র দুটি—একটি তার নিজের শহর ঢাকা এবং অনেক বছর আগে পরিবারের সাথে গিয়ে দেখা কক্সবাজার।

সাররাজের কাছে এই পরিস্থিতি অত্যন্ত অপমানজনক মনে হলো। সে ভাবল, এই করুণ দশা যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে, তবে তার অনুসারীরা তাকে উপহাস করবে এবং এক এক করে সবাই তাকে আনফলো করে দেবে। আবার ট্রেন্ডিং বিষয়ের সাথে তাল মেলাতে না পারলে তার সুন্দর আইডির রিচ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে খুঁজতে সাররাজের মাথায় অদ্ভুত ৬৯টি বুদ্ধি এল, যার মাধ্যমে সে তার ভ্রমণ করা জেলার সংখ্যা বাড়িয়ে নিতে পারবে।

এর মধ্যে কয়েকটি বিশেষ কৌশলকে সাররাজ বেশি গুরুত্ব দিল:

১। হাইওয়ে নীতি:
এই নীতি অনুযায়ী, ঢাকা থেকে কক্সবাজারে যাওয়ার পথে বাসটি যেহেতু নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী এবং চট্টগ্রাম হয়ে যায়, তাই সাররাজ মনে করল এই জেলাগুলোকেও ম্যাপে যুক্ত করা উচিত। তার যুক্তি ছিল, ‘বাস তো ওখান দিয়েই এসেছে’।

২। পদধূলি নীতি:
হাইওয়ে নীতি নিয়ে বিতর্ক হতে পারে ভেবে সাররাজ সিদ্ধান্ত নিল বাসটিকে প্রতিটি জেলায় থামাবে। নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর ব্রিজের তীব্র যানজটে বাসটি আটকে পড়লে সে বাস থেকে নেমে ব্রিজের ওপর কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করল। তার মতে, যেহেতু তার পদধূলি ওই জেলায় পড়েছে, তাই তালিকায় নারায়ণগঞ্জ যুক্ত হয়ে গেল। এরপর মুন্সিগঞ্জ জেলার মানাবে অ্যামিউজমেন্ট পার্কের সামনে বাসটিকে যানজটে আটকে দিল। তবে প্রতিবার যানজটের ওপর নির্ভর করা যায় না, তাই ভিন্নতা আনতে সে বরাবরের মতো কুমিল্লায় যাত্রাবিরতি দিল এবং কুমিল্লাকেও তালিকায় যুক্ত করল।

৩। ইকোরুম থিওরি:
দ্বিতীয় কৌশলের মতোই তবে ভিন্ন কৌশলে সাররাজ একটি নতুন তত্ত্ব উদ্ভাবন করল, যার নাম দিল ‘ইকোরুম থিওরি’। এটি মূলত ‘ইকোনমি’ ও ‘ওয়াশরুম’ শব্দের সংমিশ্রণ। এই থিওরি প্রয়োগ করতে সে ফেনী জেলার একটি ফিলিং স্টেশনে বাস থামাল ডিজেল নেওয়ার জন্য। সেখানে নেমে সে ওয়াশরুম ব্যবহার করল এবং দোকান থেকে এক কাপ কড়া রং-চা কিনে স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখল। সাররাজের মতে, পানি ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক অবদান রাখা সত্ত্বেও একে ‘ভ্রমণ’ না বলা হবে চরম অকৃতজ্ঞতা। একই থিওরি সে চট্টগ্রামেও প্রয়োগ করল। সেখানে বাসটি কাউন্টারে থামলে সে পুনরায় তার ইকোরুম থিওরি কাজে লাগাল।

এই অদ্ভুত সব কৌশলে সাররাজের ম্যাপে আগের ২টির সাথে আরও ৫টি জেলা যুক্ত হয়ে মোট ৭টি জেলা হলো—ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০টি জেলা। তাই সে চতুর্থ উপায়ের আশ্রয় নিল।

৪। আত্মীয়তা তত্ত্ব:
এই উপায়ে সাররাজ তার দূরসম্পর্কের আত্মীয়রা কোন কোন জেলায় থাকেন তা খুঁজে বের করল। তার যুক্তি ছিল, যদি তার দূরসম্পর্কের চাচাতো বোনের মেয়ে তাকে মামা বলে ডাকে এবং সেই মেয়ের শ্বশুরবাড়ি নোয়াখালীতে হয়, তবে মামা হিসেবে সে ওই পরিবারের অংশ। আর যেহেতু আত্মীয়তা মানেই পরিবারের অংশ, তাই মনস্তাত্ত্বিকভাবে সে নোয়াখালীরও বাসিন্দা। এই অদ্ভুত যুক্তিতে আরও ৩টি জেলা খুঁজে বের করে সে তার লক্ষ্যমাত্রা ১০টি পূরণ করল।

অবশেষে সাররাজের মনে হলো, এখন সে আত্মবিশ্বাসের সাথে এটি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করতে পারবে। তবে মনের গভীরে এক ধরণের আফসোসও কাজ করল যে, এত সুন্দর একটি দেশ সে বাস্তবে দেখার চেষ্টা করেনি। তাই সে এবার দৃঢ় সংকল্প করল যে, ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’ দেখার জন্য সে সত্যিই ভ্রমণে বের হবে।