আমার বন্ধুদের কথা বলতে গেলে মনে হয় তারা যেন অন্য কোনো জগতের মানুষ। সাধারণ মানুষের বন্ধুরা যখন ঘুরতে যাওয়া বা নামী রেস্তোরাঁয় আহার করার পরিকল্পনা করে, আমার বন্ধুদের প্রধান চিন্তা থাকে আজকের চায়ের বিলটা কে দেবে, সেই ধান্দায় তারা ব্যস্ত থাকে।

সম্প্রতি আমার সাথে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে, যার কথা মনে পড়লে অবাক হতে হয়। শেষ কবে এমন অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম, তা আমার মনে নেই। আমার বন্ধু নিয়াজ আমাকে ফোন করে জানাল যে, তার শরীর এবং মন কোনোটিই ভালো নেই। আমি তাকে পরামর্শ দিলাম ডাক্তারের সাথে কথা বলতে।

সে উত্তরে বলল, “—দেখালাম তো, কিন্তু ডাক্তার খুব এক্সপেনসিভ প্রেসক্রিপশন দিয়েছে। আমার সাধ্যের বাইরে।”

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “—কী এমন ওষুধ দিল যেটা সাধ্যের বাইরে?”

সে বলল, “—কিছু না, বাদ দে। লাবণ্য কিন্তু কাল সবাইকে ডেকেছে, খুব জরুরি নাকি! চলে আসিস, তখন বাকি কথা খুলে বলব।”

আমি আর বেশি কিছু জানতে চাইলাম না। কিন্তু পরদিন দেখা গেল, নির্ধারিত মিটিংয়ে নিয়াজ অনুপস্থিত। এতেই লাবণ্য প্রচণ্ড রেগে গেল। সে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলল, “—একটা অনুরোধই তো করেছিলাম, আজ যেন সবাই থাকে। ওর কত বড় সাহস যে আমি ডাকার পরও এল না, হ্যাঁ!”

আমি তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও তেমন কোনো ফল পেলাম না। এরপর আমি একপাশে গিয়ে নিয়াজকে ফোন করলাম।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “—কী রে, তুই কই? আমাকে আসতে বলে নিজেই আসলি না কেন?”

নিয়াজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “—আর বলিস না, দোস্ত; ডাক্তারের কথামতো আপেল কিনতে গিয়েছিলাম, কত কষ্ট করে অতগুলো টাকা জমিয়ে আপেল কিনলাম, এভাবে ছিনতাই করবে!”

আমি চমকে গিয়ে বললাম, “—কী বলিস! অ্যাপেলের ফোন কেনার এত টাকা কোথায় পেলি? আর ডাক্তার তোকে ফোন কেন কিনতে বলবে? কী আজব!”

সে অবাক হয়ে বলল, “আরে হ্যাঁ রে, বাপ! তোকে তো কালই বললাম, ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। ডাক্তার বলল, আমার নাকি ভিটামিন আর কিসের কিসের যেন অভাব। প্রতিদিন একটা আপেল খাওয়া দরকার। ওই জন্যই তো আজ”

কথা শেষ করার আগেই হঠাৎ ফোনটি কেটে গেল। আমি দ্রুত লাবণ্যকে পুরো বিষয়টি জানালাম এবং আমরা দেরি না করে নিয়াজের বাড়ির দিকে রওনা হলাম।

নিয়াজের বাসায় পৌঁছে দেখলাম এক করুণ দৃশ্য। তার বাবা-মা এবং ছোট বোন সবাই মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। পরিস্থিতি যে বেশ গুরুতর, তা সহজেই বোঝা যাচ্ছিল। আমাদের দেখামাত্রই তার বাবা চিৎকার করে বলতে শুরু করলেন, “এত কেয়ারলেস কেউ কেন হবে, তোমরাই বলো? ও কি কোনো দিন বড় হবে না? এতগুলো টাকার জিনিস, এভাবে ছিনতাইকারীকে দিয়ে আসবে?”

আমি এবং লাবণ্য তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। আমি বললাম, “আঙ্কেল, ও তো আর ইচ্ছা করে করেনি, অঘটনের ওপর তো আর কারও হাত নেই।”

কিন্তু তিনি কথা শুনলেন না, বরং চেঁচিয়ে বললেন, “—চুপ করো! তোমাদের কথায় আমাকে ভোলাতে পারবে না। এতগুলা টাকা! কে দেবে এর খেসারত?”

লাবণ্য আমাকে ইশারায় সেখান থেকে সরে যেতে বলল। আমরা দুজন নিয়াজের ঘরে গেলাম। গিয়ে দেখি, সে যেন কোনো বাংলা সিনেমার নায়িকার মতো বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে। তার পাশে পড়ে ছিল একটি নীল রঙের পলিথিন।

আমি মনে মনে ভাবলাম, আজকাল কি নীল পলিথিনে আইফোন দেওয়া হয়? লাবণ্য বিষয়টি দেখে মৃদু হাসল।

নিয়াজ মাথা তুলে বিষণ্ণ স্বরে বলল, “দেখ, মন-মেজাজ ভালো না। এতক্ষণ বাপের ঝাড়ি খেয়ে মাথা আরও গরম। এসব ফাইজলামি ভাল্লাগছে না।”

আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “—আচ্ছা, তুই আমাকে বল, যে ছেলে চায়ের বিল দেয় না একবেলা, তার হঠাৎ আইফোন কেনার শখ কেন হলো?”

সে বিরক্ত হয়ে বলল, “—কি তখন থেকে আইফোন–আইফোন করছিস?”

লাবণ্য তার মাথায় একটি আলতো চাপ দিয়ে বলল, “বাবা রে বাবা, ও আইফোন হারাতে পারবে, আর আমরা বলতে পারব না!”

নিয়াজ এবার চিৎকার করে বলল, “—আমি বুঝতেসি না তোদের কোনো কথা, আইফোন আমি কোথায় পাব? আমার আইফোন থাকলে না আইফোন হারাব, ছিনতাই তো হলো আপেল।”

আমি এবং লাবণ্য চরম বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম। কেউ কেন দামী আইফোন চুরি না করে সাধারণ ফল ছিনতাই করবে?

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “—তার মানে তুই আজ আপেল মানে ফল কিনতে গিয়েছিলি সকালে? আর সেটা একটা লোক এসে ছিনতাই করে নিয়ে গেছে? এগুলো কেমন যা–তা ঘটনা?”

সে আবারও সেই কথাটিই বলল, “—আরে হ্যাঁ রে, বাপ! তোকে তো কালই বললাম, ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। ডাক্তার বলল, আমার নাকি ভিটামিন আর কিসের কিসের যেন অভাব। প্রতিদিন একটা আপেল খাওয়া দরকার। ওই জন্যই তো আজ”

আমার মনে হলো, বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির বাজারে ডাক্তার তাকে আপেল খেতে বলাটা মোটেও ঠিক হয়নি। তার চেয়ে একটি অ্যাপেল ফোন কিনতে বললেও হয়তো চিন্তা করা যেত।

লাবণ্য মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, “দাঁড়া, দাঁড়া! আমার হিসাব মিলছে না।”

আমি বললাম, “ফল কেন ছিনতাই করবে কেউ? আর ছিনতাই করলেও এটা নিয়ে এত মন খারাপের কী আছে? কয়েকটা আপেলই তো!”

তখনই নিয়াজ চিৎকার করে উঠল, “কয়েকটা আপেল? তুই আপেলের দাম জানিস? দুই দিন পর তো সোনার দোকানে সোনা বাদ দিয়ে আপেল বেচবে সবাই।”

আমি জানতে চাইলাম, “—কয় টাকাই বা দাম?”

সে জানাল, “—কেজি ৪০০ টাকা, আমি বড়লোকি দেখাতে গিয়ে ৮০০ টাকা দিয়ে ৮টা আপেল কিনেছিলাম।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “—তারপর?”

সে বর্ণনা করল, “—দোকান থেকে বের হওয়ার পরই মনে হচ্ছিল, কেউ আমাকে ফলো করছে। আমিও তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু তারপরই ব্যাটা এসে আমার সামনে ছুরি ধরল!”

আমি বললাম, “—কী সাংঘাতিক!”

সে করুণ সুরে বলল, “—তারপর ছোঁ মেরে আমার হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে গেল। পরে আড়ংয়ের কাপড়ের ব্যাগে করে সযত্ন আপেলগুলা রেখে এই নীল পলিথিন হাতে ধরিয়ে দিয়ে ব্যাটা পগারপার!”

পুরো ঘটনা শুনে সত্যিই খুব খারাপ লাগল। আমরা নিয়াজকে সান্ত্বনা দিয়ে চুপচাপ বেরিয়ে এলাম। আসলে নিয়াজের কোনো দোষ ছিল না। সব দোষ ছিল সেই ডাক্তারের, যিনি তাকে আপেল খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এই চরম মুদ্রাস্ফীতির সময়ে কাউকে আপেল খেতে বলা একদমই ঠিক হয়নি, তার চেয়ে অ্যাপেল ফোন কিনতে বললেও ভেবে দেখা যেত।