সোনিয়া অত্যন্ত কড়া গলায় প্রশ্ন করল, ‘রিয়াজুল, এইটা কী করছ তুমি?’
আমি বেশ অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকাতে লাগলাম। সত্যি বলতে, সারা দিন আমি অনেক কিছুই করেছি। যার বেশির ভাগই সোনিয়ার পছন্দ নয়, তা আমি জানি, তবুও করে ফেলেছি। যেমন আজ সকালেই পচা মাছ কিনে এনে সোনিয়াকে ভীষণ রাগিয়ে দিয়েছি। মাছটি আমি দেখেশুনেই কিনেছিলাম; বাজারের অ্যাকুয়ারিয়ামে রাখা টাটকা রুই মাছ কিনে, সুন্দর করে কেটেকুটে বাসায় এনেছি। কিন্তু বাসায় আনার পর দেখা গেল মাছটি পচা। জ্যান্ত মাছ কীভাবে পচা হয়ে গেল, তা আমার মাথায় ঢুকছে না। সম্ভবত মাছওয়ালা শেষ মুহূর্তে ভালো মাছ বদলে পচা মাছ গছিয়ে দিয়েছে। তবে এখন এই ষড়যন্ত্রতত্ত্বের কথা বলে কোনো লাভ নেই। সোনিয়া সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই মাছ আমাকেই রান্না করতে হবে, কোনোভাবেই ফেলে দেওয়া যাবে না। তাই এখন আমি ইউটিউবে পচা মাছ কীভাবে রান্না করা যায়, তার রেসিপি খুঁজছি ও দেখছি।
আগে যখন ইলিশ রান্না করতাম, তখন তার ঘ্রাণ অনেক দূর ছড়িয়ে পড়ত। আমার এই পচা রুই মাছের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ঘটনা ঘটল। মাছের তীব্র গন্ধ পাশের বাসার আন্টিকে টেনে আনল। তিনি দ্রুত সোনিয়ার কাছে এসে বললেন, ‘এত দুর্গন্ধ কিসের? কী রান্না করছ?’
সোনিয়া উত্তর দিল, ‘পচা মাছ এনেছে, সেটাই রান্না করছে।’
আন্টি তখন মন্তব্য করলেন, ‘কিন্তু এই দুর্গন্ধ তো একপ্রকার টর্চার। স্বামীকে মাছ কেনা শেখাও, বুঝলে?’
সোনিয়া পাল্টা জবাব দিল, ‘মাছ কেনা নাহয় শেখালাম, কিন্তু চালাক–চতুর হওয়া কীভাবে শেখাব?’
আন্টি পরামর্শ দিলেন, ‘অনলাইনে একটা শর্ট কোর্সে ভর্তি করে দাও। দেখবা আর ঠকবে না।’
সোনিয়াও একমত হয়ে বলল, ‘তা–ই করতে হবে মনে হচ্ছে।’
আন্টির এই অভিযোগের পর আমার মাছ রান্না করার প্রক্রিয়া আপাতত বন্ধ হলো।
যাহোক, এখন সোনিয়া আমার পাশে বসেছে। তার ভাবভঙ্গি মোটেই ভালো মনে হচ্ছে না। সোনিয়া আবারও জিজ্ঞেস করল, ‘এইটা তুমি কী করেছ?’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কী করেছি?’
সে বলল, ‘ফেসবুকে আমার বান্ধবী রানুর ছবিতে কী কমেন্ট করেছ?’
আমি সরল মনে বললাম, ‘কেন লিখেছি, “অনাগত বেবির জন্য শুভকামনা। তোমার বাচ্চাটা সুস্থ-সুন্দর হোক।”’
সোনিয়া চিৎকার করে উঠল, ‘গাধার গাধা। তোমার কমেন্ট নিয়ে লেগেছে তোলপাড়। ওর তো বিয়ে ভেঙে যাওয়ার অবস্থা।’
আমি হতভম্ব হয়ে বললাম, ‘বিয়ে মানে? ওর না বেবি শাওয়ার হলো।’
‘আরে গাধা, ওটা বেবি না, ব্রাইডাল শাওয়ার।’
আমি অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, ‘ওহ্ সরি সরি। গুলিয়ে ফেলেছি দুইটা। ও পেটে হাত রেখে ছবি তুলেছে। পেছনে শাওয়ার লেখাটা শুধু চোখে পড়েছে, বেবি না ব্রাইডাল, মিস করে গেছি।’
সোনিয়া বিরক্ত হয়ে বলল, ‘পেটে হাত দিয়ে ছবি তুললেই সে প্রেগন্যান্ট?’
আমি আমতা আমতা করে বললাম, ‘ইয়ে মানে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়েছিলাম। এখন দেখছি হিসাব মেলেনি।’
সোনিয়া জানাল, ‘ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন খুব মাইন্ড করেছে তোমার কমেন্ট দেখে।’
আমি তাড়াহুড়ো করে বললাম, ‘দাঁড়াও, কমেন্ট ডিলিট করি। আরে ডিলিট তো হচ্ছে না।’
সোনিয়া রাগে গজরাতে লাগল। সে আদেশ দিল, ‘তোমার আর ডিলিট করতে হবে না। যাও, মাছ কিনে আনো। শিং মাছ আনবা। একদম ডলে ডলে সাদা করে দেয় যেন।’
শিং মাছ কীভাবে ডলে সাদা করতে হয়, তা আমার জানা নেই। আমি বিড়বিড় করে বললাম, ‘তুমি রেসিস্ট।’
সোনিয়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী বললে?’
আমি দ্রুত সামলে নিয়ে বললাম, ‘বলেছি, অনেক কষ্ট করেছ, এখন রেস্ট নাও।’
এরপর বাজারে গিয়ে শিং মাছ কিনে এক মহিলাকে দিলাম। তিনি মেঝেতে ঘষে ঘষে মাছটি সাদা করার চেষ্টা করছিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, ‘ভাইজান সাদা তো হয় না। এ কেমন শিং?’
ঠিক সেই মুহূর্তে সোনিয়ার ফোন এল। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, ‘ওই, তুমি আমার ক্যাম্পাসের জুনিয়র মীরার ছবিতে কী কমেন্ট করেছ কেবল?’
আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে বললাম, ‘ওটায় তো কোনো ভুল করিনি। লিখেছি, “জীবন সুন্দর হোক। নতুন জামাই নিয়ে সুখে থাকো।”’
সোনিয়া আর্তনাদ করে বলল, ‘আরে ওর তো বেবি শাওয়ার, ব্রাইডাল শাওয়ার না।’
মুহূর্তেই আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। চোখের সামনে বেবি শাওয়ার, ব্রাইডাল শাওয়ার, পচা রুই মাছ, শিং মাছ—সব একাকার হয়ে গেল।
সিদ্ধান্ত নিলাম, আজ আর বাসায় যাব না। টা টা বাই বাই। খতম।