যারা লেখালেখির পেশায় যুক্ত থাকেন, তাদের জীবনটা বেশ জটিল। সাধারণ মানুষের কাছে যা সহজ, তাদের কাছে তা হয়ে দাঁড়ায় এক দুঃসহ সমস্যা। ধরুন, কোনো আলাপচারিতার মাঝে আপনি আবেগের বশবর্তী হয়ে একটি গালি দিয়ে একটি বাক্য লিখলেন। সাধারণ মানুষ হয়তো সেই কথার প্রতিক্রিয়া জানাবে, কিন্তু একজন সম্পাদক বা লেখালেখির মানুষ আগে ধরে ফেলবেন ব্যাকরণগত ভুল। তিনি হয়তো বলবেন, ‘পদাশ্রিত নির্দেশক সব সময় শব্দের সাথে বসে, আর এখানে চন্দ্রবিন্দু হবে না, কমার পরে স্পেস‌ও নাই। আবার আপনি ইনভার্টেড কমাও দিছেন!’

শব্দচয়ন আর বানানের খুঁটিনাটি নিয়ে এই যে অন্তহীন যন্ত্রণা, এর ফলে অনেক সময় মানুষের বাক্‌স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়ে। মন খুলে কিছু লিখতে গেলেই বাধা আসে। যেমন কেউ হয়তো লিখলেন—‘ঘোড়ার আন্ডা এত চিন্তা ক‌ইরা কী কথা ক‌ওন যায়? ধুর!’

সাথে সাথেই সংশোধন চলে আসবে: এই বাক্যে ‘কী’ না, হবে ‘কি’! আর ঘোড়ার ডিম বলবেন, আন্ডাতে জগাখিচুড়ি হচ্ছে।

এর উত্তরে কেউ হয়তো হতাশ হয়ে বলবেন, ‘পারবো না এত বানান থেকে করতে। চ্যাটজিপিটি ও হাসে। কয়—তুই আজকাল কি অনেক ভুল করছিস?’

কিন্তু সেখানেও শান্তি নেই। পাল্টা সংশোধন আসবে: ‘*পারব না, *চ্যাটজিপিটিও। এত টাইপো! ছি ছি’

হায় মাবুদ! আসলে বানান ভুল হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। বানান তো আর ফেরেশতা নয় যে কখনোই ভুল হবে না। এমনকি বিজ্ঞানী ডোনাল্ড বসু ট্রাম্পের মতে, ভুল করাটা একটি ‘নাইস অ্যান্ড অ্যাট্রাকটিভ’ বিষয়। যত বেশি ভুল হবে, তত বেশি শেখার সুযোগ পাওয়া যাবে। আর যদি শেখাও না যায়, তবুও ভুল করতে হবে যাতে পরবর্তী সময়ে তা শুধরে নেওয়া যায়। আমাদের লক্ষ্য সব সময় সামনের দিকে থাকা উচিত।

এমন এক ঘটনার কথা মনে পড়ে, যখন আমার এক সম্পাদক বড় ভাইয়ের জন্য বিয়ের পাত্রী দেখতে যাওয়া। আমি, বড় ভাই এবং তাঁর এক বন্ধু মিলে গেলাম এক মেয়ের বাড়িতে। মেয়েটি অনার্স ক্লাসে পড়াশোনা করছে। তাদের বসার ঘরের দেয়াল সাজানো ছিল নানা রকম হাতের কাজের কারুকার্য দিয়ে। কোনোটিতে সেলাই করা লেখা, কোনোটিতে আবার সুন্দর ছবি আঁকা। আমি মোটামুটি মুগ্ধ হয়ে সেই কারুকার্য দেখছিলাম আর নাশতা খাচ্ছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম, বড় ভাইয়ের খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। তাঁর চোখ স্থির হয়ে আছে এবং হাত সামান্য কাঁপছে। আমি ভাবলাম ভাইয়ের কি মৃগীরোগ আছে? কিন্তু তেমন কিছু তো নয়!

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হ‌ইছে ভাই? শরীর খারাপ লাগছে?’

সাথে থাকা বন্ধু জিজ্ঞেস করলেন, ‘গত রাতে উল্টাপাল্টা কিছু খেয়েছিলি? কী রে! কথা বল!’

ভাইয়ের মুখে কোনো কথা নেই, দৃষ্টি এক জায়গায় স্থির। হাতে ধরা বিস্কুটটি মুখেও যাচ্ছে না, আবার প্লেটে নামছেও না। তিনি কথা বলার চেষ্টা করছেন, কিন্তু শব্দগুলো যেন গলায় আটকে যাচ্ছে, বেরোচ্ছে না। বন্ধু তাঁর হাতে পানি দিয়ে মালিশ করতে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে ভাই কিছুটা স্বাভাবিক হলেন এবং খুব কষ্টে কিছু শব্দ উচ্চারণ করলেন।

আমি উৎসুক হয়ে বললাম, ‘বলুন ভাই, কেমন লাগছে…’

তখনই ভাই আঙুল উঁচিয়ে দেয়ালে সাজানো একটা ওয়ালমেট দেখিয়ে বললেন, ‘ওখানে লেখা—ভালোবাসলেই ঘর বাঁধা যাই না, ভালোবেসে ঘর বাঁধলেই সুখী হ‌ওয়া যাই না।’

এই কথা শুনে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল। বন্ধু ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন, আমি বন্ধুর দিকে তাকিয়ে আছি, আর ভাই তাকিয়ে আছেন সেই ওয়ালমেটের দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে মেয়েটি আমাদের সামনে এসে হাজির হলেন। আমাদের এই অদ্ভুত মুখ চাওয়াচাওয়ি দেখে তিনি রীতিমতো ভিরমি খেয়ে গেলেন। কী বলবেন বুঝতে না পেরে তিনি মাথা নিচু করে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

অবশেষে অনেক কসরত করে বিস্কুটটি গিলে ফেলে বাকি অংশ প্লেটে রেখে ভাই মেয়েটির দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, ‘আসি, ভালো থাকবেন। আসসালামু আলাইকুম।’ এই বলে তিনি দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বাইরে গিয়ে বন্ধুকে বললেন, ‘দ্রুত হাঁট, চল বাসায় চলে যায়’ এবং নিজের মুখ চেপে ধরলেন।

মনে হয়, এই যাত্রায় আর বিয়ে খাওয়া হলো না।