আমাদের দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজিকে মূলত একটি পরীক্ষার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। সমাজবিজ্ঞান কিংবা অন্যান্য বিষয়ের মতো ইংরেজি শেখানোর ক্ষেত্রেও আমরা এখনো ব্যাকরণের নিয়ম মুখস্থ করা, শব্দার্থ মনে রাখা এবং বিভিন্ন স্ট্রাকচার আয়ত্ত করার পুরনো পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। এমনকি পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য শিক্ষার্থীদের নানা রকম টিপস ও টেকনিক শেখানো হয়। লেখক ফাহিম শাহরিয়ার লক্ষ্য করেছেন যে, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট কিছু প্যারাগ্রাফ লেখার টেমপ্লেট মুখস্থ করানো হয়। এমনকি আইইএলটিএসের মতো আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদেরও বোঝানো হয় যে, কয়েকটি নির্দিষ্ট বাক্য ও লেখার কাঠামো আয়ত্ত করে নিলেই যেকোনো বিষয়ে ইংরেজি প্যারাগ্রাফ লেখা সম্ভব। এর ফলে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি গভীরভাবে বুঝে সৃজনশীলভাবে প্রকাশ করার পরিবর্তে কেবল মুখস্থ করা ‘টেমপ্লেট’–এর ভেতরে টপিকের নাম বসিয়ে লিখে দেয়।

বিদেশি ভাষা শেখার ক্ষেত্রে টিপস-টেকনিক বা সূত্রের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও কেবল এগুলোর ওপর নির্ভর করে ভাষায় সাবলীল হওয়া প্রায় অসম্ভব। কারণ, কোনো বাক্যের ব্যাকরণগত নিয়ম জানা আর বাস্তব পরিস্থিতিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই বাক্যটি ব্যবহার করতে পারার মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। এই কারণেই দেখা যায়, অনেক শিক্ষার্থী এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষায় ইংরেজিতে অসাধারণ ফলাফল করার পরেও বাস্তব জীবনে কথা বলতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে যায়, নিজের চিন্তা সাবলীলভাবে প্রকাশ করতে পারে না কিংবা নির্ভুলভাবে লিখতে হিমশিম খায়।

একটি শিশু যে ভাষার পরিবেশে বড় হয়, সেই ভাষা সে খুব স্বাভাবিকভাবেই আয়ত্ত করে নেয়। তাকে প্রতিটি বাক্যের ব্যাকরণ বুঝিয়ে দিতে হয় না, শব্দের অর্থ মুখস্থ করাতে হয় না কিংবা প্রতিদিন পরীক্ষার মাধ্যমে তার অগ্রগতির যাচাই করতে হয় না। পরিবারের সদস্যদের কথা শুনতে শুনতে, তাদের সঙ্গে আলাপচারিতার মাধ্যমে এবং চারপাশের পরিবেশ থেকে অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমেই শিশুটি ভাষা শেখে।

শৈশবে মানুষের মস্তিষ্ক ভাষা ও বিভিন্ন অভিজ্ঞতা গ্রহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নমনীয় থাকে। এই সময়ে নিয়মিত কোনো ভাষা শোনা, সেই ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করা এবং অর্থপূর্ণ পরিস্থিতিতে ভাষাটি ব্যবহারের সুযোগ পেলে শেখার প্রক্রিয়াটি অনেক বেশি স্বাভাবিক হয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে নতুন ভাষা শেখা সম্ভব হলেও উচ্চারণ, কথার স্বাভাবিক ছন্দ এবং অনর্গল কথা বলার দক্ষতা অর্জনে অনেক বেশি সময় ও অনুশীলনের প্রয়োজন হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি বাঙালি শিশু যদি যুক্তরাষ্ট্রে বড় হয় এবং তার পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে বাংলায় কথা বলেন আর চারপাশের মানুষ ইংরেজিতে কথা বলেন, তবে সে একই সঙ্গে দুটি ভাষা শিখে নিতে পারে। এক্ষেত্রে বাংলার জন্য তাকে আলাদা করে বাক্যের গঠন মুখস্থ করতে হয় না।

ঠিক একইভাবে ইংরেজি শেখার ক্ষেত্রেও প্রথমে গ্রামারের নিয়ম শিখে তারপর কথা বলা শুরু করার প্রয়োজন নেই। ভাষার সঙ্গে নিয়মিত পরিচয়, শোনা, বলা, পড়া ও লেখার অভ্যাসই একজন শিক্ষার্থীকে ধীরে ধীরে দক্ষ করে তোলে। যেকোনো ভাষা শেখার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুরা যদি ছোটবেলা থেকেই ইংরেজি ভাষার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে পরিচিত হওয়ার এবং দৈনন্দিন পরিস্থিতিতে তা ব্যবহার করার সুযোগ পায়, তবে তাদের জন্য ইংরেজি শেখার প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। শৈশব থেকেই এই অভ্যাস গড়ে তোলা ভবিষ্যতে তাদের যোগাযোগ, জ্ঞানচর্চা ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। পরিবারের মধ্যে বেড়ে ওঠার সময় একটি শিশু যদি নিয়মিত ইংরেজি গল্প শোনে, কার্টুন দেখে, সহজ ইংরেজি বই পড়ে এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলার সুযোগ পায়, তবে সে ধীরে ধীরে শব্দের অর্থ, বাক্যের গঠন ও ব্যবহারের ধরন বুঝতে পারবে। শুরুতে ভুল হতে পারে, বাক্য অসম্পূর্ণ হতে পারে কিংবা উচ্চারণে সমস্যা থাকতে পারে; কিন্তু নিয়মিত অনুশীলন ও উৎসাহ পেলে তার দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে পরবর্তী সময়ে স্কুলের পাঠ্যক্রমে গ্রামারের নিয়ম শেখাও তার জন্য সহজ হয়ে যায় এবং ভাষাগত দক্ষতা বহুগুণ বেড়ে যায়।

অনেকে মনে করেন, “ইংরেজিতে ভালো হওয়ার জন্য গ্রামারের প্রয়োজন নেই”। লেখক মনে করেন, গ্রামার না জেনে হয়তো অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কাজ চালানো সম্ভব, কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই ধারণাটি ভুল। গ্রামার জানা থাকলে একজন শিক্ষার্থীর ইংরেজি দক্ষতা আরও নিখুঁত হয়।

আইইএলটিএস, টোয়েফল ও পিটিই-র মতো প্রতিটি পরীক্ষায় গ্রামার মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে কাজ করে। তাই গ্রামার শেখাকে কোনোভাবেই অপ্রয়োজনীয় বলা যাবে না; বরং গ্রামার শেখার সময়, পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের নতুন করে চিন্তা করা উচিত। স্কুল-কলেজ জীবনে ইংরেজির প্রতি শিক্ষার্থীদের যে ভীতি তৈরি হয়, তা কাটিয়ে একে কেবল একটি ভাষা এবং বাংলার মতোই মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রতিটি স্তরে কাজ করা প্রয়োজন। প্রথমে ভাষার সঙ্গে পরিচয়, তারপর ব্যবহারিক অনুশীলন এবং পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাকরণ শেখার পদ্ধতিটি শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।

অভিভাবকেরা চাইলে বাড়িতে ইংরেজির একটি আনন্দদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারেন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ইংরেজি গল্প শোনা, বয়স উপযোগী বই পড়া, পরিচিত বিষয় নিয়ে সহজ বাক্যে কথা বলা এবং ইংরেজিতে প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। বাসায় অভিধান, ছবিযুক্ত এনসাইক্লোপিডিয়া, বয়স উপযোগী ম্যাগাজিন এবং ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা রাখা যেতে পারে। শিশুকে ভুলের জন্য লজ্জা দেওয়া বা প্রতিটি বাক্যে থামিয়ে সংশোধন করার চেয়ে তার কথা বলার আগ্রহ বাড়ানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চাও বজায় রাখা উচিত। একাধিক ভাষা শেখার অর্থ মাতৃভাষাকে বাদ দেওয়া নয়, বরং নতুন ভাষার মাধ্যমে জ্ঞান ও যোগাযোগের পরিধি বাড়ানো।

পরিশেষে বুঝতে হবে যে, ইংরেজি শেখার কোনো শর্টকাট পদ্ধতি নেই। ছোটবেলায় ভাষার পরিবেশ তৈরি করা বিশেষ সুবিধা দিতে পারে, তবে নিয়মিত অনুশীলন ও বাস্তব ব্যবহারের মাধ্যমেই দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব। তাই ইংরেজি শেখাকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলা প্রয়োজন। ছোটবেলা থেকেই শিশুরা যদি চর্চা করার একটি সহজ ও সাবলীল পরিবেশ পায়, তবে ভাষাটি তাদের কাছে ভয়ের বিষয় না হয়ে একটি পরিচিত ও ব্যবহারযোগ্য দক্ষতায় পরিণত হবে।

*লেখক: ফাহিম শাহরিয়ার, আইইএলটিএস ট্রেইনার