রাজধানীর দরিদ্র এলাকাগুলোতে বায়ুদূষণের প্রকৃত মাত্রা এবং সেখানকার বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নিরূপণে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন। এই প্রকল্পের আওতায় ঢাকার ৮টি নির্দিষ্ট স্থানে বায়ুদূষণ মাপার যন্ত্র স্থাপন করা হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)।
মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত পরিবেশ অধিদপ্তরের সেমিনার হলে ‘ব্রিদিং ঢাকা’ নামক এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
প্রকল্পটির আর্থিক সংস্থান নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটির ‘এয়ার কোয়ালিটি ফান্ড–২০২৬’–এর আওতায় এই আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঢাকার তুরাগ অঞ্চলের কামারপাড়া, উত্তরখান, কড়াইল, খিলগাঁওয়ের সিপাইবাবাগ, হাজারীবাগ, ভাটারা, কামরাঙ্গীরচর ও কেরানীগঞ্জে বায়ুদূষণ মাপার যন্ত্রগুলো বসানো হবে। আগামী নভেম্বরে এসব যন্ত্রের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে এবং ডিসেম্বর মাস থেকে সেগুলো স্থাপনের কাজ শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. লুৎফুর রহমান বলেন, ‘ব্রিদিং ঢাকা’র মতো উদ্যোগ বায়ুদূষণ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণ সরবরাহ করবে এবং ঢাকার বায়ুমানের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে কারিগরি দিক থেকে সহায়তা প্রদানকারী ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান এবং স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব সায়েন্সের ডিন অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার জানান, এর আগে বায়ুদূষণ পরিমাপের ক্ষেত্রে মূলত শহরের প্রধান সড়ক ও চৌরাস্তার মোড়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। মূলত ট্রাফিক জ্যাম ও যানবাহনের চলাচল বায়ুদূষণে কতটা প্রভাব ফেলছে, সেটিই বিবেচনা করা হতো।
ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা আরও বলেন, “আমরা প্রথমবারের মতো দরিদ্র এলাকার জনগোষ্ঠীর জনস্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিয়ে বায়ুদূষণ মাপার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এসব এলাকার বায়ুদূষণের উৎস কী, তাদের স্বাস্থ্যে বায়ুদূষণের প্রভাব কেমন পড়ছে, সেসব বিষয় আমরা তুলে আনব যাতে বায়ু ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যায়।”
অধ্যাপক কামরুজ্জামান মজুমদার জানান, ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু করে টানা ১৮ মাস পর্যন্ত বায়ুর মানের এই পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম চলবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাইল্যান্ডের এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এআইটি) পরিবেশবিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক এ টি এম নুরুল আমিন বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত জরুরি। তবে তিনি মনে করেন, অর্থবহ গবেষণা কেবল পর্যবেক্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে স্থানীয় জনগণকে এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে এবং গবেষণালব্ধ বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলোকে কার্যকর নীতিমালায় রূপান্তর করতে হবে।
তথ্য সংগ্রহের পর সেগুলোর সঠিক যাচাই-বাছাইয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুমান ব্যবস্থাপনা শাখার উপপরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মোতালিব। তিনি বলেন, প্রকল্পের বৈজ্ঞানিক নির্ভরযোগ্যতা ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে যন্ত্রপাতির যথাযথ ক্যালিব্রেশন, তথ্য সংগ্রহ-পরবর্তী উপাত্ত যাচাই এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা জরুরি।
অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশনের সভাপতি আহমেদ ইমতিয়াজ জামি বলেন, ‘ব্রিদিং ঢাকা’ প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা কমিউনিটি পর্যায়ে বায়ুমানের তথ্য সংগ্রহ ও সহজলভ্য করার পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি, নির্ভরযোগ্য তথ্য, জনসচেতনতা, জনগণের অংশগ্রহণ এবং আচরণগত পরিবর্তনই সুস্থ ও সহনশীল জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার অন্যতম ভিত্তি।
উদ্বোধনী সভার পর প্রকল্প বাস্তবায়নে কারিগরি সহযোগিতা ও যৌথ কার্যক্রমের রূপরেখা নির্ধারণ করতে অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন ও ক্যাপসের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
উল্লেখ্য যে, বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর তালিকায় ঢাকা প্রায়ই শীর্ষস্থানে থাকে। বিশ্বব্যাংকের ‘দ্য বাংলাদেশ কান্ট্রি এনভায়রনমেন্ট অ্যানালাইসিস (সিইএ)’ ২০২৩ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে ১ লাখ ৫৯ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুমান ব্যবস্থাপনা শাখার উপপরিচালক বেগম শাহনাজ রহমান, সহকারী পরিচালক তানজিনা আক্তার, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের উপসচিব তপন কুমার নাথ, বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের সহকারী প্রকৌশলী রুহুল আমিন, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিভাগীয় প্রধান মোহাম্মদ সাফিউর রহমান এবং ক্যাপসের লিড রিসার্চার (দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন) মারজিয়াত রহমান।