শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার হার ২০৩৫ সালের মধ্যে ৯৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ সরকার। সিসাদূষণ প্রতিরোধে এই লক্ষ্য অর্জনের লক্ষ্যে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, দূষিত এলাকাগুলোর যথাযথ পরিষ্কারকরণ, নিরাপদ শিল্প কার্যক্রম পরিচালনা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

গত বুধবার রাজধানীর ঢাকায় ‘অ্যাডভান্সিং টু আ লেড-ফ্রি বাংলাদেশ: স্কেলিং সলিউশনস, ড্রাইভিং ইয়ুথ অ্যাকশন’ শীর্ষক একটি সেমিনারে বক্তারা এই দাবি জানান। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং পিওর আর্থ বাংলাদেশ যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, “সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ২০২৬–২০৩৫ সালের জাতীয় কৌশল বাস্তবায়নে অর্থায়ন, সক্ষম প্রতিষ্ঠান গঠন এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফল নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য পরীক্ষাগার, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, দূষিত স্থান দূষণমুক্ত করা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।”

উল্লেখ্য যে, গত ১৭ আগস্ট মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত জাতীয় কৌশলে একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার হার ৫০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ৯৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে হবে।

পিওর আর্থ বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালি দাস জানান, লেড-অ্যাসিড ব্যাটারিগুলো যথাযথভাবে সংগ্রহ এবং পরিবেশবান্ধব উপায়ে পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংস্থাটি সম্প্রসারিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা (ইপিআর) নির্দেশনা প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কাজ করছে।

সিসাদূষণের অর্থনৈতিক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে মিতালি দাস বলেন, “২০১৯ সালে সিসার সংস্পর্শে আসার কারণে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি আনুমানিক ২ হাজার ৮৬০ কোটি মার্কিন ডলার ছিল, যা জিডিপির ৬ থেকে ৯ শতাংশের সমান।”

পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মুহাম্মদ সোলায়মান হায়দার জানান, লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি শিল্পে নিয়মিত পরিদর্শন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত বিধিবিধানের যথাযথ অনুসরণ নিশ্চিত করতে একটি মানসম্মত কার্যপদ্ধতি তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া মাটিতে সিসার গ্রহণযোগ্য মাত্রা নির্ধারণের জন্য একটি কারিগরি দল গঠন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকি সতর্ক করে বলেন, সিসার সংস্পর্শে আসার ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করা এবং এর ক্ষতি প্রতিরোধে জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন যে, অনেক ক্ষেত্রে উপসর্গ প্রকাশের আগেই সিসা শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

সেমিনারে খুলনার লবণচোরায় এসএসআর স্কুলে সিসাদূষণ রোধে পিওর আর্থ বাংলাদেশের নেওয়া উদ্যোগের ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। সংস্থাটির প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, এই উদ্যোগের আগে ও পরে পরীক্ষা করা ১১১ জনের রক্তে সিসার মধ্যম মাত্রা ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫ সালে এই মাত্রা ছিল প্রতি ডেসিলিটারে ৫ দশমিক ৩২ মাইক্রোগ্রাম, যা পরবর্তীতে কমে ৪ দশমিক ৩৯ মাইক্রোগ্রামে দাঁড়িয়েছে।

সিসাদূষণ শনাক্তকরণ ও নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পিওর আর্থ বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরকে দুটি বহনযোগ্য এক্স-রে ফ্লুরোসেন্স অ্যানালাইজার প্রদান করেছে। এই যন্ত্রগুলোর মাধ্যমে কঠিন পৃষ্ঠে সিসাসহ বিভিন্ন ভারী ধাতুর উপস্থিতি এবং তার মাত্রা দ্রুত নির্ণয় করা সম্ভব হয়।

অনুষ্ঠানে সিসাদূষণ প্রতিরোধে তরুণ প্রজন্মের বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরা হয় এবং ‘ন্যাশনাল ইয়ুথ অ্যালায়েন্স ফর আ লেড-ফ্রি বাংলাদেশ’-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এই সেমিনারে সরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাত এবং গণমাধ্যমের শতাধিক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।