গত ২৮ বছরে দেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার ৮০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ভয়াবহ প্লাস্টিক দূষণ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
আজ বুধবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত মুক্তকণ্ঠের প্রধান কার্যালয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকে মন্ত্রী এই আশ্বাসের কথা জানান। ওয়াটারএইড বাংলাদেশ এবং মুক্তকণ্ঠ যৌথভাবে ‘প্লাস্টিক বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা: উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব (ইপিআর–২০২৬)’ শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমরা অন্যান্য দেশের তুলনায় খারাপ অবস্থায় আছি। আজকে যে ডেঙ্গুর বিস্তার, সেটাও পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্লাস্টিকের এ দূষণ থেকে জাতিকে মুক্ত করতে যা যা করা দরকার, সব করব। এ নিশ্চয়তা আপনাদের দিতে পারি।’
প্লাস্টিক বর্জ্যের মারাত্মক প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘প্লাস্টিক একটা ভয়াবহ দুর্যোগ তৈরি করছে আমাদের জন্য। স্বাস্থ্যহানির পাশাপাশি এটি জলাবদ্ধতা তৈরি করছে। বুড়িগঙ্গার তলদেশে ৬ থেকে ৮ ফুট প্লাস্টিকের স্তর জমে আছে।’
মন্ত্রী জানান, প্লাস্টিক দূষণ কমিয়ে এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইপিআরের প্রশংসা সবাই করলেও এর মূল চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তবায়ন। পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই ২৮ বছরে দেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার ১৫ হাজার টন থেকে বেড়ে ১৮ লাখ টনে পৌঁছেছে, যা প্রায় ৮০ গুণ বৃদ্ধি। এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে জাতিকে বাঁচাতে সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি পুনরায় আশ্বাস দেন।
উল্লেখ্য, গত আগস্টে পরিবেশ অধিদপ্তর প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ‘উৎপাদনকারীর সম্প্রসারিত দায়িত্ব (ইপিআর–২০২৬)’ শীর্ষক একটি নির্দেশিকা তৈরি করেছে। এই নির্দেশিকার মূল লক্ষ্য হলো ব্যবহৃত বর্জ্য সংগ্রহ এবং পুনর্চক্রায়নের ক্ষেত্রে প্লাস্টিক উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের কার্যকর দায়িত্ব নিশ্চিত করা।
গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত বিশেষজ্ঞ এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা মত প্রকাশ করেন যে, প্লাস্টিক দূষণ কমিয়ে টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা একক কোনো পক্ষের পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য উৎপাদক, ভোক্তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। তারা বর্জ্য উৎসেই পৃথক করার গুরুত্ব এবং বর্জ্য সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত অনানুষ্ঠানিক খাতকে মূলধারায় নিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং প্লাস্টিকের উৎপাদন, ভোগ ও আমদানির সঠিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের তাগিদ দেন তারা।
ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর আজমান আহমেদ চৌধুরী জানান, তাদের সংস্থা মূলত সমন্বিত পানিসম্পদ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছে। তিনি বলেন, ক্রমবর্ধমান নগরায়ণের ফলে প্লাস্টিকের ব্যবহার জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বর্তমানে একটি বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইপিআর একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
প্লাস্টিক দূষণের ফলে পানির উৎসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে সামগ্রিক পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে সতর্ক করেন আজমান আহমেদ চৌধুরী। তিনি তৃণমূল পর্যায়ে ইপিআর বাস্তবায়ন, উৎসে বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।