এবারের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। দেশের মোট ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন পরীক্ষার্থীও পাস করতে পারেননি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও পাঠদানের মান এবং তদারকির অভাব এই চরম বিপর্যয়ের মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

ভোলা সদর উপজেলার মেদুয়া কলেজ এই শূন্য পাসের একটি উদাহরণ। এ বছর এই কলেজ থেকে পাঁচজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন, তবে তাঁদের কেউই পাস করতে পারেননি। উল্লেখ্য, গত বছরও এই প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। ২০২৩ সালে শান্তিরহাট এলাকায় প্রতিষ্ঠিত এই কলেজটি বর্তমানে একটি টিনশেড ভবনে পরিচালিত হচ্ছে।

গত সোমবার প্রতিষ্ঠানটিতে সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত সেখানে কোনো শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল না। তবে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে কলেজটিতে ৬৭ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন এবং ১২ জন শিক্ষক (চুক্তিভিত্তিক ও অতিথি মিলিয়ে) সেখানে পাঠদান করছেন। বাংলা বিষয়ের প্রভাষক প্রিয়াংকা মজুমদার বলেন, “যাঁরা এবার অকৃতকার্য হয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশই নিয়মিত ক্লাস করতেন না।” তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ভিন্ন; তাঁদের মতে, নিয়মিত ক্লাস না হওয়াটাই ফল বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের ৯টি সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানে শূন্য পাস হয়েছে। এই সংখ্যাটি গত বছর ছিল ২০২টি, তার আগের বছর ৬৫টি এবং ২০২৩ সালে ছিল ৪২টি। অর্থাৎ, ২০২৩ সালের তুলনায় এবার শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় সাত গুণ বেড়েছে। এই পরিস্থিতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।

শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেছে। যেমন—শিক্ষার্থী সংখ্যা অত্যন্ত কম এবং নিয়মিত পাঠদান হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ক্লাসে না গিয়ে কেবল পরীক্ষার ফরম পূরণ করে অংশ নেন।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে টাঙ্গাইলের সখীপুর পৌরসভার সূর্যতরুণ শিক্ষাঙ্গন আবাসিক স্কুল অ্যান্ড কলেজও এই তালিকায় রয়েছে। এ বছর এখান থেকে চারজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় বসলেও কেউ পাস করতে পারেননি। ২০২৫ সালে ১০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র একজন পাস করেছিলেন।

১৯৮১ সালে একটি কিন্ডারগার্টেন হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮৮ সালে উচ্চবিদ্যালয়ে এবং ২০০৪ সালে উচ্চমাধ্যমিক শাখা চালু করে। স্কুল শাখাটি এমপিওভুক্ত হলেও কলেজ শাখাটি এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে কলেজ শাখার কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীকে পাওয়া যায়নি। স্কুল শাখার একজন শিক্ষক জানান, গত বছর কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় এ বছর দ্বাদশ শ্রেণি সম্পূর্ণ ফাঁকা। একাদশ শ্রেণিতে তিনজন শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও তাঁরা ক্লাসে আসেন না, যার ফলে শিক্ষকেরাও আসেন না।

কলেজ শাখার অফিস সহকারী আব্দুল হামিদ মুকুল জানান, ১৬ জন প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হলেও এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষকেরা নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে আসেন না। অন্যদিকে, অকৃতকার্য হওয়া দুই শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত প্রায় দুই বছরে মাত্র দুই থেকে তিন দিন ক্লাস হয়েছে। এই সময়ে কোনো মাসিক বা নির্বাচনী পরীক্ষাও নেওয়া হয়নি; তারা কেবল ফরম পূরণ করে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন।

তদারকির অভাব ও আসন সংকট
সারা দেশে মোট ৯ হাজার ৩৯০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এবার ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ শিক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নেন। সামগ্রিক পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ৮৪ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন।

শূন্য পাসের বাইরেও আশঙ্কাজনক চিত্র দেখা গেছে আরও অনেক প্রতিষ্ঠানে। ৫৭টি প্রতিষ্ঠানে পাসের হার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ, ২২১টিতে ৫ থেকে ১০ শতাংশ এবং ৯১১টি প্রতিষ্ঠানে ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে। এছাড়া ৪ হাজার ১৬৮টি প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ২০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে। বিপরীতে, শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র ১৩৯টি।

চলতি শিক্ষাবর্ষে ভর্তির জন্য সারা দেশে ২৬ লাখের বেশি আসন থাকলেও চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র ১০ লাখ শিক্ষার্থী। ফলে ১৫ লাখের বেশি আসন খালি রয়েছে। এমনকি চার শতাধিক কলেজ ও মাদ্রাসায় কোনো শিক্ষার্থী আবেদনই করেননি। শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, এই শূন্য পাস বা কম পাসের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং প্রতিষ্ঠান স্থাপন, ভর্তি প্রক্রিয়া, শিক্ষক নিয়োগ এবং পাঠদানের মধ্যে সমন্বয়ের চরম ঘাটতি এখানে বিদ্যমান।

কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি
শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামানের সঙ্গে কথা বলা হয়। তিনি মুক্তকণ্ঠ কে বলেন, “শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে বসে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিগত পাঁচ বছরের সব তথ্য পর্যালোচনা করা হবে। ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি দেখা যায়, পরপর একাধিক বছর পাসের হার শূন্য, তাহলে ওই সব প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের অনুমতি বাতিল করা হবে।”

শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু অনুমোদন দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালু রাখলে হবে না, নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, “শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ‘ম্যাপিং’ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে কোন এলাকায় কতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, কোনগুলো অপ্রয়োজনীয়, তা চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। আঞ্চলিক বিবেচনায় যেসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন রয়েছে, সেগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে। অন্যদিকে প্রয়োজনের বাইরে অন্য কোনো কারণে গড়ে ওঠা যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী নেই, পড়াশোনা হয় না এবং বাস্তবে যেগুলোর প্রয়োজনীয়তা নেই, সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে কিছুটা সময় দিয়ে উন্নতির সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।”

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নেয়ামত উল্লাহ, ভোলা ও ইকবাল গফুর, সখীপুর, টাঙ্গাইল]