ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের একটি গ্রামে মানবিক সহায়তা বিতরণের জন্য ব্যবহৃত একটি স্কুলে রাশিয়ার ভয়াবহ বিমান হামলায় অন্তত ২৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে চারজন পুলিশ সদস্য এবং দুজন উদ্ধারকর্মী রয়েছেন।
গত রোববার স্থানীয়ভাবে কার্যকর হওয়া একটি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর এই হামলা চালানো হয়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গভীর হতাশা প্রকাশ করে মন্তব্য করেছেন যে, এর মধ্য দিয়ে ‘শান্তির পথে অগ্রগতির’ যে ক্ষীণ আশা তৈরি হয়েছিল, তা ভেঙে গেছে।
প্রতি সোমবার ওই নির্দিষ্ট স্কুলে সাধারণ মানুষের মাঝে মানবিক সহায়তা বিতরণ করা হতো। প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, লোকজন সেখানে জড়ো হওয়ার পরপরই রাশিয়া প্রথম দফায় বেশ কয়েকটি বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করে। এরপর দ্বিতীয় দফায় লক্ষ্য করে আবারও বোমা হামলা চালানো হয় ওই আশ্রয়কেন্দ্রটিতে।
২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে দুই দেশের চলমান সংঘাতের ইতিহাসে এটিই ছিল দীর্ঘতম যুদ্ধবিরতি। তবে কিয়েভ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়া মাত্রই রাশিয়ার বাহিনী ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় খেরসন অঞ্চলে পুনরায় আক্রমণ শুরু করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় রাশিয়ার দখলে থাকা ওলেশকি শহরে মানবিক অভিযান পরিচালনার লক্ষ্যে গত মঙ্গলবার থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হয়েছিল। রোববার এর মেয়াদ শেষ হয় এবং সেই সময় পর্যন্ত কোনো পক্ষই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেনি।
তবে যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই খেরসন অঞ্চলের পার্শ্ববর্তী জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলের একটি গ্রামে একাধিক বিমান হামলা চালায় রুশ বাহিনী। ওই অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত গভর্নর মিখাইলো সেমিকিন জানিয়েছেন, এই হামলায় অন্তত ২৬ জন নিহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজন স্থানীয় ওই স্কুলে মানবিক সহায়তা নিতে গিয়েছিলেন। ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগের প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ভয়াবহ হামলায় স্কুল ভবনটি পুরোপুরি ধসে পড়েছে এবং ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেখানে উদ্ধারকর্মীরা নিখোঁজদের সন্ধানে কাজ করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ২ নভেম্বর জানিয়েছেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শান্তি আলোচনা আগামী সপ্তাহে পুনরায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ১০ ও ১১ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তাঁর প্রতিদিনের নিয়মিত ভাষণে বলেন, “প্রতি সোমবার ওই স্কুলে মানুষের মধ্যে মানবিক সহায়তা বিতরণ করা হতো। লোকজন সেখানে পৌঁছানোর পরই রাশিয়া প্রথম দফায় কয়েকটি বিমান থেকে বোমা ফেলে। পরে দ্বিতীয় দফায় আশ্রয়কেন্দ্র লক্ষ্য করে আবারও বোমা হামলা চালানো হয়।”
ভারপ্রাপ্ত গভর্নর মিখাইলো সেমিকিন টেলিগ্রামে জানিয়েছেন, “নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন উদ্ধারকর্মী ও চারজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন।”
নিহত উদ্ধারকর্মীদের পরিচয় প্রকাশ করেছে ইউক্রেনের জরুরি সেবা বিভাগ। তাঁরা হলেন ৪৪ বছর বয়সী ডেনিস কোনোভালেঙ্কো এবং ওলেক্সি সুশচেভস্কি। জরুরি সেবা বিভাগ এক বিবৃতিতে বলেছে, “প্রতিদিন তাঁরা মানুষের সহায়তায় এগিয়ে যেতেন। বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে কাজ করতেন এবং অন্যদের জীবন বাঁচাতে নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতেন।”
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি আরও বলেন, “ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতির পর এমন একটি মুহূর্ত এসেছিল, যখন পরবর্তী পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে শান্তির পথে অগ্রগতির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারত। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে রাশিয়া সম্পূর্ণ বিপরীত বার্তা দিয়েছে। রাশিয়া আরও হত্যাকাণ্ডের ওপর নির্ভর করছে। এর জবাব দেওয়া প্রয়োজন।”
গত সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সুযোগে রাশিয়ার দখলে থাকা ওলেশকি শহর থেকে অনেক মানুষকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। পাঁচ বছরে গড়ানো এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কয়েক লাখ মানুষ নিহত এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
১ নভেম্বর এএফপিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউক্রেনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য কিয়েভ প্রস্তাব দিলেও মস্কো তা প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর অভিযোগ, রাশিয়া যুদ্ধবিরতির এই সময়টিকে নিজেদের ‘অবস্থান আরও শক্তিশালী’ করার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেননি। ২ নভেম্বর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক চর্চা। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, অতীতে যুদ্ধের বিরতিগুলো ইউক্রেনের সেনাবাহিনীও নিজেদের পুনর্গঠনের কাজে ব্যবহার করেছে।
পেসকভ আরও উল্লেখ করেন, ওলেশকির মানবিক অভিযানকে ‘সফল’ হিসেবে দেখছে মস্কো। তাঁর মতে, এই অভিযানে ‘সব পক্ষের মধ্যে ভালো সহযোগিতা’ হয়েছে। তিনি এই প্রক্রিয়ায় রাশিয়ার মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনার ইয়ানা লানত্রাতোভার ভূমিকার প্রশংসা করেন।
যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সহযোগিতার অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল এই অভিযান। যুদ্ধবিরতি তদারকিতে ইয়ানা লানত্রাতোভার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইউক্রেনের মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনার দিমিত্রো লুবিনেৎস। এই অভিযানের আওতায় অনেক মানুষকে ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড এবং রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত ক্রিমিয়ায় সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে ক্রেমলিন জানিয়েছে, আপাতত এ ধরনের আর কোনো অভিযান আয়োজনের পরিকল্পনা তাদের নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ২ নভেম্বর জানিয়েছেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আলোচনা আগামী সপ্তাহে আবার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ১০ ও ১১ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিনের এই যুদ্ধের অবসানে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন, যদিও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এদিকে ট্রাম্প ক্রমশ মস্কোর পক্ষ নিচ্ছেন বলে কিয়েভ এবং ইউরোপের মিত্রদেশগুলো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর রাতেই রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই তাদের জরুরি সতর্কতামূলক অ্যাপে হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি একটি পরিকল্পিত সাইবার হামলা।
ইউক্রেন সন্দেহ করছে যে, তাদের বিমান হামলার সতর্কতাব্যবস্থা হ্যাক করা হয়েছে। লাখো মানুষের কাছে তেজস্ক্রিয়তার হুমকি সংক্রান্ত ভুয়া সতর্কবার্তা পাঠানোর পর এই সন্দেহ তৈরি হয়। উল্লেখ্য, এই সতর্কতাব্যবস্থা রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে আগাম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে থাকে।
অন্যদিকে রাশিয়াও জানিয়েছে, দেশটির জরুরি পরিস্থিতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি অ্যাপ হ্যাক করা হয়েছে, যা থেকে হামলার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। তবে রাশিয়ায় এই অ্যাপটি খুব বেশি ব্যবহৃত হয় না; সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলার সতর্কবার্তা সাধারণত মুঠোফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে পাঠানো হয়।
চলতি বছর রাশিয়া তাদের হামলার তীব্রতা আরও বাড়িয়েছে। দেশটি বর্তমানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দ্রুতগতির জেট ইঞ্জিনচালিত ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে, যা প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করা হয়।