মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সোমবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লক্ষ্যে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তিনি আগ্রহী। তবে এই আলোচনার প্রস্তাবের পাশাপাশি তাঁর কিছু মন্তব্য ইউক্রেনের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের মতে, ‘সত্যি বলতে, ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়া বেশ সুবিধাজনক অবস্থানেই ছিল। তারা খুব বেশি কিছু করেনি।’ অথচ ট্রাম্প যখন এই কথা বলছেন, ঠিক তখনই ইউক্রেনের স্কুল, হাসপাতাল এবং জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে রুশ ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তাণ্ডব অব্যাহত রয়েছে।
মস্কোর এই ক্রমবর্ধমান বিমান হামলার মোকাবিলাই এখন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই কারণেই তিনি ওয়াশিংটনের কাছে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ, পূর্ণাঙ্গ গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং স্পেসএক্স-এর সামরিক ইন্টারনেট সেবা ‘স্টারশিল্ড’ সম্পূর্ণ পুনর্বহালের জন্য বারবার আবেদন জানিয়ে যাচ্ছেন।
কিয়েভ স্কুল অব ইকোনমিকস-এর দেওয়া তথ্যানুসারে, কেবল সেপ্টেম্বর মাসেই ইউক্রেনের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে প্রায় চার হাজার হামলা চালিয়েছে রাশিয়া, যা গত বছরের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ১৪৫টি হামলা সরাসরি ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক পর্যবেক্ষণ মিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই হামলাগুলো সাধারণ নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। গত মাসে ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যা আগের বছরের চেয়ে ৮৫ শতাংশ বেশি। অক্টোবরের প্রথমার্ধে এই মৃত্যুর হার আরও তীব্র হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
তীব্র শীতের আগমনে ইউক্রেনীয়দের অন্ধকারে ও প্রচণ্ড ঠান্ডায় ঠেলে দেওয়াই রাশিয়ার এই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষের মনোবল ভেঙে দিতে চায় যাতে যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনসমর্থন হ্রাস পায়। কেবল গত সপ্তাহেই জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে ৭৬টি হামলা চালিয়েছে মস্কো। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি গত সোমবার জানান, সপ্তাহান্তেও প্রায় এক ডজন অঞ্চলে হামলা চলেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, শীতকালে ঘরবাড়ি উষ্ণ রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘কম্বাইন্ড হিট অ্যান্ড পাওয়ার’ প্ল্যান্টগুলো এখনো রুশ আক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে।
পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইউক্রেন চলতি বছর রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে বিমান হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যখন দেশে গ্যাস ও ডিজেলের দাম আকাশচুম্বী, ঠিক সেই সময়ে এই হামলার কারণে জেলেনস্কির প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছেন ট্রাম্প। যদিও এই দূরপাল্লার হামলা এবং দীর্ঘমেয়াদী পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার জ্বালানি খাতের আয় কমিয়ে দিয়েছে, যা ছিল তাদের যুদ্ধযন্ত্রের প্রধান শক্তি। বিশেষ করে তেল শোধনাগারগুলোতে ইউক্রেনের আক্রমণগুলো অত্যন্ত কার্যকর হয়েছে, যার ফলে গত মাসে রাশিয়ার পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্যের রপ্তানি যুদ্ধের পর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
আলোচনার নতুন সম্ভাবনা নিয়ে মঙ্গলবার নরওয়ের অসলোতে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জেলেনস্কি। এই বৈঠকে জ্যারেড কুশনার ভার্চুয়ালি যোগ দেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আবারও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধে পারস্পরিক যুদ্ধবিরতির ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তবে শর্ত থাকে যে মস্কোকেও একই পদক্ষেপ নিতে হবে।
তানা চার বছরের যুদ্ধ সহ্য করে টিকে থাকা ইউক্রেনের ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানিব্যবস্থা এবার পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী সের্গেই কোরেটস্কি গত সপ্তাহান্তে জানান, জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে এমন একটি দিনও যায়নি যেদিন জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হয়নি; এই সময়ের মধ্যে দুই হাজারটিরও বেশি আঘাত হানা হয়েছে। যুদ্ধের আগের তুলনায় ইউক্রেন এখন তার বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হারিয়েছে।
যুদ্ধের এই সময়ে ইউক্রেন তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সুরক্ষাবলয় এবং শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। পাশাপাশি বিকেন্দ্রীকরণ ও নবায়নযোগ্য শক্তির মাধ্যমে ব্যবস্থাকে টেকসই করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু রাশিয়ার আক্রমণ ক্ষমতাও সমান তালে বেড়েছে। বিশেষ করে জেটচালিত ড্রোন এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার শুরু করায় ইউক্রেনের পক্ষে এই হামলাগুলো ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
ঠিক এই পরিস্থিতিতে মার্কিন নীতির আকস্মিক পরিবর্তন জেলেনস্কিকে গভীর উদ্বেগের মুখে ফেলেছে। স্টারশিল্ড ব্যবহারে কড়াকড়ি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগাম সতর্কবার্তার মতো গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে অনিশ্চয়তা এবং ইউরোপীয় সহযোগীদের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর পাঠাতে যুক্তরাষ্ট্রের অসম্মতি—সব মিলিয়ে ইউক্রেন এখন চরম সংকটে।
পোল্যান্ডের ওয়ারশে অবস্থিত ‘সেন্টার ফর ইস্টার্ন স্টাডিজ’-এর ইউক্রেনীয় অর্থনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ স্ল্যাভোমির মাতুশজাক জানান, রাশিয়ার হামলায় দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশব্যাপী বিদ্যুৎ-সংকট আগের বছরের চেয়ে খুব বেশি খারাপ নয়। তবে কিয়েভের পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। কারণ, স্বাভাবিক সময়েও কিয়েভে প্রয়োজনীয় সব বিদ্যুৎ তৈরি হতো না, অন্য অঞ্চলের ওপর নির্ভর করতে হতো। বর্তমানে কিয়েভের তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রই পুরোপুরি বন্ধ। জাতীয় গ্রিড অপারেটর ‘উক্রেনেরগো’ জানিয়েছে, রাশিয়া এখন পদ্ধতিগতভাবে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা বা ‘ট্রান্সমিশন’ ধ্বংস করার দিকে মনোযোগ দিয়েছে।
মাতুশজাক বলেন, ‘আমি তো বলব, জাতীয় পর্যায়ে পরিস্থিতি এক বছর আগের তুলনায় খুব একটা খারাপ নয়। তবে কিয়েভের অবস্থা অনেক বেশি কঠিন, কারণ জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসের হামলায় শহরের ভেতরের প্রায় সব বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এর অর্থ হলো, এখন প্রায় সব বিদ্যুৎ শহরের বাইর থেকে সরবরাহ করতে হচ্ছে।’
গত সোমবার জেলেনস্কি জানান, মস্কোর সপ্তাহান্তের হামলার পর পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন। এরপর মঙ্গলবার কিয়েভের একটি সাবস্টেশনে রুশ হামলায় পুরো শহরের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে গণপরিবহনব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ে। মাতুশজাক আরও উল্লেখ করেন যে, ট্রান্সমিশন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইউরোপের পক্ষে সহায়তা পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ইউরোপ ২ গিগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম হলেও ক্ষতিগ্রস্ত নেটওয়ার্কের কারণে তা সংকটপূর্ণ অঞ্চলে পৌঁছানো অসম্ভব। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ক্ষতিগ্রস্ত লাইন মেরামত করতে আসা কর্মীদের লক্ষ্য করেও হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া।
(কিথ জনসন, ফরেন পলিসির স্টাফ রাইটার, যিনি জিওইকোনমিকস ও জ্বালানিবিষয়ক নিবন্ধ লেখেন)