বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় শীর্ষস্থান অধিকার করা মানেই রাতারাতি পরিচিতি পাওয়া এবং অনেকের কাছে তারকা হয়ে ওঠা। কোন কলেজ থেকে পড়াশোনা করেছেন, বেড়ে ওঠার গল্প কী, আর প্রস্তুতির কৌশল কেমন ছিল—এমন অসংখ্য প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় তাঁদের। তবে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ করার পর তাঁরা জীবনের কোন পথে এগিয়ে যাচ্ছেন, সেই খবর সাধারণত খুব একটা প্রচার পায় না। সেই উদ্দেশ্যেই কয়েকজন মেধাবী শিক্ষার্থীর বর্তমান খোঁজ নেওয়া হয়েছে।

২০১৪ সালে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে ব্যাপক আলোচনায় এসেছিলেন সামিন ইরতিজা নূর। তিনি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভর্তি পরীক্ষায় সপ্তম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় দশম স্থান অধিকার করেন তিনি। পরবর্তীতে বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ২০১৯ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসিতে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পেশাগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ) থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেছেন। প্রকৌশল বিদ্যা, গবেষণা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে অবদান রাখার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে সামিন বলেন, “ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার খবরটা শুরুতে বিশ্বাস করতে পারিনি। মনে হচ্ছিল স্বপ্ন দেখছি! নিজের গায়ে চিমটি কেটেও দেখেছিলাম। পরে যখন ধীরে ধীরে উপলব্ধি করলাম যে সত্যিই এমন একটি অর্জন করেছি, তখন আনন্দের সঙ্গে একধরনের বিস্ময়ও কাজ করছিল।” দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও সেই মুহূর্তগুলোর কথা মনে পড়লে এখনো তাঁর মুখে হাসি ফুটে ওঠে।

একাধিক প্রতিষ্ঠানের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার পর সামিনের পরিচিতি বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। তাঁর ফেসবুক প্রোফাইলে আসতে শুরু করে অসংখ্য ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা বিষয়ক সংগঠন থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হতো এবং সংবাদপত্রের পাতায় তাঁর সাফল্যের কথা প্রকাশিত হতো। অনেক জুনিয়র শিক্ষার্থী তাঁর কাছে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে নানা পরামর্শ চাইতেন। কত ঘণ্টা পড়াশোনা করতেন, রুটিন কীভাবে সাজাতেন কিংবা মনোযোগ ধরে রাখার উপায় কী—এমন সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হতো তাঁকে। সবচেয়ে চমকপ্রদ অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষা দিতে গিয়ে তিনি নিজের ছবি দেখতে পেয়েছিলেন। এর আগে তিনি রুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন। পরে বুয়েটের সামনের রাস্তায় নিজের ছবি টাঙানো দেখে তিনি ভীষণ অবাক হন। যে প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা দিতে এসেছেন, সেখানেই নিজের ছবি দেখতে পাবেন তা তিনি কল্পনাও করেননি। সেই স্মৃতিটি তিনি এখনো পরম আনন্দের সাথে মনে করেন।

তবে সামিনের মতে, এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল নিজের সক্ষমতার ওপর বিশ্বাস জন্মানো। কঠোর পরিশ্রম এবং সঠিক প্রস্তুতির মাধ্যমে প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল করা সম্ভব—এই উপলব্ধিটি তাঁর পরবর্তী জীবনকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। পরিবারের সদস্যদের প্রতিক্রিয়াও ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। ফলাফল জানার পর তাঁর বাবা তাঁকে কাছে টেনে নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেছিলেন। মায়ের আনন্দ এবং ছোট বোনের উচ্ছ্বাসের কথা তাঁর স্পষ্টভাবে মনে আছে। তবে তাঁর গণিতের শিক্ষক উজ্জ্বল ভাইয়ের কথা তিনি আলাদাভাবে স্মরণ করেন। রুয়েটের ভর্তি পরীক্ষার আগে শিক্ষক তাঁকে বলেছিলেন, “দেখো তো, রুয়েটে ফার্স্ট পজিশনটা নেওয়া যায় কি না!” ফল প্রকাশের পর তিনিই প্রথম ফোন করে সামিনকে এই সুখবরটি জানান। সামিন বলেন, “ফোনে বলেছিলেন, “আমি জানতাম তুমি পারবা।” তাঁর কণ্ঠে আমার প্রতি যে বিশ্বাস ও স্নেহ ছিল, তা আজও আমার মনে গেঁথে আছে।” একজন শিক্ষকের এই অটুট বিশ্বাস তাঁর কাছে কেবল অনুপ্রেরণা নয়, বরং জীবনের এক অমূল্য স্মৃতি।

বুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ করার মাধ্যমে সামিনের জীবনযাত্রা এক নতুন মোড় নিয়েছে। ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার পরিচিতি তাঁকে আত্মবিশ্বাস দিলেও কর্মজীবনে তিনি উপলব্ধি করেছেন যে, একটি নির্দিষ্ট ফলাফল দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের গ্যারান্টি দেয় না। বাস্তব জীবনে দক্ষতা, দায়িত্ববোধ, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের সামর্থ্যই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ে তাঁর উপলব্ধি হলো, “একটি ভালো ফলাফল হয়তো শুরুতে পরিচিতি তৈরি করে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে নিজের কাজের মাধ্যমেই সেই আস্থা ধরে রাখতে হয়। আমার মনে হয়, প্রথম হওয়ার অভিজ্ঞতা আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল, কিন্তু একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে, অতীতের অর্জন ভবিষ্যতের সাফল্যের নিশ্চয়তা নয়।” তাই তিনি প্রকৌশলগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণার জ্ঞান আহরণ করে নিজেকে আরও দক্ষ করে তুলতে আগ্রহী।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর পরামর্শ হলো, বড় স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি নিজেদের প্রস্তুতি ও ব্যক্তিগত উন্নতির দিকে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া। তাঁর মতে, “প্রতিযোগিতায় সবাই প্রথম হতে পারে না, কিন্তু প্রত্যেকেই নিজের জায়গা থেকে সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। সাফল্যে অতিরিক্ত আত্মতুষ্ট হওয়া কিংবা প্রত্যাশিত ফল না পেয়ে পুরোপুরি ভেঙে পড়া কোনোটিই কাম্য নয়। দুই অবস্থাতেই স্থির থেকে নিজের কর্তব্য পালন করে যাওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ।”

সামিনের কাছে এখন সাফল্যের সংজ্ঞা কেবল কোনো তালিকার শীর্ষে থাকা নয়, বরং সময়ের সাথে সাথে নিজেকে আরও যোগ্য করে তোলা, অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং নিজের অর্জনকে বৃহত্তর কল্যাণে কাজে লাগানো। তাঁর দৃষ্টিতে ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মাত্র, তবে এটিই পুরো জীবন নয়।