বয়সের ভারে শরীর এখন নুয়ে পড়েছে, ঝরে গেছে দাঁত। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতাও আর আগের মতো নেই। তবে জীবনের লড়াই থামিয়ে দেওয়ার কথা ভাবেননি তিনি। হাতে বাদামের ঝুড়ি নিয়ে প্রতিদিন এক হাট থেকে অন্য হাটে ছুটে বেড়ান ৬৫ বছর বয়সী নিখিল হালদার। রোদ কিংবা বৃষ্টি—কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারে না। বাদাম বিক্রি করেই সংসার চালান তিনি। জীবনের প্রায় অর্ধশতাব্দী কেটে গেছে এভাবেই, অথচ শেষ বয়সে এসে নিজের নামে কোনো সম্পদ নেই, নেই কোনো স্থায়ী ঠিকানা।

নিখিল হালদার বর্তমানে বাগেরহাটের নাগেরবাজার এলাকায় অন্যের জায়গায় বসবাস করছেন। তার আদি বাড়ি বরিশালের স্বরূপকাঠি এলাকায়। ১৯৭১ সালের পর শৈশবে তিনি বাগেরহাটে চলে আসেন। চরম অভাবের সংসার, বাবা-মায়ের অসহায়তা আর পেটের তাড়নায় খুব অল্প বয়সেই হারিয়ে যায় তার পড়াশোনার স্বপ্ন। জীবিকার তাগিদে শুরু করেন বাদাম বিক্রি। সেই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কেটে গেছে প্রায় ৫০টি বছর। সময় বদলেছে, বয়স বেড়েছে, শরীর ভেঙেছে, কিন্তু তার জীবনের রূঢ় বাস্তবতা অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।

সপ্তাহের নির্দিষ্ট দুই দিন, মঙ্গলবার ও শুক্রবার বাগেরহাটের দরগা-মাজারের হাটে তাকে বাদাম বিক্রি করতে দেখা যায়। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে তিনি বিভিন্ন এলাকায় বাদামের ঝুড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ান। স্থানীয়দের কাছে তিনি কেবল একজন বিক্রেতা নন, বরং শৈশব থেকেই পরিচিত এক প্রিয় মুখ।

নিখিল হালদার বলেন, “মাত্র ২০০ টাকা পুঁজি নিয়ে বাদামের ব্যবসা শুরু করেছিলাম। এর মধ্যে ১২০ টাকা দিয়ে কিনেছিলেন একটি কড়াই। শুরুর দিকে হাটের দিনে ২০০ থেকে ৪০০ টাকার বাদাম বিক্রি হতো। বর্তমানে মঙ্গলবার ও শুক্রবার দরগা-মাজারের হাটে তিন থেকে চার হাজার টাকার বাদাম বিক্রি করেন। অন্য দিনগুলোতে বিক্রি হয় দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মতো। তবে এই টাকা পুরোটাই তার লাভ নয়। বাদাম কেনাসহ অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে যা থাকে তা দিয়েই চলে সংসার।”

নিজের জীবনসংগ্রামের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, “ছোটবেলায় পেটের দায়ে বাদাম বিক্রি শুরু করেছিলাম। তখন বাবা-মা অসহায় ছিলেন, লেখাপড়া করার সুযোগ হয়নি। প্রথমে ২০০ টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বাদাম বিক্রি করেই বেঁচে আছি। জীবনে অনেক কষ্ট করেছি, কিন্তু সেই কষ্টের যেন শেষ নেই।”

নিখিল হালদারের পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী ও দুই ছেলে। এক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন তিনি। দুই ছেলে শিমুল ও পলাশ এখনো বেকার। সন্তানদের বড় করা, মেয়ের বিয়ে এবং পরিবারের ভরণপোষণের সব দায়িত্ব shoulder করে জীবনের দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছেন তিনি। পরিবারের সব প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাবার সুযোগ পাননি। আজ বার্ধক্যের এই সময়ে সেই বাদাম বিক্রিই তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।

তিনি আরও বলেন, “ঝড়-বৃষ্টি হলেও আমার ছুটি নেই। পরিবারের জন্য আমাকে বাদাম বিক্রি করতেই হবে। এই ব্যবসা করেই ছেলেমেয়েদের বড় করেছি, মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। এখন বয়স হয়েছে, আগের মতো আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকলে হাত-পা ব্যথা করে। তবুও সংসারের জন্য কষ্ট করতেই হচ্ছে। এখন আমার আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। কোনো অর্থ-সম্পদেরও প্রয়োজন নেই। এভাবেই যত দিন বেঁচে থাকা যায়, সেটাই ভালো।”

বয়সের সাথে সাথে শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি বেড়েছে ব্যবসার খরচও। বর্তমানে তেল বাদামের কেজি কিনতে প্রায় ৪০০ টাকা খরচ হয়, যার ফলে আগের চেয়ে লাভের পরিমাণ কমেছে। দিনভর কঠোর পরিশ্রম করেও সংসারের সব চাহিদা পূরণ করা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের নামে কোনো জমি বা বাড়ি নেই তার, অন্যের আশ্রয়েই কাটছে জীবন। আক্ষেপ করে জানান, নিজের জন্য কিছু করতে পারেননি, কোনো সম্পদ গড়তে পারেননি তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা হৃদয় বলেন, “আমি দাদুর কাছ থেকে বাদাম খেয়ে যাই। তার বানানো বাদাম খুব ভালো লাগে। প্রায় ১০-১২ বছর ধরে দূর থেকে এসে তার বাদাম খাই। স্বাদটা আমার কাছে বেশ ভালো লাগে।”

মেহেদী হাসান নামের আরেক স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, “আমার বাড়ি পাশের এলাকায়। ছোটবেলা থেকেই এই মাজারে চলাফেরা, এখানেই বড় হয়েছি। ছোটবেলা থেকেই নিখিল কাকাকে এখানে বাদাম বিক্রি করতে দেখছি। তার বাদাম খুব ভালো লাগে। ছোটবেলা থেকে খাচ্ছি, এখনো খাই। পরিচিত কেউ এলে তাকেও বলি, নিখিল কাকার হাতের বানানো বাদাম খুবই সুস্বাদু।”

স্থানীয় দোকানি মুন্না শেখ জানান, নিখিল কাকা দীর্ঘকাল ধরে দরগার মোড়ে বাদাম বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, “নিখিল কাকা দীর্ঘদিন ধরে দরগার মোড়ে বাদাম বিক্রি করেন। আমরা প্রায়ই বন্ধুদের সঙ্গে সেখানে আড্ডা দিতে যাই। আগে তার কাছ থেকে বাদাম কিনে খাই, তারপর অন্য কাজে যাই। ছোটবেলা থেকেই তাকে দেখে আসছি। তার বাদাম খুবই সুস্বাদু, এ জন্য দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে। কিছুদিন আগে বরিশালের স্বরূপকাঠি থেকে কয়েকজন এসে তার খোঁজ করছিলেন। তারা নিখিল কাকাকে চিনতেন এবং তার বাদাম খেতে চেয়েছিলেন। পরে আমি তাদের দেখিয়ে দিয়েছি কোথায় তিনি বসেন।”

ক্রেতা সজীব বলেন, “এক ভাইয়ের সঙ্গে দরগায় ঘুরতে এসে তার কাছ থেকে বাদাম খেয়েছিলাম। খেয়ে খুব মজা পেয়েছি। এরপর মাঝেমধ্যে এখানে ঘুরতে এলে তার কাছ থেকে বাদাম কিনে খাই। অনেক দিন ধরে তাকে এখানে বাদাম বিক্রি করতে দেখছি। তার বাদামের স্বাদ সত্যিই ভালো।”

প্রবাসী মামুন বলেন, “আমি সৌদি আরবে ১০ বছর ছিলাম, তিন বছর আগে দেশে ফিরেছি। দেশে ফিরে এখনো দেখি কাকা বাদাম বিক্রি করছেন। তিনি খুব ভালো মানুষ আর তার বাদামও খুব ভালো।”

দীর্ঘ ৫০ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা বলতে গিয়ে নিখিল হালদারের কণ্ঠে ফুটে ওঠে গভীর আক্ষেপ। জীবনের সিংহভাগ সময় পরিবারের জন্য উৎসর্গ করলেও নিজের জন্য কিছুই করতে পারেননি বলে মনে করেন তিনি। তার কাছে এখন আর বড় কোনো স্বপ্ন নেই, নেই অর্থ-সম্পদ গড়ার কোনো প্রত্যাশাও।