ভাদ্র মাসের সেই আবছা নীলাভ আকাশ, যা যেন জীবনানন্দের কবিতার কথা মনে করিয়ে দেয়। সেখানে আকাশচুমকি ছড়ানো ঝিকিমিকি রাত আর হাওয়ায় ভেসে বেড়ায় মেঘের শুভ্র রুমাল। জোনাকির আলোর আড়ালে একাকী ভেসে চলা এক রহস্যময় পরিবেশ। রাতের সেই চমকানো হাওয়ায় শরীর যেন ঘামে একাকার, যেখানে খুব প্রয়োজন একটু দমখোলা বাতাসের।

নলেয়া নদীর ঘাটে উদবেড়ালদের আনাগোনা বেড়েছে। তাদের লক্ষ্য কেবল মাছ নয়, এবার তারা চায় কচি পাঠা। ইয়ামাহার তীব্র হেডলাইটের আলোয় ফিকে হয়ে আসে লুব্ধকজমল বাজার। শরতের শিমের দরে কেনাবেচার ভিড়ে সবাই যেন জেরবার, তবুও বুকভরা মুক্ত বাতাসের কয়েকটা নিশ্বাস শান্তি দেয়।

এদিকে রাতারাতি কারবারি হয়ে উঠেছে একদল বেকার যুবক। তারা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বাতাস খাওয়ানোর কৌশলে নিজেদের রোজগার জোরদার করছে।

ভোরের হাওয়ায় হেমন্ত যেন তার দোপাট্টা খুলে দিচ্ছে। ঘুমভাঙা উদলের গায়ে শিফন কাপড়ের শীতলতা অনুভূত হয়। দূরের কাশবনগুলো তাদের নিজস্ব শুভ্রতা হারাতে শুরু করেছে, কারণ সেদিনের ঝড়ো মেঘের সাথে মিশে গেছে শরতের সেই শুভ্রতা। পড়ন্ত আশ্বিনের কুয়াশায় শিশমহলে-মহলে সেজে ওঠে তেপান্তরের তৃণলতা। পুবের আকাশ যখন কুসুম কুসুম রঙ ধারণ করে, শান্ত নদীর ঢেউয়ে ভেজা বুনো কুলের ফুলে ফুলে তখন বুলবুলির আনাগোনা বাড়ে।

মনে হয়, শরতের দুপুরজুড়ে রূপখোলা এক স্নিগ্ধ আকাশ। সেখানে সাঁই সাঁই শব্দে উড়ে যাচ্ছে ছোপ ছোপ সাদা মেঘ। গাছের পাতার শব্দমাখা শীতল বাতাস মন কেড়ে নেয়। অথচ, ঝিকিমিকি তারার এই মধ্যরাতটি আসলে তুমুল শ্রাবণের; যেখানে উতলা জোছনায় ভেসে যাচ্ছে জীবনের যত সব রাগ।

জাদুর শহর ঢাকায় যারা গৃহত্যাগ করে এসেছেন, তারাই যেন জীবনের মধু খুঁজে পান। বাকিরা সারা জীবন ঘরবন্দী হয়ে বেঁচে থাকেন কেবল বাঁচার আশায়।

ভালো লাগার চেয়ে ভালো অনুভূতি আর কিছু নেই, ঠিক যেমন খারাপ লাগার চেয়ে খারাপ কিছু নেই। কবি এখানে ব্যক্ত করেছেন, “তুমি যেমনটি ভাবছ, আমি হয়তোবা তার উল্টো অথবা ঠিক তেমনটিই—জানি না কিছুই!” তিনি নিজেকে একজন অস্থির প্রেমিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন, “যে শুধু প্রেমই চেয়ে গেছে, কখনো প্রেমিকা চায়নি।” তবে পরক্ষণেই প্রশ্ন জাগে, “আসলেই কি চাইনি? নাকি অতটা সাহসই ছিল না কখনো আমার? ছিল শুধুই সামর্থ্যের অভাব; প্রচণ্ড অভাব!”

মনের বনে ডুবে থাকা এক তুমিল সরোবর, যা লমকূপে ভেসে ওঠা জলেশ্বরীর মতো। হৃদয়তলি জুড়ে এক থরোথরো স্পন্দন। তুমুল রোদের দুপুরে টপটপ করে শিশির ঝরে। কাঠফাটা ভূমিতে আর্তনাদ হয়ে কেউ বেঁচে আছে বহুকাল। সেই আকুতি যেন মাটির পরতে পরতে বেঁচে থাকে চিরকাল।

তাদের কণ্ঠ নীরব, না পাওয়ার কোনো অনুযোগ নেই। অনাহারি চোখেও সুখের দোলাচলে এক চকচকে দ্যুতি ফুটে ওঠে। শেষ বিকেলের শোভা বাড়ায় জলদি পায়ের হাটমুখী গতি। রোদে পোড়া চামড়ার এক আলাদা সৌন্দর্য থাকে। ঘামে ভেজা মাটিমাখা শরীরের রূপ হয় অনবদ্য, যার সংজ্ঞা দিতে নন্দনকলাও ব্যর্থ হয়।

কোনো কোনো দিন তাদের পেট ভরে না, তাই তারা উতলা বাতাসে প্রাণ ভরে শ্বাস নেয়। তারার রাজ্যে তারা খুঁজে ফেরে নিজের কালপুরুষ। অমলিন চিত্তজুড়ে তারা জ্বালায় পূর্ণিমা। পোড়া ঠোঁট ছুঁয়ে যায় অনাদরে পড়ে থাকা অন্তরনারীর গ্রীবা—আর মুষড়ে পড়া বেদনায় তারা প্রাণভরে ডাকেন “আলতাবানু”।

তাদের কবরের কোনো নিশানা থাকে না, ভালোবাসার থাকে না কোনো প্রমাণ। তবুও সেই ধ্রুপদি চাহনি বেঁচে থাকে হাজার বছর। সেই পরিশ্রান্ত অথচ তৃপ্ত অমর অবয়বটি অনবদ্য, যেখানে জেনেটিকস বিজ্ঞানও ব্যর্থ হয়।

বৃষ্টি তাদের বন্ধু, রৌদ্র তাদের সখা। ধরিত্রী হাসে তাদের মুখে। কিষাণ রূপে তারা আসলে কে, তা কেবল অন্তর্যামীই জানেন।