কবীর আলমগীরের লেখনীতে ফুটে উঠেছে প্রকৃতির নান্দনিকতা এবং হৃদয়ের গভীরে জমে থাকা বিরহ ও ভালোবাসার এক অনন্য অনুভূতি। তাঁর কবিতার পঙ্ক্তিগুলোতে জোছনার রাত, নদীর ঢেউ এবং প্রকৃতির বিভিন্ন ঋতুর সাথে মানবজীবনের আবেগগুলো মিশে একাকার হয়ে গেছে।

তাঁর একটি কবিতায় জোছনা রাতের মায়াবী পরিবেশের কথা বলা হয়েছে। সেখানে কবি লিখেছেন, “জোছ্‌নারাতে মুখ দেখেছি চাঁদ ঝলমল করে, শান্ত নদীর ঢেউয়ের মতো রূপটি তোমায় ধরে। শিউলিভেজা হাওয়ার ডাকে ভাসছে তোমার নাম, বুকের ভেতর স্বপ্ন এঁকে নিজে হলাম নিলাম। নদীর জলে চাঁদের ছবি কাঁপছে ধীরে ধীরে, জোছ্‌নারাতে মুখ দেখেছি চাঁদ ঝলমল করে। তুমি এলে রাতের আকাশ তারায় তারায় জ্বলে, জোছ্নারাতে থেকো পাশে জোনাক যদি বলে। তোমার ডাকে রাতের পাখি গেয়ে ওঠে নতুন সুরে। জোছ্নারাতে মুখ দেখেছি চাঁদ ঝলমল করে।”

আরেকটি কবিতায় কবি তাঁর প্রিয়তমার সাথে দূরত্বের আকুলতা এবং নিজের নিঃসঙ্গতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। সেখানে তিনি ব্যক্ত করেছেন, “কাছে যাবে যাবে ভাবি, অগাধ দূরত্বেসরিয়ে রেখে তোমাকে নক্ষত্রের দিকে;তুমি দূর আকাশের জ্বলজ্বলে নক্ষত্রের নাম।তুমি মহাকাশ, তুমি যে মহাপৃথিবী!কীভাবে অনুভূতির কপাট-জানালা খুলেহৃদয়ে তুমুল কোলাহলতুমি বড় হয়ে যাও, আমি স্তব্ধ মমি।আগোছালো গলিপথে সুর তোলো তুমিপথে পথে সুরে সুরে বাউল এসরাজতুমি গান হয়ে যাওআমি নীরবে দাঁড়িয়ে থাকি মমি হয়ে।”

বৈশাখ মাসের প্রখর রোদ এবং প্রেমের অতৃপ্তির কথা উঠে এসেছে তাঁর অন্য এক সৃষ্টিতে। সেখানে কবি বর্ণনা করেছেন, “দেখো বৈশাখ জানিয়ে দিয়েছে প্রখর রোদের তাপইচ্ছেরা পুড়ে শুকিয়ে বিরান তোমার–আমার ঠোঁটপুড়েছে ভীষণ সাধরা মনের আহাজারি খুব মনে।লাল-সাদা শাড়ি পরেছে নারীরা হাঁটছে দূরের পথেহাতের ভেতর প্রেমেরই হাত হাওয়া ওড়ায় চুলহাওয়া ওড়ায় শাড়ির আঁচল ঘামল নারীর মুখ।মুখের ওপর বাতাস চুমুর অজানা পথের টানপাইনি তোমার হাতের পরশ ইচ্ছেরা পোড়ে খুবকত উত্সব হয়েছে বিফল গাইনি প্রেমের গান।কত বৈশাখ মরেছে কেবল ঠোঁটের তুমুল ক্ষতে।পুড়েছে ভীষণ সাধরা মনের আহাজারি খুব মনে।অনেক মানুষ ভিড়ের ভেতর আমি তো কোথাও নেইইচ্ছেরা পুড়ে শুকিয়ে বিরান তোমার আমার ঠোঁট।”

প্রকৃতির ঋতুচক্রের সাথে স্মৃতির মেলবন্ধন ঘটেছে তাঁর হেমন্ত ও শ্রাবণের কবিতায়। কবি লিখেছেন, “হেমন্তের দূর্বাভেজা শিশিরে মনে রেখোচোখজোড়া শিশিরের মতন তাকিয়েথাকে শান্ত ভোরে—বাতাসে জড়ানো স্থির নিশ্বাসে তুমি এক নাম।মনে রেখো শরতের সাদা কাশফুলে,তোমার পরশে নাচি কাশফুল হয়েতোমার চুলের গন্ধে মাখি ভালোবাসা।শ্রাবণের এ মেঘলা দিনে রেখো মনেচোখজোড়া হয়ে যায় অপেক্ষার নদী।শিউলি ফুলের গন্ধে মনে রেখো তুমিপড়ে থাকি অবহেলায় শিশিরের ভোরে;পড়ে থাকি হেমন্তের ঘাসে।”

সবশেষে, নির্ঘুম রাতের যন্ত্রণা এবং স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার আকুতি ফুটে উঠেছে তাঁর শেষ কবিতায়। সেখানে তিনি লিখেছেন, “কীভাবে যে কাটে ঘুমহীন রাত, বাজে বিরহের সাইরেনআমি জানি, আমি জানি সব!বুকের খনি—স্মৃতির পলিমাটি থেকে উঠে আসেএই ঘুমহীন রাতে!দূরের হিজল অন্ধকারে ডানা ঝাপটায় পাখিশীতের শিশির ঝরে পড়ে চুপচাপআমি জানি, আমি জানি সব!কীভাবে যে কেটে যায় ঘুমহীন রাত, সুনসান কুয়াশায়কারা ডাকে ইশারায়, কে জাগিয়ে রাখে কাকে আশায়-আশায়আমি জানি, আমি জানি সব।”