মৃদুমন্দ বাতাসের দোলায় শুভ্র কাশফুলের ঢেউ আর চারপাশের সবুজের সমারোহ—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ঢাকার আফতাবনগরের সানভ্যালি আবাসনের কাশবন। রাজধানীর ভেতরেই লুকিয়ে থাকা এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন ছুটে আসছেন অসংখ্য মানুষ।

কাশবনের এই মোহময় রূপ স্বচক্ষে দেখতে শুক্রবারের এক স্নিগ্ধ সকালে যাত্রা শুরু করি। পূর্ব রাজাবাজারের বাসা থেকে বেরিয়ে কারওয়ান বাজার হয়ে পৌঁছালাম আফতাবনগর গেটে। ছুটির দিনের শান্ত সকালে আফতাবনগরের পরিবেশ ছিল বেশ প্রশান্ত। গেটে আমার সঙ্গে যোগ দিল দীর্ঘদিনের স্কুলবন্ধু গোলাম সামদানী। পরিকল্পনা ছিল দুই বন্ধু মিলে এবার সানভ্যালির কাশবন ঘুরে দেখব। সামদানীর মোটরসাইকেলের পেছনে চেপে বসলাম। আফতাবনগরের মূল সড়ক পেরিয়ে ভেতরের দিকে যত এগোতে লাগলাম, শহরের পরিচিত রূপ আর কোলাহল ততই দূরে মিলিয়ে যেতে লাগল।

ধীরে ধীরে সামনে ভেসে আসতে লাগল গ্রামীণ আবহ। রাস্তার দুপাশে সবুজ মাঠে চরছে গরু ও মহিষের পাল। কোথাও কোথাও ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। সামনে যত এগোচ্ছিলাম, দুপাশে মিছিলের মতো ভেসে আসছিল সাদা কাশফুলের দল। এক পর্যায়ে পিচঢালা সড়ক ছেড়ে মোটরসাইকেলের চাকা নামল গ্রামীণ মেঠো পথে।

পথের দুপাশে কাশবনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বড় পাতার সারি সারি সেগুন চারা। সেই সঙ্গে জারুল, সোনালু, পলাশ ও কৃষ্ণচূড়াসহ অনেক দৃষ্টিনন্দন ফুলের গাছ। আফতাবনগরের পেছনের অংশ পেরিয়ে সানভ্যালি আবাসন প্রকল্পের বিশাল ফাঁকা জমিতে পৌঁছাতেই প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে আটকে গেল চোখ।

যত দূর দৃষ্টি যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সাদা পালকের মতো কাশফুল। শরতের স্নিগ্ধ বাতাসে দুলতে থাকা এই কাশবন যেন শহরের কোলাহল থেকে দূরে এক টুকরো নির্মল প্রকৃতির রাজ্য। আবাসিক এলাকার নির্মাণকাজ এখনো পুরোদমে শুরু না হওয়ায় এখানকার বিস্তীর্ণ প্লট ও নিচু জমিতে প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে উঠেছে এই মনোমুগ্ধকর কাশবন। চারপাশের খোলা আকাশ, সবুজ ঘাস আর শুভ্র কাশফুলের মেলবন্ধনে জায়গাটি প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক দারুণ আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। একসময় আমাদের মোটরসাইকেল এসে থামল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল সেই রংধনুর সাত রঙে রাঙানো গোলচত্বরে। বর্ণিল চত্বরটি দূর থেকেই চোখে পড়ে।

চত্বরের মাঝখানে একটি ছোট বৃত্তাকার অংশ রয়েছে, সেখানে নতুন করে মাটি ফেলে ফুলগাছ লাগানোর কাজ চলছে। চারপাশের সাদা কাশফুলের সঙ্গে রঙিন গোলচত্বরটির বৈপরীত্য জায়গাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। মূলত এই রংধনুর রঙে সাজানো গোলচত্বরটিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। প্রকৃতি আর মানুষের তৈরি রঙিন সৌন্দর্যের এই মেলবন্ধন দেখতে প্রতিদিনই এখানে ছুটে আসেন অনেক দর্শনার্থী।

কেউ কাশফুলের মাঝে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন, কেউবা প্রিয়জনদের সঙ্গে কাটান কিছুটা সময়, আবার কেউ শহরের ব্যস্ততা ভুলে একা উপভোগ করেন প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ। কাশবনের মাঝেই একটু অদূরে দেখলাম সিকিউরিটি ওয়াচ টাওয়ার।

এক পা–দু পা করে উঠে পড়লাম সেই টাওয়ারে। নিচ থেকে দেখা আর টাওয়ারের ওপর থেকে দেখা কাশবনের পার্থক্য অনেক। ঠিক যেন ড্রোন ক্যামেরা কিংবা পাখির চোখে দেখা কাশফুলের সমুদ্র। জুম করে করে দূরের কাশফুল কাছে এনে ছবি তুলছি, ভিডিও করছি। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে গল্প করে আবারও নেমে পড়ি। সামনে রোদচশমা চোখে একজন সেলফি তুলছিলেন।

এগিয়ে বললাম, “চাইলে আমরা আপনার ছবি তুলে দিতে পারি।” সাভার থেকে আসা ওই ব্যক্তিটি জানালেন, ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার দৃশ্য দেখে এই ছুটির দিনে একাই ঘুরতে এসেছেন। আরও কিছু দূর এগোলে দেখি পরিবার–পরিজন নিয়ে অনেকেই বেড়াতে এসেছেন। সবার উচ্ছল ঘোরাঘুরি, ছবি তোলা আর আনন্দের মুহূর্তগুলো দেখে সেদিন মন ভালো করা একটা অনুভূতি নিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম।

ঢাকার যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রথমে আসুন আফতাবনগর ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির গেটে। সেখান থেকে সরাসরি অটোরিকশা চেপে ১০০ টাকা ভাড়ায় চলে আসতে পারবেন কাশফুলের ঢেউখেলানো সমুদ্রে।

অথবা মিনিবাসে করে বটতলা আর বটতলা থেকে অটো নিয়ে সানভ্যালি। যাঁরা নতুনবাজার থেকে আসবেন, তারা ১০০ ফিট রাস্তা ধরে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) হয়ে চলে আসতে পারবেন কাশফুলের রাজ্যে।

ভ্রমণকারীদের জন্য কিছু জরুরি পরামর্শ:
১. কাশফুলের মৌসুম খুব ছোট। তাই কাশফুল বাতাসে উড়ে ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই এখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করুন।
২. শরতের সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করতে সকালে না হয় বিকেলের দিকে সময় নিয়ে আসুন। ভরদুপুরে নয়। দুপুরে শরতের আকাশের প্রকৃত রূপ মিলিয়ে যায়।
৩. এই এলাকা সন্ধ্যার পর নির্জন হয়ে যায়। তাই সন্ধ্যা নামার আগেই ফেরার পথ ধরুন।